সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মানবতার দেয়াল ও দানের ঝুড়ি

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৯, ১১:২৭ পিএম

একটি দেয়াল। সেখানে কয়েকটি হ্যাঙ্গার লাগানো হয়েছে। সেখানে ঝুলছে বিভিন্ন ধরনের কাপড়। শার্ট, টি-শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, কামিজ, শিশু পোশাক। একটি ব্যানারে কিংবা দেয়ালেই রং-তুলিতে লেখাÑ আপনার যা প্রয়োজন নেই এখানে রাখুন। আপনার যা প্রয়োজন এখান থেকে নিন। এটাই মানবতার দেয়াল। ইংরেজিতে ‘ওয়াল অব হিউম্যানিটি’ অথবা ‘ওয়াল অব কাইন্ডনেস’।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানবতার এই দেয়াল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মহাখালী, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, ভাসানটেক, মিরপুরসহ আরও অনেক জায়গায়। ব্যানার থেকেই বোঝা যায় ব্যবহৃত পুরাতন কাপড় যদি মানবতার দেয়ালে টাঙানো হয় তবে গরিব অভাবী লোকজন যারা কাপড় কিনতে পারছেন না তারা এই মানবতার দেয়াল থেকে সংগ্রহ করে নেবেন। কাকরাইলে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সামনে হ্যাঙ্গারের পরিবর্তে একটি কাঠের আলমারিই রাখা হয়েছে, উদ্দেশ্য সম্ভবত কাপড় ছাড়াও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনিময়ের ব্যবস্থা করা।

মানবতার দেয়াল ধারণার উৎপত্তি ইরানে, ২০১৫ সালে। আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলো ইরানের ওপর অবরোধ চাপিয়ে দেওয়ায় সেখানকার দারিদ্র্য প্রকট আকার ধারণ করে। এমন সময় কোনো এক অজ্ঞাত ব্যক্তি মানবতার দেয়াল ধারণার উদ্ভব ঘটান এবং একটি দেয়ালকে ‘মানবতার দেয়াল’ হিসেবে চিহ্নিত করে শীতের কাপড় ঝুলানোর ব্যবস্থা করেন ও দরিদ্র ব্যক্তিরা সেখান থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে শুরু করে। দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এই পদ্ধতি এবং তা বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশেও ওই একই বছরে মানবতার দেয়াল প্রতিষ্ঠিত হয়। মাগুরার আরপাড়া প্রাইমারি মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন আক্তার শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য এই উদ্যোগ নেন। তবে ব্যাপকতা লাভ করে ২০১৭/১৮ সালে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় মানবতার দেয়ালগুলো প্রধানত তরুণদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পুরাতন কাপড় বিতরণের ব্যবস্থা করতে। বাংলাদেশে এমন কার্যক্রম তরুণদের উদ্যোগে পরিচালিত হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ধরনের উদ্যোগে সরকারি কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেছেন। একটি সংবাদে দেখা যায় একটি জেলার ডিসি মানবতার দেয়াল উদ্বোধন করছেন। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগেও এই ধরনের কার্যক্রমের সংবাদ চোখে পড়ে।

পুরাতন কাপড় সংগ্রহ ও বিতরণের উদ্যোগ বাংলাদেশে এটা প্রথম নয়। বরং শত বছর ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ একে অপরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যুগ যুগ ধরে পুরনো কাপড়-চোপড় গরিবদের মধ্যে বিতরণ করার রীতি ছিল শহর ও গ্রামে। দুর্যোগের সময় এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর ট্রাক নিয়ে ছাত্র-যুবকদের ত্রাণ হিসেবে বিতরণের জন্য পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি। এমনকি ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার থেকে লাখো শরণার্থী এই দেশে আশ্রয় গ্রহণ করার পর পুরাতন কাপড় সংগ্রহ এবং বিতরণের উদ্যোগ লক্ষ করা গিয়েছিল। এছাড়া প্রত্যেক বছরই শীতে দরিদ্রদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করা হয়।

তবে শীতকাল কিংবা জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন ব্যতিরেকে পুরাতন কাপড় সংগ্রহ বা বিতরণ সম্ভবত কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

এ ব্যাপারে কোনো স্টাডির রেফারেন্স দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।  ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ‘মানবতার দেয়াল’-এর উদ্যোগ সফলতা অর্জন করতে পারছে না। প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের বরাতে অগ্রগতি উল্লেখ করে প্রচারের অভাব এবং সাধারণ মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্বকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত মানবতার দেয়ালে ঝুলন্ত কাপড় দেখেও এই অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

মানবতার দেয়াল কেন বাংলাদেশে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না, তার সম্ভাব্য কিছু কারণ অনুমান করা যায়। গত দুই তিন দশকে বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। এদেশের মানুষের প্রধান দুটি মৌলিক প্রয়োজনÑ খাদ্য ও বস্ত্রের অভাব অনেকাংশেই দূর হয়েছে। দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। এক দশক আগেও বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষার চাল সংগ্রহ করত ভিক্ষুকরা। গ্রামে মজুরির অংশ হিসেবে নগদ অর্থের পাশাপাশি ধান-চাল কিংবা ভাত-তরকারি দেওয়ার প্রচলন ছিল। কারণ তখন ক্ষুধার কষ্ট ছিল, এখন বরং নগদ অর্থের অভাব প্রকট। এছাড়া গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির সাফল্যে নামমাত্র মূল্যে এখন পরার জন্য কাপড় কিনতে পাওয়া যায়। শহরের সর্বত্র তো বটেই, গ্রামেগঞ্জেও এখন সস্তায় পোশাক কেনা সম্ভব হচ্ছে। মানবতার দেয়াল কাক্সিক্ষত মানের সাফল্য না পাওয়ার এটা উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে।

অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের কারণে যেমন ভাত-কাপড়ের কষ্টের উপশম হয়েছে, তেমনি অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য কিছু সমস্যারও কারণ হয়েছে। বিভিন্ন কারণেই ব্যবহার্য জিনিসপত্রের আয়ু ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, ফলে অপ্রয়োজনীয় কাপড় থেকে শুরু করে প্লাস্টিক পণ্য, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জামাদি, ইত্যাদির বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়ছে। ইলেক্ট্রনিক্স এবং লৌহজাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ দেশে শুরু হলেও তা উল্লেখযোগ্য নয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশ অপর্যাপ্ত।

উন্নত বিশ্বে এই সমস্যা আরও প্রকট হওয়ায় সেখানে সমাধানেরও বিভিন্ন পন্থার প্রচলন ঘটেছে। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে এ ধরনের গার্হস্থ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মুনাফা এবং অমুনাফাভোগী অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র কাপড় নয়, পুরাতন আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে এবং বিতরণের ব্যবস্থা করে। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান হলো অক্সফাম।

অক্সফাম একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় তাদের ডোনেশন সেন্টার রয়েছে। সব সেন্টার একই সঙ্গে ডোনেশন সংগ্রহ এবং বিক্রিÑ দুই কাজই করে থাকে। তবে, সব সেন্টার সব জিনিস গ্রহণ করে না, তাই অক্সফামের ওয়েবসাইটে কোন সেন্টার কী গ্রহণ করে তা উল্লেখ করা আছে।  সাধারণত তারা যা ডোনেশন হিসেবে গ্রহণ ও বিক্রি করে থাকে, তার মধ্যে কাপড় (এমনকি মেয়েদের অন্তর্বাসও), ব্যাগ, বই, মিউজিকের সরঞ্জাম, সিডি, ডিভিডি, ছবি, অলংকারাদি, রান্নাঘরের সরঞ্জামাদি, খেলনা, মোবাইল ফোন, হালকা ও ভারী ফার্নিচার ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যবহার উপযোগী নয় এমন কাপড় রিসাইকেল করে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করে বিক্রি করা হয়। এই বিক্রি যেমন তাদের ডোনেশন সেন্টার কাম শপ থেকে করা হয়, তেমনি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও করা হয়। এমনকি, অক্সফাম অনলাইনেও বিক্রি করার ব্যবস্থা রেখেছে। ডোনেশন হিসেবে পাওয়া এইসব সামগ্রী বিক্রয় করে পাওয়া অর্থ তারা দুস্থদের জন্য, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, পরিচালিত দারিদ্র্য বিমোচনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় করে।

ডোনেশন সংগ্রহের জন্য আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পন্থা হলো ‘ডোনেশন বিন’ বা ‘দানের ঝুড়ি’ স্থাপন।  আবাসিক এলাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ডোনেশন বিন স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠান ভেদে বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র ডোনেশন হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ডোনেশন বিক্রি করে কেউ মুনাফা অর্জন করে, কেউবা অন্যান্য সামাজিক কাজে ব্যয় করে। কিছু প্রতিষ্ঠান আছে তারা সরাসরি তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতরণের ব্যবস্থা করে।

ঘরের পুরাতন কাপড়, গৃহস্থালি সরঞ্জামাদি, আসবাবপত্র ইত্যাদি ব্যবস্থাপনায় এই ‘দানের ঝুড়ি’ মডেল বাংলাদেশেও অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এই উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়। সেক্ষেত্রে, উদ্যোক্তাদের অবশ্যই মুনাফালোভী হওয়া উচিত হবে না এবং সর্বক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে হবে। ডোনেশনভিত্তিক এমন কার্যক্রমের বিস্তৃতি ঘটলে একদিকে যেমন স্বল্প আয়ের ও দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকা সহজতর হবে তেমনি অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিদের মধ্যেও কল্যাণকামিতার মানসিকতার বিস্তৃতি ঘটবে।

লেখক : ব্যাংকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত