ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে প্রেম ও শারীরিক সম্পর্কের পর তা অস্বীকার ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, ওই পরিবারের প্রতারণা ও নির্যাতনে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ছাত্রীটি। এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে দিশেহারা সে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের শেরপুর এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে সিরাজুল খানের (২৭) বিরুদ্ধে এ অভিযোগ। ভুক্তভোগী ওই কিশোরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি কলেজের ছাত্রী। এ ঘটনায় সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই ছাত্রী।
থানায় করা অভিযোগ, কলেজছাত্রী ও তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেসবুকে শেরপুর এলাকার সিরাজুল খানের পরিচয় হয় ওই কলেজছাত্রীর। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়। এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সিরাজুল ওই কলেজছাত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শারীরিক সম্পর্কও স্থাপন করেছেন। একপর্যায়ে ওই কলেজছাত্রী সিরাজুলকে বিয়ের কথা বললে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
জারা গেছে, এরপর ওই কলেজছাত্রী সিরাজুলের বাবা-মাকে বিষয়টি জানান। প্রথমদিকে প্রেমের সম্পর্ক অস্বীকার করলে ছাত্রী ফেসবুকে তাদের চ্যাট ও ছবি দেখালে পরিবার বিষয়টি বুঝতে পারে।
পরবর্তীতে ওই কলেজছাত্রীর মাসহ অন্য অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিয়ের জন্য সিরাজুল বিয়ের জন্য রাজি হন বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে সুহিলপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কাজি সাহারুলসহ কয়েকজন শেরপুর গ্রামে গিয়ে ছাত্রীর পক্ষে দেনদরবার করেন বলেও জানা গেছে।
জিডি সূত্রে জানা গেছে, বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করার পর সিরাজুল ও তার পরিবারের লোকজন বিয়ে হবে না বলে জানিয়ে দেন। এ ঘটনার পর ওই কলেজছাত্রী শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সালিস-বৈঠক হলেও কোনো সমাধান আসেনি।
সর্বশেষ গত ৯ জুলাই বিকেলে ওই কলেজছাত্রী সিরাজুলের বাড়ি গিয়ে আবার বিয়ের কথা বললে তিনি সব সম্পর্ক অস্বীকার করেন এবং কলেজছাত্রীকে মারধর ও তার পরিবারের লোকজনদের গালিগালাজ করেন।
একই সঙ্গে ওই কলেজছাত্রীর ছবি-ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়ে সম্মানহানিরও হুমকি দেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর খবির উদ্দিন ও ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজান আনসারী সালিসের কথা স্বীকার করে বলেন, শেরপুর গ্রামে বসা সালিস বৈঠকে ছেলে-মেয়ের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে চিকিৎসার কথা বলে আমরা সালিস মুলতবি করেছি।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার) মো.আলমগীর হোসেনের সঙ্গে কলেজ ছাত্রী ও তার মা তার অফিসে সাক্ষাৎ বিষয়টি প্রতিকারের দাবি জানান।
আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা কলেজছাত্রীর বিষয়টি শক্তভাবে নিয়েছি। খোঁজখবর করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ওই কলেজছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, ওর (সিরাজুল) কারণে আমার সব মানসম্মান গেছে। এলাকাবাসী সবাই জানে আমি সিরাজে বউ। এখন ওর সঙ্গে যদি আমার বিয়ে না হয় আমি আর মুখ দেখাতে পারব না। আমার মরণ ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছি। আমি একটা আশায় বেঁচে আছি ও আমাকে বিয়ে করবে, আমি ওর বউ হব।
তিনি আরো জানান, সিরাজুলের পরিবার আমাকে দু’বার মারধর করেছে। ওর মায়ের পা ধরে কান্নাকাটি করেছি আর তিনি লাথি দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন। তাদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে অসুস্থ থাকায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছি। আমি এখন কী করব, কোথায় যাব?
তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
কলেজছাত্রীর মা জানান, সিরাজুল আমার মেয়েকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে তার সর্বনাশ করেছে। পিতৃহীন এই মেয়েকে নিয়ে আমি অকূল সাগরে পড়েছি। সিরাজুল ও তার পরিবারের প্রতারণার শিকার হয়ে আমরা এখন প্রতিকারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার মেয়ের চেহারার দিকে তাকানো যায় না। প্রতারক ছেলে ও তার পরিবারের কঠোর শাস্তি চাই।
তবে অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে সিরাজুল খানের মুঠোফোনে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জিডি তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর মডেল থানার এসআই শরীফুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জিডির অনেকাংশের সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা আরো তদন্ত করে দেখছি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
