মাথা কেটে ব্যাগে ভরে থানায় যুবক

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৯, ০১:০৫ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মন্দিরে ঘুমিয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে হত্যার পর মাথা কেটে বাজারের ব্যাগে ভরে যুবকের থানায় হাজির হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে নিহত লিটন ঘোষের ভাই স্বপন ঘোষ বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় এ মামলা করেন। এতে নাসিরনগর উপজেলা সদরের পরমানন্দ দাসের ছেলে লবু দাসকেই একমাত্র আসামি করা হয়েছে।

লবু দাস ক্যাটাফ্রেনিক সিজোফ্রেনিয়াতে (মানসিক সমস্যার চূড়ান্ত পর্যায়) আক্রান্ত বলে ধারণা করছেন চিকিৎসকরা। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

লিটন ঘোষকে হত্যার পর তার শরীর থেকে মাথা কেটে লবু দাস ব্যাগে করে থানায় নিয়ে হাজির হওয়ার ঘটনায় নাসিরনগরসহ পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় তোলপাড় চলছে।

এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের আতংক বিরাজ করছে। এমন নৃশংসতার সাম্ভব্য কারণ নিয়ে জেলার সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে চলছে চুলচেড়া বিশ্লেষণ। এমন বর্বরতম উপায়ে কেনো একজনকে হত্যা করা হলো, আবার কেনোইবা তার মাথা নিয়ে থানায় গিয়ে হাজির হলো- এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন মো. শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লবু দাসের বিভিন্ন কাজের বর্ণনা এবং পারিপার্শিক অবস্থা বিচেনায় মনে হচ্ছে সে ক্যাটাফ্রেনিক সিজোফ্রেনিয়াতে মানে মানসিক সমস্যার চূড়ান্ত পর্যায়ের রোগী। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে মানুষের মাথা কেটে থানায় গিয়ে হাজির হওয়া কঠিন। এমন আচরণের মানুষকে জেলের ভেতরে আলাদা সেলে রাখতে হয়।’

নাসিরনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবীর হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে লিটন ঘোষের প্রতি লবু দাসের কোনো প্রকার আক্রোশ ছিল। কারণ লিটনের নাম শুনলেই ক্ষেপে উঠছে লবু। লবু দাসের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সে নাসিরনগর বাজারের গোডাউনের পাশে একটি খুপড়িতে বাস করতো। মাঝে মাঝে বাজারের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করতো। লবু জানিয়েছে, লিটন দাস নাসিরনগরে আসলেই লবুর ঘরে গিয়ে তাকে বিরক্ত করতো। এ কারণে লিটনের প্রতি রাগান্বিত ছিলো লবু।’

তবে শুধুমাত্র এমন রাগের কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা কবীর হোসেন আরও বলেন, ‘লবু দাসের কথা-বার্তা এবং পারিপার্শিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। লবুকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। লবুকে এলাকায় পাগলাটে বা মানসিক সমস্যাযুক্ত বলা হলেও তাকে ঠাণ্ডা মাথারই মনে হয়েছে। সে থানায় চুপচাপই ছিল। আর পাগল বা অপ্রকিৃতস্থ হলে খুন করে থানায় আসতো না। মাথা নিয়ে পাগলামি করে বেড়াতো।’

এদিকে লবুকে জিজ্ঞাসাবাদে জড়িত নাসিরনগর থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, লবু ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন। তার চলাফেরা ছিল অসংলগ্ন। তার গাঁজা সেবনের অভ্যাস ছিল। তাকে এলাকার মানুষ ভয় পেতো। লবুর পরিবারের লোকজন ভারতে বসবাস করে। ২০১২ সালের আগে তিনি তার  স্ত্রীকে হত্যা করে ভারত থেকে বাংলাদেশে চলে আসেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। নাসিরনগরে এসেও এলাকার রাজু নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। ওই ঘটনায় জেলও খাটেন লবু। পরে ২০১২ সালের ১৫ জানুয়ারি আপন চাচা সাবেক ইউপি সদস্য মতি লাল দাসকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন তিনি। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন লবু।

লবু দাস সম্পর্কে জানতে চাইলে নাসিরনগর থানার ওসি সাজিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে লবু পুরোপুরি সুস্থ না। সুযোগ পেয়ে ঘুমন্ত মানুষকে খুন করে মাথা নিয়ে থানায় উপস্থিতি তাই প্রমাণ করে। এমন আক্রমনাত্বক ঘটনা সে আগেও ঘটিয়েছে। তার বিরুদ্ধে তার চাচাকেও হত্যার অভিযোগ আছে। এলাকার মানুষের মুখে শুনেছি সে তার স্ত্রীকেও হত্যা করেছে।’

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের মতি ঘোষের ছেলে লিটন ঘোষ গত সোমবার নাসিরনগর উপজেলা সদরের ঘোষপাড়ায় তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসে। মঙ্গলবার দুপুরে তিনি গৌর মন্দিরের নাট মন্দিরে ঘুমিয়েছিলেন। এ সময় লবু ধারালো দা দিয়ে লিটনকে হত্যা করেন। পরে শরীর থেকে মাথা আলাদা করে সেটি বাজারের ব্যাগে করে নিজেই থানায় গিয়ে উপস্থিত হন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত