মানুষের নিস্পৃহতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৯, ১০:২৫ পিএম

বেশ কিছু দিন যাবৎ দিন বলা ঠিক হবে না, বরং কয়েক যুগ ধরেই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা প্রবল নিস্পৃহতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সামনে কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ তাকিয়ে থাকে, প্রতিবাদ করে না। আজকাল একটা নতুন প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা হলো ক্যামেরা ফোনে ছবি তুলে তা ফেইসবুকে পাঠিয়ে দেওয়া। পাঠিয়ে দিলেই শেষ হয় না, শুরু হয় এ নিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া। সম্প্রতি বরগুনার ঘটনায় লক্ষ করা গেছে দিবালোকের স্পষ্ট ঘটনাকেও ভুল খাতে প্রবাহিত করা যায়। দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করল একজন নিরপরাধ মানুষকে, অনেক লোক দাঁড়িয়ে থাকল, ছবি তুলল, তার স্ত্রী যখন এসে বাধা দিল তখন তার পাশে কেউ দাঁড়াল না। একই ঘটনা ঘটেছিল ফেব্রুয়ারি মাসে অভিজিতের হত্যার সময়ও। সে সময় অবশ্য ছবি তুলে ফেইসবুকে পাঠানোর ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়নি। অভিজিতের স্ত্রী’র চিৎকারে উপস্থিত জনতা এবং পুলিশ কেউই এগিয়ে আসেনি।

বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এটা কি তাহলে আত্মরক্ষার প্রবণতা নাকি ঘটনার নৃশংসতায় একটুখানি মজা পাওয়া! প্রাচীনকালে রোম নগরীতে রাজা-বাদশারা কোনো এক বীরের সামনে বাঘ ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্য আমরা সিনেমায় দেখেছি, গল্পেও পড়েছি। প্রতিটি মানুষের ভেতরেই যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য একটা যুক্তি থাকে। যারা ঘটনার সময় উপস্থিত থাকেন তারা প্রথমেই নিজেকে অত্যন্ত দুর্বল ভাবেন। মনে করেন এই ঘটনায় তার করার কিছুই ছিল না, বরং জীবনটাই চলে যেতে পারত। আর একটু বুদ্ধিমান লোকেরা ভাবেন যারা খুনি তাদের হাত অনেক লম্বা, তাদের পেছনে আছে পুলিশ-প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা, সেখানে আমি কোন চুনোপুঁটি? মাঝখান থেকে সারা জীবনের জন্য এই খুনিদের শত্রু হয়ে থাকতে হবে। মানুষের এমন আশঙ্কাও অমূলক নয়। এটা তো সত্যি যে, খুনি নয়ন এর আগেও নানা ঘটনায় ধরা পড়ে জেলে গেছে কিন্তু আইন-আদালতের মারপ্যাঁচে সে আবার বেরিয়েও এসেছে। পুলিশের তদন্তকাজ শেষ হয় না, সাক্ষীরা ভয়ে উপস্থিত হয় না, বিচারকার্য বিলম্বিত হতে থাকে। তদন্তকাজ দ্রুত করার স্বার্থে সরকার এখন প্রতি থানায় তিনজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের পদ সৃষ্টি করেছে। একজন সার্বিক, একজন তদন্ত এবং একজন অপারেশনের দায়িত্বে থাকবেন। ঢাকায় একটি থানায় পঞ্চান্নজন পর্যন্ত সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োজিত আছে, মূলত তদন্ত কাজের জন্য। ঢাকার বাইরেও এই ব্যবস্থা বহাল আছে। এই ব্যবস্থা বহাল থাকার পরেও তদন্তকাজ বিলম্বিত হবে কেন?

এখন যদি সমগ্র ব্যবস্থা এবং সমাজ দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যায় তাহলে আমাদের সাধারণ নাগরিকদের কিছুই করার নেই। নাগরিকদের যদি কিছুই করার না থাকে তাহলে প্রাণিজগতের নিয়মে শুধু বেঁচে থাকা এবং চোখ-কান বুজে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ফেইসবুকে নিহত রিফাতের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কেউ কেউ তার সাহসের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শত শত প্রতিবাদ এসেছে এবং এই প্রতিবাদীরা ফেইসবুক হাতে পেয়ে যা তা বলে বসছে। প্রকাশ্য দিবালোকে তার স্বামীকে হত্যা করা হলো, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আয়েশা সেটা প্রতিহত করার চেষ্টা করল, স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করল, অথচ এই খুনের জন্য নাকি সে-ই দায়ী। ঠিক আছে মানলাম নয়ন আয়েশার প্রেমে পড়েছিল, হতে পারে আয়েশাও আপত্তি করেনি, কিন্তু বিয়েটা হয়ে ওঠেনি। এরকম লক্ষ লক্ষ ঘটনা আমাদের সমাজে আছে। আয়েশার সঙ্গে বিয়ে হলো রিফাতের। এখানে রিফাতের কী দোষ? তার মানে কি এই দাঁড়ায় না যে, যার হাতে অস্ত্র আছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে সেই আয়েশা বা এমন যেকোনো মেয়ের মালিক হয়ে যাবে? এই মালিকানায় যে কেউ হস্তক্ষেপ করলে তার মৃত্যু অনিবার্য!

রাজনৈতিক দল বা প্রশাসন বা পুলিশ সবাই নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তার রক্ষক। তিনজনই সরাসরি নাগরিকদের রক্ষার কাজে নিয়োজিত। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেখা যাচ্ছে রাজনীতির সঙ্গে দুর্বৃত্তায়নের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যাকে অনেক সময়ই আমরা সিন্ডিকেট বলে থাকি। রাজনৈতিক প্রশয় ছাড়া কোনো ধরনের বড় অপরাধ করা সম্ভব নয়। রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে পুলিশ। পুলিশও সব কিছু জানে এবং যে কোনো আসামিকে ধরার ক্ষমতা তাদের আছে। বরগুনার আসামিরা যে এখনো ধরা পড়েনি এটা অস্বাভাবিক। পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের কোথায় থাকবে তারা? এটা অসম্ভব। আরও দুঃখজনক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আসামি ধরার নির্দেশ দিতে হয় কেন? স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কী করছে? বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল যে আসামিদের আমরা ধরেছি এবং দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরেও আজ পর্যন্ত সব আসামি ধরা পড়েনি। তাহলে তারা কি ইতিমধ্যেই সীমান্ত অতিক্রম করে গেছে? এ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের নির্দেশনাও রয়েছে যাতে আসামিরা সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে। তাহলে দেখা যাচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা এসব কিছুর চাইতে নয়ন গংদের ক্ষমতা অনেক বেশি।

প্রশয়কারী হিসেবে একজন সাংসদের এবং একজন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নাম এসেছে। এই দুজনও কোনো কথা বলছেন না। এলাকার বয়স্ক এবং দায়িত্বশীল মানুষেরা এই ঘটনায় মুখ খুলেছেন, তারা স্পষ্ট বলেছেন এদের বিচার হবে না কারণ এরা রাজনীতি এবং প্রশাসনের আশ্রয়ে-প্রশয়ে বেড়ে উঠেছে। যারা প্রশ্রয় দিয়ে থাকে তারাও নিজেদের ঝুঁকির কথা ভাবছে না। তারা একবারও চিন্তা করতে পারছে না যে দুবৃৃর্ৃৃত্তদের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে যে এরা নিজেদের চক্ষুলজ্জাকে প্রথমেই ধ্বংস করে দেয়। কাজেই দুর্বৃত্তদের আক্রোশের তীর প্রশ্রয়দাতাদের দিকেও নিক্ষিপ্ত হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের জানা ইতিহাসে হাজারে হাজারে।

আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য একজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে নাটক লিখেছিলাম। এই অফিসারটির নাম আব্দুস সাত্তার খান। তিনি পুলিশ সার্ভিসে অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, কখনো তিনি কোনো প্রভাবশালীর কাছে আত্মসমর্পণ করেননি, কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তিনি তার বিছানাপত্র, জামা-কাপড় সবসময় প্রস্তুত রাখতেন এই কারণে যে, যেকোনো সময় তার বদলি হতে পারে ও চাকরিচ্যুতি হতে পারে। তিনি যা বেতন পেতেন তাই দিয়েই সংসার চালাতেন। কখনো ভাতের অভাবে মুড়িও খেতেন। তিনি ঊধ্বর্তন ও অধস্তন কোনো কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতেন না। ফলে মানুষটি একসময় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসে এই সাত্তার খানের মতো অফিসার নিশ্চয়ই আছেন, কিন্তু তারা কি পুরস্কৃত হচ্ছেন? রাজনীতিবিদদের মধ্যে নিশ্চয়ই আপসহীন অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন যারা পদের লোভে বা কর্তৃত্বের স্বার্থে কোনো আপসরফার মধ্যে যান না। তারা কি ক্ষমতায় থাকতে পারছেন?

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাজনীতি আর জনকল্যাণের মধ্যে নেই। রাজনীতি ডুবে গেছে অকল্যাণ ও দুর্নীতির গভীর অন্ধকারে। এই সুযোগে সাধারণ মানুষের ভাবনাচিন্তায় প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা। মানবিক মূল্যবোধ নির্বাসিত হয়েছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ এসব হারিয়ে সমাজটা ক্রমাগত নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। অর্থ সে যেভাবেই উপার্জিত হোক না কেন সে প্রতিপত্তি এবং সম্মানের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। আমাদের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে দেখেছি মানুষের মূল্যায়ন তার কর্মে, মহত্ত্বে, দায়িত্বশীলতায়। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি সবকিছুর মূলে অর্থ। আর এই অর্থই হয়ে দাঁড়াচ্ছে সকল অনর্থের কারণ। দুর্নীতি করে, খুন করে, মিথ্যা বলে পার পাওয়া যায় এই টাকার গুণেই। কাজেই চাই টাকা শুধু টাকা। রাজনীতিতে বা চাকরিতে যারা ক্ষমতাবান, বছর বছর তাদের বিত্ত হয়ে উঠছে সীমাহীন। সুইস ব্যাংকেও বাংলাদেশের অর্থ জমার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এইসবের কারণে যা সবচেয়ে এগিয়ে আসছে তা হলো মানুষের নিস্পৃহতা, প্রতিবাদী মনটিকে হত্যা করা এবং সবশেষে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। আমরা কি চোখ বন্ধ করে একটুখানি ভাবব কোথায় যাচ্ছি?

আমাদের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে দেখেছি মানুষের মূল্যায়ন তার কর্মে, মহত্ত্বে, দায়িত্বশীলতায়। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি সবকিছুর মূলে অর্থ। আর এই অর্থই হয়ে দাঁড়াচ্ছে সকল অনর্থের কারণ। দুর্নীতি করে, খুন করে, মিথ্যা বলে পার পাওয়া যায় এই টাকার গুণেই। কাজেই চাই টাকা শুধু টাকা। রাজনীতিতে বা চাকরিতে যারা ক্ষমতাবান, বছর বছর তাদের বিত্ত হয়ে উঠছে সীমাহীন। সুইস ব্যাংকেও বাংলাদেশের অর্থ জমার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এইসবের কারণে যা সবচেয়ে এগিয়ে আসছে তা হলো মানুষের নিস্পৃহতা, প্রতিবাদী মনটিকে হত্যা করা এবং সবশেষে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা

লেখক

নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত