‘বিজেপিকে বিশ্বাস করেই আজ আমরা রাষ্ট্রহীন’

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:৫৪ পিএম

আসামে নাগরিক তালিকায় (এনআরসি) ঠাঁই পেতে লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন মানুষ। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায় তাদের অনেকেরই নাম নেই। এতে বিজেপিকে দুষছেন তারা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম গণশক্তি জানায়, আসামের করিমগঞ্জে এশিয়ার বৃহত্তম বিল শনবিল। বিলের পাশে বিশ হাজারের মতো মৎস্যজীবী মানুষের বসবাস। যাদের অর্ধেকেরও বেশি নাগরিকত্ব হারিয়েছেন।

দেশভাগের সময় ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালী থেকে তাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে এসে বসতি গড়েন। এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত হতে আবেদনপত্রে তারা শরণার্থীর প্রমাণপত্র জমাও দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ৬৬ সালের ভোটার তালিকাও দেন, যেখানে তাদের নাম উল্লেখ আছে।

এনআরসি’র খসড়া তালিকায় এসব মানুষের বেশির ভাগেরই নাম আসেনি। কিন্তু নির্বাচনের সময় বিজেপি’র নেতা–কর্মীরা এসে বলে গিয়েছিল, মোদি ক্ষমতায় ফিরলে কারওর নাম বাদ যাবে না। তা শুনেই শনবিলের লোকেরা বিজেপির পক্ষেই নিজেদের সমর্থন জানান।

কিন্তু ৩১ আগস্ট শনিবার প্রকাশিত এনআরসিতে দেখা গেছে,  শনবিলের ষাট থেকে পঁয়ষট্টি শতাংশের নামই বাদ গেছে। সেখানকার বাসিন্দা সুদীপ দাস, কৃষ্ণ দাস, জয়গোপাল দাস, রথীন্দ্র দাস, হরিকান্ত দাস, বীরেন্দ্র দাস ও হীরালাল দাসের পরিবারের কারওর নাম নেই। তারা এখন মোদিকেই দুষছেন। তাদের সকলেরই একটাই ভাষ্য, “বিজেপিকে বিশ্বাস করেই আজ আমরা রাষ্ট্রহীন।”

করিমগঞ্জের তফসিলি সম্প্রদায়ের বড় অংশেরই নাম নেই এনআরসিতে। শিলচর শহরের সোনাই রোডের ডিআইসিসি সেবাকেন্দ্রে এনআরসির আবেদন জমা দেন ২৪২৭ জন। ১০০৩ জনের নামই বাদ পড়েছে। শিলচরের তারাপুর সেবাকেন্দ্রে আবেদন করেন ৩১৬৮ জন। নাম বাদ পড়েছে ১৮৪৬ জনের।

একইভাবে নরমাল ট্রেনিং সেন্টার সেবাকেন্দ্রে আবেদন জমা পড়ে ১৬৮৯টি। এরমধ্যে ৮০০ জনেরই নাম বাদ পড়েছে। নাম নেই দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলী আহমেদের পরিবারের পাঁচজনেরও। নাম বাদ পড়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আনোয়ারা তাইমুরেরও।

কাছাড় জেলার লেবারপুতা গ্রামে একটি পরিবারের আটজন সদস্য এখন রাষ্ট্রহীন। এর মধ্যে বাড়ির প্রধান ইশাক আলী ১৯৫২ সাল থেকে ভোট দিচ্ছেন। এক শিশু নাতনি ছাড়া তিনিসহ তার পরিবারের সবাই নাগরিকত্ব হারিয়েছেন। 

এমনকি শিলচরের বিজেপি বিধায়ক দিলীপ পাল নির্বাচনে আগে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, “মোদি থাকতে হিন্দুদের নাগরিকত্ব হারানোর ভয় নেই।” কিন্তু তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল, তার স্ত্রী অর্চনার পালেরই নাম নেই।

করিমগঞ্জের খলা গ্রামের ফয়জুর রহমান শনিবারই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন তিনি মারা যান। তালিকায় নাম নেই ফয়জুরের স্ত্রী, দুই ছেলে আর তিন মেয়েরও। জমির দলিল, ভোটার তালিকা, আবেদনে সবই জুড়ে দিয়েছিলেন। নাম আছে শুধু বিবাহিত দুই মেয়ের। এদিন হাসপাতালে ফয়জুরের স্ত্রী রুশনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘তার মৃত্যুর জন্য দায়ী বিজেপি।’’

এদিকে নাগরিকত্ব হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে অনেকেই আত্মাহুতির পথ বেছে নিচ্ছেন। গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা এক নারী বুধবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

২০১৫ সালে নাগরিকত্বের তালিকা হালনাগাদ শুরু হওয়ার পর থেকে তালিকা থেকে বাদ পড়ে নাগরিকত্ব হারিয়ে আটক হওয়ার ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন অনেক মানুষ।

‘সিটিজেন ফর জাস্টিস এন্ড পিস’ সংস্থার সংগঠক জমশের আলী এ ধরনের ৫১টি আত্মহত্যার তালিকা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “নাগরিকত্ব হারানোর ভয় থেকে মানসিক আঘাত ও চাপের মধ্যে ছিলেন এসব মানুষ।”

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে হালনাগাদ তালিকার প্রথম খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

আরেক অ্যাকটিভিস্ট প্রসেনজিৎ বিশ্বাস এই তালিকাকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেছেন যা ‘প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করে লাখ লাখ প্রকৃত নাগরিককে রাষ্ট্রহীন করেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত