অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলার ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীরা চিহ্নিত, গ্রেপ্তার ৫

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:৩৮ পিএম

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে পুকুরে ফেলে দেয়ার ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এছাড়া ওই ঘটনায় জড়িত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে, অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলে দেয়ার প্রতিবাদে রবিবার বিক্ষোভ করেছেন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে বিক্ষোভ করে তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছেন।

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদকে শনিবার টেনেহিঁচড়ে ধাক্কা দিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ১২ থেকে ১৫ ফুট গভীর পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

শনিবার রাতেই নগরীর চন্দ্রিমা থানায় সাত শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখসহ ৫০জনকে আসামি করে অধ্যক্ষ নিজেই মামলা দায়ের করেন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করে পুলিশ।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে সারা রাত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২৭ জন শিক্ষার্থীকে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাদের মধ্যে ৫জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রবিবার সকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- শাফি শাহরিয়ার (২৩), সোহেল রানা (২২), বাঁধন রায় (২০), আরিফুল ইসলাম (২৩) ও মেহদী হাসান রাব্বি (২১)। এরা সকলেই রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী।

অধ্যক্ষের করা মামলায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যাদের আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়- প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটার বিভাগের অষ্টম পর্বের ছাত্র কামাল হোসেন সৌরভ, ইলেকট্রনিকসের পঞ্চম পর্বের মুরাদ, পাওয়ারের ছাত্র শান্ত, ইলেকট্রিক্যালের ছাত্র বনি, মেকাট্রনিক্সের ছাত্র হাসিবুল ইসলাম শান্ত, ইলেকট্রমেডিক্যালের ছাত্র সালমান টনি, এই বিভাগের সপ্তম পর্বের ছাত্র হাসিবুল এবং কম্পিউটারের ছাত্র মারুফ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরীর চন্দ্রিমা থানার এসআই তৌহিদুর রহমান বলেন, ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে প্রয়োজনে তাদের রিমান্ড চাওয়া হবে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।

তিনি জানান, ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এই ঘটনায় ১২ থেকে ১৫জন সরাসরি অংশ নেয়। এদেরকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আটককৃতদের কাছ থেকেও বেশ কিছু নাম পাওয়া গেছে। 

এদিকে অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত এবং পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দানকারী পলিটেকনিক ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কামাল হোসেন সৌরভকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগ।

মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি রকি কুমার ঘোষ জানান শনিবার রাতেই রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। পরে রাতেই সুপারিশ পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। একই সঙ্গে সভায় পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

রকি কুমার ঘোষ বলেন, ঘটনার সাথে সৌরভের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাকে বহিষ্কারের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আর এ ঘটনায় মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি কল্যাণ কুমার জয়ের নেতৃত্বে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে ছাত্রলীগের আর কারও বিরুদ্ধে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলার প্রতিবাদে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। রবিবার সকাল থেকেই অধ্যক্ষ প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদকে পুকুরে ফেলে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১ টার দিকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মূল ফটকের সামনে রাস্তায় মানববন্ধন করে তারা।

মানববন্ধন শেষে ৬ দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো- অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার করতে হবে, তাদের স্থায়ীভাবে ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে, কলেজে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে, ক্যাম্পাসে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

উল্লেখ্য, মিডট্রাম পরীক্ষায় ফেল এবং ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা পলিটেকনিক শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কামাল হোসেন সৌরভকে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য শনিবার দুপুরে নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে চাপ দেন। এ নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের তর্কবিতর্ক হয়। এর জের ধরে দুপুরে অধ্যক্ষ নামাজ পড়ে তার অফিসে ফেরার পথে ছাত্রলীগ নেতা সৌরভ এবং তার সহযোগীরা অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পাসের ভেতরের একটি পুকুরে পানিতে ফেলে দেয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ছাত্রলীগ নেতা কর্মীরা অধ্যক্ষকে দ্রুতগতিতে পুকুরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ অধ্যক্ষের হাত ধরে টানছিল আবার কেউ পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলে দিয়ে তারা চলে যায় ।পরে ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা গিয়ে অধ্যক্ষকে পুকুর থেকে টেনে তোলেন।

আরো পড়ুন: অধ্যক্ষকে প্রকাশ্যে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলল ছাত্রলীগ (ভিডিও)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত