চুয়াডাঙ্গায় নিহত মাদ্রাসাছাত্র আবির হুসাইন হত্যায় জামায়াতে ইসলামির ইন্ধন খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যার তথ্য উদ্ঘাটনে আটক মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে পুলিশের কয়েকটি ইউনিট।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিহত ছাত্রকে দীর্ঘদিন ধরে বলাৎকার করা হতো, বলাৎকারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে এ হত্যা, এটি এখন পুলিশের কাছে পরিষ্কার।
একই সঙ্গে ঘাতকও মাদ্রাসারই কেউ, এটি পুলিশ নিশ্চিত। তবে পুলিশের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুনি মাদ্রাসার শিক্ষকদের মধ্যেই একজন। তবে আমরা মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফকেই সন্দেহের এক নম্বরে রেখেছি। কারণ আবির হুসাইন নিখোঁজ হওয়ার সময় সুপার মাদ্রাসায় ছিলেন না।
আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ আসাদুজ্জামান মুন্সি জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর এশার নামাজে দাঁড়িয়েও বিচলিত দেখা গেছে মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফকে। নামাজে দাঁড়ানোর পর কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বের হন মাদ্রাসা সুপার।
মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক, ছাত্রদের আলাদা আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে বলে জানান মুন্সি আসাদ।
এদিকে বুধবার রাতে নিহত আবির হুসাইনের মা গোলাপী বেগম ছেলে হত্যার ঘটনায় আলমডাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় তিনি অজ্ঞাতনামা আসামি করেছেন।
মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে থানার ইন্সপেক্টর শেখ মাহবুবর রহমানকে।
বৃহস্পতিবার রাতে শেখ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। সব তথ্যকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করছি। মাদ্রাসার সুপার মুফতি আবু হানিফ জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনাতে জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর ভয়াবহ হামলা মামলার এজাহারনামীয় আসামি ছিলেন আবু হানিফ। তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। মাদ্রাসাছাত্র আবির হুসাইনকে হত্যায় জামায়াতের কোনো যোগসূত্র আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে হত্যার ২৪ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে মাদ্রাসার পাশের একটি পুকুর থেকে আবিরের কাটামাথা উদ্ধার করে খুলনার একটি ডুবুরি দল।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহ জানান, হত্যার পর আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিহত ছাত্র আবির হুসাইনের মাথাটি খুঁজে বের করার। বুধবারের ব্যর্থ অভিযানের পর বৃহস্পতিবারও সকাল থেকেই আমরা মাথাটি উদ্ধারে অভিযান শুরু করি। একই সঙ্গে র্যাব সদর দপ্তরের একটি ডগ স্কোয়াডের স্পেশাল টিমও আমাদের অভিযানে অংশ নেয়। হত্যার আশপাশের পুকুর-ডোবায়ও ডুবুরি দিয়ে তল্লাশি অভিযান চালাতে থাকি। অবশেষে সকাল ১০টার দিকে মাদ্রাসার অদূরে মাঠের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার হয় নিহত আবির হুসাইনের মাথাটি।
খবর পেয়ে পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান, ঝিনাইদহ র্যাব-৬’র ক্যাম্প কমান্ডার মাসুদ আলমসহ র্যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। এ সময় পুলিশ সুপার স্থানীয় জনতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তৃতা করেন।
পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেন পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার)।
তিনি বলেন ঘাতক এতটাই চতুর ও ঠান্ডা মাথার খুনি যে খুব নিখুঁত পরিকল্পনা করে খুন করা হয় মাদ্রাসাছাত্রকে। এরপর হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে সরিয়ে দিতে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে গুম করা হয়। যাতে সম্প্রতি পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগছে- এটি প্রতিষ্ঠিত করে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যায়।
পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদ্রাসা ছাত্র আবির হুসাইন হত্যার পর আমরা অতি সতর্কতার সঙ্গে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমাদের তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব সহযোগিতা করছে। হত্যা নিয়ে আমাদের কাছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্যও মিলেছে। সেগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ করছি।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আবির হুসাইন মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে মাদ্রাসার অদূরে একটি আমবাগানের ভেতর থেকে তার মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
