বাংলাদেশেও চাহিদা নেই দেব-জিতের, সস্তায় আসছে ভারতীয় বাংলা ছবি

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৯, ০৬:৫১ পিএম

বাংলাদেশের সিনেমা বাজার দীর্ঘদিন ধরেই মুমূর্ষু অবস্থা অতিক্রম করছে। বছরে প্রায় অর্ধ-শতক ছবি মুক্তি পেলেও ব্যবসা করে হাতেগোনা কয়েকটা ছবি। সিনেমা হলে নিয়মিত ছবি চালানোর উদ্দেশ্যে মাঝে যৌথ প্রযোজনায় প্রচুর সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে। কলকাতার সঙ্গে নির্মিত যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো এ দেশে ভালো ব্যবসাও করেছে। কিন্তু নানা অসংগতির কারণে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা নির্মাণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় হল মালিকরা ভরসা করছেন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য (সাফটা) চুক্তির মাধ্যমে আমদানি করা ছবির ওপর। সাফটা চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিম বাংলার দেব-জিৎ-অঙ্কুশদের জনপ্রিয় ছবিগুলো মুক্তি দেওয়া হতো বাংলাদেশের সিনেমা হলে। কিন্তু আমদানি করা ছবিগুলোও এখন ভালো ব্যবসা করছে না বলে জানা গেছে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে দেব জিতের ছবি ভালো ব্যবসা করলেও এখন তাদের বাজার কমে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, খোদ পশ্চিমবঙ্গেও এখন দেব-জিতের বাজারদর কম। সেখানেও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সিনেমা হল। দর্শক কমে যাচ্ছে দেব-জিতের মতো জনপ্রিয় তারকাদের।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ হল মালিক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে দেব-জিতের বাজার আগের মতো আর রমরমা নেই। ফলে তাদের ছবি আগে হলে চালালে যেমন আয় হতো এখন সেরকম হয় না। দেব-জিতদেরও বয়স হয়েছে। তাদের একঘেয়েমি ছবি দর্শক আর কত দেখবে। তারাও নতুন কিছু দিতে পারছেন না। তাদের বাজার হারানোর পেছনে এটাও একটা কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘যৌথ প্রযোজনার ছবি একই সঙ্গে দুই দেশে মুক্তি দিলে মোটামুটি ব্যবসা হয় কিন্তু সাফটা চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দিলে ব্যবসা তেমন হয় না। কারণ সাফটা চুক্তির মাধ্যমে ছবি আসে ওই দেশে মুক্তির কয়েক মাস পরে। তত দিনে ইউটিউবসহ নানা মাধ্যমে ছবিটি দেখে ফেলে দর্শকেরা। তখন আর সেসব ছবি চালিয়ে ব্যবসা করা যায় না। তবে তথ্য মন্ত্রণালয় যদি ভারতীয় বাংলা ছবিগুলো চালানোর ব্যাপারে উদার হয় মানে ওই দেশে মুক্তির দিনেই যদি আমাদের দেশেও ছবিগুলি চালানো যায় তাহলে হলগুলো ভালো ব্যবসা করতে পারবে। হলিউডের ছবি যদি এদেশে একই দিনে মুক্তি পেতে পারে তাহলে ভারতীয় বাংলা ছবি একই দিনে মুক্তি দিতে সমস্যা কোথায়? এই বাধাগুলো দূর করতে হবে। ভারতীয় বাংলা ছবিও একই দিনে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

এদিকে ২৮ জুন বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে ভারতীয় বাংলা ছবি ‘ভোকাট্টা’। ছবিটি আমদানি করছে শাপলা মিডিয়া। একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেব অভিনীত ‘কিডন্যাপ’ ছবিটিও বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে। একাধিক সূত্রে জানা যায়, আগের চেয়ে বেশ সস্তা দামেই আমদানি করা হয়েছে এই ছবিগুলো। দেশ রূপান্তরকে একটি সূত্র জানিয়েছে, দেবের কিডন্যাপ আমদানি করা হয়েছে মাত্র ৩০ লাখ টাকায়। আগে দেবের ছবি আমদানি করতে গুনতে হতো প্রায় কোটি টাকার মতো। এখন সস্তায় আমদানি হচ্ছে এসব ছবি। যদিও শুরুতে দেবের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছবিটি কমদামে না ছাড়তে চাইলেও পরে বাজার বিবেচনা করে কম দামেই ছেড়ে দেয়। একই অবস্থা চলছে জিতের ছবি নিয়েও। এ ব্যাপারে জানতে শাপলা মিডিয়ার কর্ণধার সেলিম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কত টাকায় ছবি আমদানি করা হয়েছে সে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, দেশ রূপান্তরের সূত্রের তথ্যকেও সঠিক নয় বলে দাবি করেন। সেলিম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেবের ছবিটির যে আমদানি মূল্যের কথা বললেন তা সঠিক নয়। আসলে ‘কিডন্যাপ’ কত টাকায় আমদানি করা হয়েছে সেটা বলতে চাই না। শুধু বলব যথাযথ দাম দিয়েই ছবিটি আমরা এনেছি। তবে এটা স্বীকার করছি যে, ভারতীয় বাংলা ছবির বাজার আগের মতো আর নেই।’

সাফটা চুক্তির মাধ্যমে আগে অসংখ্য ছবি মুক্তি দিয়েছে জাজ মাল্টিমিডিয়া। জাজের সিইও আলিমুল্লাহ খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অনেক দিন হলো যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ বন্ধ করেছি। আগে সাফটা চুক্তির মাধ্যমে ছবি আনলেও এখন সেটাও আনছি না। কারণ এখনকার বাজার আগের মতো নেই। ভারতীয় বাংলা ছবি আমদানি করেও ভালো ব্যবসা করা যাচ্ছে না। ফলে বাজার যেহেতু কমে যাচ্ছে, সে কারণে ছবির আমদানি মূল্যও সস্তা হবে। আর আমরা যেহেতু এখন আর আমদানি করি না ফলে সঠিক তথ্যটা আমরা জানি না। তবে এটা ঠিক বাজার আগের মতো আর রমরমা নেই।’

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে সাফটা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮টি ছবি পাঠানো হয় ভারতে। অপরদিকে ভারতের আটটি ছবি আনা হয় বাংলাদেশে। সেসময় নানা জটিলতার কারণে বাংলাদেশ সবগুলো ছবি প্রদর্শন করতে না পারলেও বছরখানেকের ব্যবধানে ভারতীয় পাঁচটি ছবি প্রদর্শন করে। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা মাত্র একটি ছবি ভারতে প্রদর্শিত হয়।

২০১৪-২০১৫ সালের মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করা ‘যুদ্ধশিশু’, ‘খোকা’, ‘খোকা ৪২০’, ‘ওয়ান্টেড’, বেপরোয়া’ বাংলাদেশের হলে প্রদর্শিত হয়।

২০১৬ সালে সাফটা চুক্তির মাধ্যমে  ‘রাজা ৪২০’-এর বদৌলতে বাংলাদেশে ‘কেলোরকীর্তি’, ‘ছুঁয়ে দিলে মনে’র বিপরীতে ‘বেলাশেষে’,  ‘সম্রাটের’ বিনিময়ে মুক্তি পায় ‘অভিমান’।

২০১৭ সালে সাফটা চুক্তির মাধ্যমে  ‘রাজা বাবু’ ছবির বদৌলতে বাংলাদেশে মুক্তি পায় কলকাতার ছবি ‘তোমাকে চাই’। নগর মাস্তানের বদলে  ‘হরিপদ ব্যান্ডওয়ালা’। এ ছাড়া ‘ইয়েতি অভিযান’, ‘বলো দুগ্গা মাঈকি’, ‘ওয়ান’ ,‘পোস্ত’সহ বেশ কিছু ছবি মুক্তি পায়।

২০১৮ সালে ‘জিও পাগলা’, ‘ইন্সপেক্টর নটি কে’ ‘নূরজাহান’সহ বেশ কিছু ছবি মুক্তি পায়।

২০১৯ সালের শুরুতেই বিসর্জন মুক্তি পায়। এবার ২৮ জুন মুক্তি পাচ্ছে ‘ভোকাট্টা’, এরপর আসবে ‘কিডন্যাপ’সহ আরও বেশ কিছু ছবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত