তিন খাস পুকুর ঘিরে পাউবো ও ভূমি অফিসের ‘বাণিজ্য’

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৯, ১২:৩৩ এএম

কয়েকটি বহুতল ভবনসহ দেড় শতাধিক স্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার ভূমি অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তিনটি সরকারি খাস পুকুর দখল করে। এক বছর মেয়াদি (একসনা) বন্দোবস্ত নিয়ে এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে কলাপাড়া পাউবো এবং মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের যোগসাজশে।

স্থানীয়রা জানান, ভূমি অফিস লাগোয়া দুই পুকুর স্থানীয় ভূমি অফিসকে ম্যানেজ করেই ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। পাউবোও একসনা বন্দোবস্তের নামে নামমাত্র মূল্যে বিকিয়ে দিয়েছে সরকারি পুকুর। সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের কতিপয় অসাধু কর্মচারী দখলদারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে মাত্র একশ গজ দূরে সরকারি খাস পুকুরটির চারপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে ৪০টি পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা স্থাপনা। স্থানীয় প্রভাবশালী শাহজাহান খলিফা, দুলাল ডাক্তার, সত্তার মুসল্লি, আবদুল মালেকসহ ছয়জন তুলেছেন দ্বিতল পাকা ভবন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এ পুকুর পাড়েই।

এ পুকুর থেকে ২০ গজ দূরে মহিপুর-সেরাজপুর সড়কের পাশে বেড়িবাঁধ খাদা যা স্থানীয়দের কাছে কালীবাড়ি পুকুর নামে পরিচিত। এ পুকুরের চারপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে অন্তত ৫০টি পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা স্থাপনা। সামান্য যে ফাঁকা জায়গাটুকু রয়েছে সেখানে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে ময়লা আবর্জনা। বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে সেটিতেও খুঁটি গেড়ে, পাটাতন তৈরি করে দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

এ পুকুরের পাড় দখল করে চার তলাবিশিষ্ট স্থাপনা তৈরি করেছেন মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা ফজলু গাজী। ইউপি সদস্য দুলাল ও জাকির হোসেন, কালাম শিকদার, মালেক হাজী, কালাচান কর্মকার গড়ে তুলেছেন দ্বিতল আবাসিক ভবন। এসব ভবনের পয়োসহ সব বর্জ্য নিষ্কাশন করা হচ্ছে এ পুকুরেই। ফলে পুকুরটি এখন হয়ে উঠেছে মশা-মাছির প্রজননকেন্দ্র। পুকুরটির পচা পানির দুর্গন্ধে বিপন্ন হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ।

একইভাবে এ পুকুরটি থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরের দ্বিতীয় কালীবাড়ি খাস পুকুরটি দখল করে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩৫টি আধাপাকা ও কাঁচা আবাসিক স্থাপনা। মহিপুর থানা কৃষক লীগের সভাপতি আবদুস সত্তার, হোটেল সাইদসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের পরিচয়ে পুকুরটির চারপাশ দখল করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তুলেছে। এসব আবাসিক বাসাবাড়ির পয়োনালার গন্তব্য এ পুকুর। এতে পুকুরটির পানি এখন আর ব্যবহারযোগ্য নয়।

একই অবস্থা মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পেছন লাগোয়া পুকুরটির। এর উত্তর পাড় দখলের পাঁয়তারা চলে প্রতিনিয়িত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ জানানÑ ওয়ান ইলেভেনের সময় এ তিনটি পুকুর পাড়ে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ভেঙে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে কতিপয় সুবিধাবাদী নেতার ছত্রচ্ছায়ায় ভূমি অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় অসাধু কর্মচারীর সহায়তায় গড়ে ওঠে পাকা স্থাপনা।

সাবেক ইউপি সদস্য হাজী আবুল হোসেন হাওলাদার (৬৫) বলেন, এই তিনটি পুকুর ছিল সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের অবলম্বন। আগে মাছের চাষ হতো। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পুকুরগুলোর অস্তিত্ব এখন বিলীন। ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৮ সালে তার দোকানে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের টিম একটি দোকানের পাটাতন ভেঙে পানি সংগ্রহ করতে করতে তার দোকনটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ফজলু গাজী, কালাচাঁন কর্মকারসহ কয়েকজন দখলদারের দাবিÑ পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ডিসিআর কেটে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা পাকা স্থাপনা তৈরি করেছেন।

মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) আজিজুর রহমান বলেন, বিরোধিতা করায় আগের কর্মকর্তাকে ন্যক্কারজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে।

পাউবোর কলাপাড়া সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মো. অলিউজ্জামান বলেন, মহিপুরে যেসব বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৮ সালে। এখন যেসব স্থাপনা রয়েছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিবুর রহমান বলেন, মহিপুরের বেদখল খাস পুকুর ও জমি উদ্ধারে দ্রুত এবং জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোনো প্রভাবশালীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত