আপনার দুই বছরের শিশুর জন্য খেলনা গাড়ি কিনে এনেছেন। হয়তো কিছুক্ষণ পরেই দেখবেন আপনার শিশু গাড়ি বাদ দিয়ে খেলনা গাড়ির প্যাকেটটা নিয়ে খেলছে। বাচ্চা কী চায় তা জানার সঙ্গে তার খেলনা সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন। বাজার ঘুরে শিশুদের শিক্ষণীয় খেলনা সম্পর্কে লিখেছেন রানা আহমেদ
খেলনা কেনার সময়
বারডেম হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা জানালেন, খেলনা হতে হবে এমন যেন শিশু তার বয়স অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে সে খেলনাটা দিয়ে কীভাবে এবং কী খেলবে।
খেলনাটি কি বয়স উপযোগী? এটি কি নিরাপদ? খেলনা কি ক্রিয়েটিভিটি, আগ্রহ এবং কল্পনাশক্তি বাড়ানোর সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে? খেলনা দিয়ে কি কোনো ইন্টার্যাকশন শুরু করা যাবে? এটি কি কোনো কিছু শেখানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে?
এই প্রশ্নগুলোর ৩ থেকে ৪টার উত্তর যদি ‘না’ হয় তাহলে ঐ খেলনা না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সেটি শুধু পয়সা খরচ করা ছাড়া আর কিছু হবে না। এমনকি ভুল খেলনা শিশুর শারীরিক ও মানসিকÑ দুদিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ব্যক্তিত্ব বিকাশে খেলনা
আপনার শিশুরও প্রয়োজন খেলনার। খেলনা এবং খেলা শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশেরই মাধ্যম। একজন মানুষ ছোটবেলায় কী ধরনের খেলনা দিয়ে খেলেছে, তার প্রভাব পড়ে তার ব্যক্তিত্বের ওপর। শিশুর জন্য খেলনা বাছাইয়ে তাই হতে হবে সচেতন। কিছু বিশেষ বিষয়ের প্রতি খেয়াল রেখে শিশুর খেলনা বাছাই করা উচিত।
শিশুর বয়স : শিশুর বয়স অনুযায়ী খেলনা কিনুন। অনেক খেলনার বাক্সের গায়ে বয়সসীমা লেখা থাকে। শিশুর বয়স ২ হলে ২ থেকে ৪ বছরের বাচ্চাদের খেলনাই তার উপযুক্ত। বয়সের তুলনায় বড়দের খেলনা দিয়ে খেললে মানসিক বিকাশ বাধা পড়ে ও ব্যক্তিত্ব গঠনে চাপের সৃষ্টি হয়।
পছন্দ : খেলনার ব্যাপারে শিশুর পছন্দকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আপনার পছন্দের থেকেও যেন শিশুর পছন্দ বেশি হয়। আপনার পছন্দ হয়েছে বলেই কিনে ফেলবেন অথচ শিশু খেলছে না এমনটা যেন না হয়। এমন খেলনা নির্বাচন করুন যেটা শিশুকে আনন্দ দেবে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে যেন সেই খেলনা নিয়ে খেলতে পারে। গবেষণায় জানা যায় পছন্দসই খেলনা দিয়ে খেলতে পারলে শিশু উদার ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং মিশুক প্রকৃতির হয়।
রং: শিশুরা রঙের প্রতি খুব সহজেই আকৃষ্ট হয়। একদম ছোটদের রং, আকার চেনাতে বিভিন্ন রঙিন খেলনা, ব্লক কিনে দিতে পারেন। এতে খেলতে খেলতে শিখে যাবে নানা রং, বিভিন্ন আকার। তবে খেলনার রঙের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক রঙের প্রতি জোর দেওয়া উচিত। কারণ ছোট শিশুদের চোখের ওপর এসব রং কম চাপ ফেলে। রঙিন খেলনা শিশুর ব্যক্তিত্বে নিয়ে আসে প্রাণোচ্ছলতা। রঙিন খেলনা মানসিক বিকাশেও সহায়ক।
টক্সিসিটি : ছোট শিশুরা জিনিস হাতে পেলেই মুখে দেয়। এটা মনে রেখেই খেলনা নির্বাচন করা উচিত। বিভিন্ন খেলনার প্যাকেটে লেখাও থাকে নন-টক্সিক। এটা দেখে কিনবেন। টক্সিক খেলনা শিশুর জন্য ক্ষতিকর।
সৃজনশীলতা : শিশুর জন্য এমন খেলনা নির্বাচন করুন যা আপনার শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। কিনতে পারেন স্ট্রাকচার মেকিং বা ব্লক জাতীয় খেলনা যার সাহায্যে নানা ডিজাইন বা ছবি তৈরি করা যায়। মনের আনন্দে খেলতে খেলতে নতুন কোনো কিছু তৈরি করতে পারলে উৎসাহ আরও বাড়বে। এ ধরনের খেলনা শিশুকে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসী করবে। নেতৃত্বের লক্ষণও তৈরি হবে।
নিরাপত্তা : শিশুর জন্য এমন খেলনা নির্বাচন করুন যাতে কোনো বিপদ বা ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। ধারালো বা তীক্ষè প্রান্তযুক্ত খেলনা, গানস অ্যান্ড ফলস বুলেটস, মেকানিক্সের খেলনা শিশুদের থেকে দূরে রাখাই ভালো।
খেলতে খেলতে শেখা : পছন্দ, ভালো লাগা বুঝে নিয়ে খেলার মাধ্যমে কী করে তার জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়ানো যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বিভিন্ন পাজল গেম, কনস্ট্রাকটিভ সেটিংস, অ্যাক্টিভিটি কিউবস, ব্লকস এসব কিছুই হতে পারে।
যেখানে পাবেন : শিশুর উপযোগী খেলনা সব এলাকায় কমবেশি পাওয়া যায়। তবে শিশুদের সব ধরনের খেলনা পাওয়া যাবে বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, রাপা প্লাজা, ওয়ারী, কিডস অ্যান্ড মম-বনানী, সিটি হার্ট, পল্টন, নিউ মার্কেট, ইস্টার্ন মল্লিকা, এলিফ্যান্ট রোডের দোকানগুলোয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন ওয়েব সাইট যেমন আজকের ডিল, দারাজ, আলীবাবাবা ও বিক্রয়.কমসহ ফেইসবুকের বিভিন্ন পেইজ থেকেও কিনতে পারবেন।
দরদাম : ইস্টার্ন মল্লিকার নিচতলার সুমন গিফট অ্যান্ড ক্রাফটের মালিক মো. সুমন রহমান বলেন, খেলনার ডাইস ও কোয়ালিটির ওপর দাম নির্ভর করে বিভিন্ন রকমের ডল কিনতে পারবেন ২৫০ থেকে ৫০০০ টাকায়; এনিমেল সেট ৩০০ টাকা। ৮০ থেকে ৩০০ টাকায় পাবেন বিভিন্ন ধরনের পাজল। পিয়ানো এবং গিটার কিনতে পারবেন ৬০০ টাকার মধ্যে। ব্লকপাজল সেট ১৭০ থেকে ২২০০ টাকা, ফিকশন ৫০ থেকে ১০০০, ব্যাটারিচালিত গাড়ি ৩৫০ থেকে ১৮০০, রিমোট কন্ট্রোল ১২০০ থেকে ৪৫০০ এবং বড় খেলনা গাড়িগুলো ২৪০০ থেকে ৪৫০০ টাকার মধ্যে পাবেন।
যে খেলনা শিশুদের দেওয়া উচিত
খেলনা বিশেষজ্ঞরা বলেন ৫ ধরনের খেলনা শিশুদের সৃজনশীলতা, আগ্রহ এবং কল্পনাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
খোলা ও বন্ধ জাতীয় খেলনা : এই ধরনের খেলনাগুলোর মধ্যে আছে সাধারণ ব্লক টাইপ খেলনা (যেমন, লেগোর সেট), জোড়া লাগানো যায় বা শর্টিং করা যায় এমন খেলনা, পাজল। এই খেলনাগুলো দিয়ে শিশুরা অনেকক্ষণ ধরে নিজেদের মতো করে অথবা অন্যকে সঙ্গে নিয়ে খেলতে পারে। ২ বছর বয়স থেকেই এই ধরনের খেলনাগুলো দিয়ে শিশুদের মধ্যে অভ্যাসটা তৈরি করে ফেলা জরুরি।
ক্রাফটিং করার জিনিসপত্র : শিশুর বয়স ৩ হওয়ার পর থেকেই ক্র্যাফটের নানারকম কাজে অংশ নিন তার সঙ্গে। কেবল কাঁচি, রঙিন কাগজ, রং পেন্সিল আর আঠা দিয়েই কত মজার ক্র্যাফটের কাজ করা যায়। এসব খেলনা আপনি অনলাইন থেকেও কিনতে পারবেন।
পাওয়া জিনিস : শিশুদের কল্পনাশক্তি অসীম। যেকোনো জিনিসকে তারা খেলার কাজে ব্যবহার করতে পারে। সেটি চামচ, প্লেট, গাছের ডাল থেকে শুরু করে পানি, বালি, ইটের টুকরা, শুকনো পাতা যেকোনো কিছু হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন প্রকৃতিতে পাওয়া যায় যেসব জিনিস যেমন পানি, বালি, পাতা ইত্যাদি কুড়িয়ে পাওয়ার জন্য বা ওগুলো নিয়ে খেলার জন্য শিশুদের ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমাদের ঢাকা শহরের শিশুরা এই সুযোগটা পায় খুব কম। তাই ছুটির দিনে খালি ফাস্ট ফুডে গিয়ে খাওয়ার চেয়ে আপনার শিশুকে আশপাশের কোনো পার্কে নিয়ে যান। শুকনো ডাল, পাতা, ঘাস, ফুল ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন।
বোর্ড গেম : নানা ধরনের বোর্ড গেম শিশুর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়। তার চেয়ে বড় কথা এই খেলাগুলো খেলতে হয় আরও অন্তত একজনের সঙ্গে। অভিভাবকরা নিজেরা এই খেলায় অংশ নিতে পারেন শিশুর সঙ্গে। সমস্যা সমাধানের খেলনা দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি শিশুর নানাভাবে সামাজিক যোগাযোগ হয়। এতে করে বন্ধুত্ব, যোগাযোগ এবং সমঝোতা করার দক্ষতা বাড়ে।
রোল প্লে খেলনা : রান্নাঘরের সেট, ঘরের সেট, ডাক্তার রোল-প্লে সেট ইত্যাদি খেলনা শিশুদের রোল-প্লে করার সুযোগ তৈরি করে দেয়, নিজেদের মতো একটি জগৎ তৈরি করতে এবং নিজের কল্পনাশক্তিকে বাড়াতে সাহায্য করে।
