মাত্র ২০ বছর বয়স। সদ্য কৈশোর পেরোনো রবিউল হাসানের জগৎটা তবু অন্য সম-বয়সীর মতো নয়। এ বয়সেই দেশের ফুটবলের বড় দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর থেকে ওঠে আসা তরুণ।
তার কাঁধে কখনো উঠছে ক্লাবের ভার, কখনো পুরো দেশের। দলবদলে দেশের বাজারে তো আকাশচুম্বী তার দাম। ৫০ লাখ টাকা!
সদ্য শেষ হওয়ার প্রিমিয়ার লিগে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা রবিউলের এত প্রাপ্তির মাঝেও আছে শূন্যতা। সেই ছোট থাকার কালেই যে হারিয়েছেন মাকে। বাবা আর ভাইয়ে অনুপ্রেরণায় এরপর এগিয়েছেন সব বাধা পেছনে ঠেলে। কিন্তু আজ এ সাফল্যে মায়ের অনুপস্থিতি মর্মে অনুভব করেন রবিউল।
প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ তাই নিজের মনের কষ্টটা লুকিয়ে রাখতে পারেন না। বলে ফেলেন- মা দেখে যেতে পারলেন না ছেলে আজ বড় ফুটবলার।
দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘মা বেঁচে থাকলে তো নিশ্চয়ই অনেক বেশি খুশি হতেন। অথবা মা বেঁচে থাকলে আমি যে স্পোর্টস জগতে আসছি এটা নাও হতে পারত। মা হয়ত চাইত ভালোভাবে পড়াশোনা করি। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হই। তবে মা বেঁচে থাকলে সবচেয়ে তিনিই বেশি খুশি হতেন আজ। দেখতেন তার ছেলে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হচ্ছে, এক মৌসুমে এত লাখ টাকা পাচ্ছে। এ সময় মাকে অনেক মিস করি।’
যখন মা হাফসা বেগমকে হারান, তখন সেভাবে কিছুই বুঝে ওঠা হয়নি রবিউলের। তবে বাবা আর ভাই ছায়া হয়েছিলেন সব সময়। ছেলেদের কথা ভেবে বাবা তো আর বিয়ে পর্যন্ত করলেন না। বড় ভাই মাহবুব হাসান সুমন রবিউলের জন্য বটবৃক্ষ। ফুটবল খেলন সুমনও। সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে যিনি খেলেছেন টি অ্যান্ডটি ক্লাবের হয়ে। তার প্রেরণায় এগিয়ে চলা রবিউলের। তবে এখন ভাইকে ছাড়িয়ে সাফল্যের চূড়ায় তিনি। বাবা জমসের আলীর কথা উঠলে তো রবিউল এভাবে বলেন- ‘আমার সব সাফল্যে কাঁদেন বাবা’।
২০১৬ সালে তৃতীয় বিভাগ ফুটবল থেকে সরাসরি প্রিমিয়ারে সুযোগ করে নিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন রবিউল। আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে এই কীর্তিতে তার সঙ্গে ছিলেন আরো তিন সতীর্থ আবদুল্লাহ পারভেজ, জাফর ইকবাল ও মাহবুবুর রহমান সুফিল। একই বছর প্রথম দুজনের অভিষেক হয়ে যায় জাতীয় দলে। সুফিল জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচ খেলেন গেল বছর শুরুতে। তবে জায়গা হচ্ছিল না রবিউলের।
তাতে দমে যাননি মোটেও। এগিয়েছেন দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে, ‘কোনো হতাশা ছিল না…। ওরা যেভাবে জাতীয় দলে বা বড় বড় ক্লাবে সুযোগ করে নিয়েছিল সেটি আমার মধ্যে জেদ তৈরি করে। ওরা পারলে আমি কেন পারব না। শেষ মৌসুমে কঠোর পরিশ্রম করেছি। নিজেকে সেভাবে পরিচর্যা করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমত। তিনি তো বলেছেনই, ‘‘তুমি পরিশ্রম করো, ফল আমি নিজ হাতে দেব। আমি পরিশ্রমের ফল পেয়েছি।’’
গেল বছর আগস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলে অভিষেক রবিউলের। এরপর থেকেই পাদপ্রদীপের আলোয়। সাতটি ম্যাচ খেলে ২ গোল করেছেন এই সেন্টার মিডফিল্ডার। অথচ তার কাজ মূলত গোল করানো। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে সেটি এই রবিউলের করা একমাত্র গোলে। লাওসের বিপক্ষে দুই লেগ মিলে পাওয়া একমাত্র গোলটি তার পায়ের।
আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া দুই জায়গায় ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে মৌসুম শেষ করেছেন। আসছে মৌসুমে আরো বড় কিছু হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে। এরই মধ্যে নতুন চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস ৫০ লাখ টাকায় তাকে দলে ভেড়াতে চায় বলে গুঞ্জনও চারদিকে।
এত সব সাফল্যের মাঝে রবিউল এখনো দৃঢ় তার লক্ষ্য। প্রিমিয়ার লিগে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা নিয়ে তাই বলছিলেন, ‘দেশের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য ভবিষ্যতে এটা প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। বিপিএলে ৬টা গোল আছে আমার, সেন্টার মিডফিল্ডার হিসেবে। যেটা অনেক ফরোয়ার্ডের নেই। এর মধ্যে শেষ কিছু ম্যাচ খেলতেও পারিনি আমি।’
এখন পর্যন্ত সদ্য শেষ হওয়ার মৌসুমকে নিজের সেরা মৌসুম মানেন রবিউল। আর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট মানেন কম্বোডিয়া ও লাওসের বিপক্ষে করা গোলকে। নিজেকে আরো শাণিত করে যিনি চান দেশকে বড় কিছু উপহার দিতে, ‘আমি নিজেকে সেরা হিসেবে তৈরি করতে চাই। যাতে আমাদের ফুটবলের হারানো দিনগুলো ফিরে আসে। সেটা আমাদের হাত ধরে হোক বা অন্য কারো হাত ধরে। তবে আমরাই যেন সেটার স্টার্টিং পয়েন্ট হতে পারি।’
এই পর্যন্ত আসার পেছনে চারজনের অবদানকে বড় করে দেখেন রবিউল। বাবা, ভাইয়ের কথা তো জানা হলো আগেই। অন্য দুজন- গোলাম রায়হান বাপন ও মারুফুল হক।
গোপালপুর সুতি ভি এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক গোলাম রায়হানের কাছেই হাতেখড়ি হয়েছিল রবিউলের। আর আরামবাগে জাতীয় দলের সাবেক কোচ মারুফুল হকের অধীনে খেলেছেন শেষ দুই মৌসুম। যেখানে নিজের আসল ফুটবল বিকাশ হয়েছে বলে মনে করেন রবিউল।
