গোটা ভারতে পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন। ইন্দোরের মানুষের এ নিয়ে খুব গর্ব। স্মার্ট নগর। তবে সবার মুখে মুখে ফেরা পরিচ্ছন্নতার কথা, ইতিহাসের পাতায় মাথা উঁচু করে থাকা হোলকার সাম্রাজ্য নাকি সেই সাম্রাজ্যের সর্বজয়া মহারানী আহিলিয়া বাই ইন্দোরের মূলে ভাবতে ভাবতে ভাবনা হারায়।
ইন্দোর শহর থেকে বিমানবন্দরের সবুজ-শান্ত-পরিষ্কার পথ ধরে ট্যাক্সি চলে। আহিলিয়া বাই সঙ্গে সঙ্গে চলেন। এই শহরের স্বাধীনচেতা নারীদের ইতিহাসটাও তবে হোলকার মহারানীর সৌজন্যে? প্রশ্নটা মনে নিয়ে বিমানবন্দরে পা রেখে আহিলিয়া বাইয়ের সঙ্গে দেখা। দীর্ঘকায়া পাথরমূর্তি। শাড়িতে নিজেকে সাজিয়ে অনেকটা সাদাসিধে এক বাঙালি রমণীর মতো দাঁড়িয়ে। যেন বলছেনÑ যাবার সময় হলো বুঝি? আরেকটু থেকে গেলে হতো না?
ইন্দোরে থাকা মোটে আট দিন। এত বড় সাম্রাজ্যের ইতিহাস অল্প সময়ে ধারণ করা অসম্ভব। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসের গোলাপি বলে কৃত্রিম আলোর ঐতিহাসিক টেস্টের রোমাঞ্চে এখন ডুবে যেতে হচ্ছে। ইন্দোরে আর কটা দিন থাকার উপায় ছিল না।
শহরটিতে ভারত দলের ক্লিন রেকর্ড। সব জয়। স্থানীয় সাংবাদিকের সেই গর্বে পরিচ্ছন্ন শহরের উল্লেখের কথা শুনে ভারতের ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর সেদিন বলছিলেন, ‘টেস্ট ম্যাচের জন্য দারুণ উইকেট মিলেছে এখানে। আর এটা তো সবসময় ভালো শহর, এখন পরিচ্ছন্নতম। দারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরছি।’ পাশ থেকে বোলিং কোচ ভরত অরুণ যোগ করেন, ‘অসম্ভব পরিচ্ছন্ন শহর। অন্য শহর দেখে শিখতে পারে। এখানকার লোকের গর্বিত হওয়া উচিত। গোটা দেশের জন্য এটা অসাধারণ উদাহরণ।’
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের জেলা ও বিভাগ ইন্দোরে প্রায় ২৩-২৪ লাখ লোকের বাস। একদা রাজ্যের রাজধানী ছিল। শিক্ষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে অতুলনীয়। প্রস্থর যুগ থেকে এই নগরের কথা জানা যায়। মুঘলদের প্রতাপ ছিল এখানে। হোলকার সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুবেদার মালহার রাও হোলকার। সতেরশ শতকের মাঝামাঝি। অল্প বয়সে বিধবা হওয়া পুত্রবধূ আহিলিয়া বাইকে রাজশাসনের জন্য তৈরি করেছিলেন। মালহার মহারাজের হোলকারের মৃত্যুর পর ১৭৬৭ থেকে ১৭৯৫ পর্যন্ত আহিলিয়া বাইয়ের শাসনকাল। ইন্দোরের প্রায় সবকিছুর সঙ্গে এখনো মিলেমিশে একাকার মহারানী আহিলিয়া বাই।
ইন্দোর শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হোলকারদের কীর্তিময় ইতিহাস। শিল্পকলা। সৃষ্টি। স্থাপত্য। ১৮১৮ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজ থেকে স্বাধীন ছিল রাজ্যটা। মারাঠা সাম্রাজ্যে তাদের জন্ম, তাদের সঙ্গে মিলে লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। কিন্তু বরাবর স্বাধীনচেতা হোলকাররা। তারও আগে মালহার রাও ‘হোলকার’ নামের যে সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিলেন সেটি পূর্ণতা পেয়েছিল আহিলিয়া বাইয়ের শাসনামলে। এখন প্রায় তিনশ বছরের আজ হোলকার ইতিহাস।
এখন রাত ৯টা বাজতেই জেগে ওঠে সারাফা বাজারের নাইটফুড কোর্ট। সেখানে বৈচিত্র্যময় ভেজ বা নিরামিষ খাবার। রসনাবিলাসের জন্য রাত ২টা পর্যন্ত মানুষের ঠাসাঠাসি যাতায়াত। দিনের বেলায় যে উৎসবের চিহ্নমাত্র নেই। জুয়েলারি বাজার তখন। আর ওখানে যেতে হলে রাজবাড়া বা হোলকারদের রাজবাড়ী পেছনে রেখে যেতে হবে। একদিক দিয়ে এলে ছত্রি। অন্যদিক দিয়ে গেলে কাঞ্চ মন্দির। মাঝখানে ইমামবাড়া, বহু পুরনো ভবন, তাজিয়া মিছিলের যাত্রাস্থল। লাখো শিখের জুলুশও সেদিন শুরু হলো সেই রাজবাড়ার সামনে থেকে।
রাজবাড়ীর সংস্কারকাজ চলছে। আহিলিয়া বাই খুব ধার্মিক ছিলেন। শিবভক্ত। শুধু ইন্দোর নয়, ভারতজুড়ে মন্দির নির্মাণে তার আগ্রহ ছিল। রাজবাড়ী লাগোয়া মন্দিরের দোতলা গ্যালারি। যেখানে হোলকার সাম্রাজ্যের ইতিহাস ছবি থেকে শুরু করে নানা ফ্রেমে বাঁধানো। পুতুল সাজিয়ে কাচের বাক্সে সময়কাল তুলে ধরা। সেখানে শাড়ি পরে সিংহাসনে আসীন আহিলিয়া বাই রাজকার্য চালাচ্ছেন। কাছে তার পালকিটা এখনো শক্তপোক্ত। যেন মহারানীর ফেরার অপেক্ষায়।
ভিন্ন ধর্মের সঙ্গে সৌহার্দ্য তৈরি করে শাসন চলেছে তখন। সেনাবাহিনী শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে কৃষিকাজে আধুনিকতা আনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরালো, টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি তৈরি থেকে স্যানিটেশন, শিল্পকলার বিস্তারে যোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা, নারীরা যাতে আয়ে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল না থেকে স্বাবলম্বী হতে পারে সেই ব্যবস্থা করা, অর্থনৈতিক মুক্তি, মুসলিমদের মসজিদ নির্মাণের অনুমতি, বৈদ্ধদের শান্তির প্রসারে সহায়ক হওয়া, মহারানী সব করেছেন। শিশুকালে লেখাপড়া শিখেছেন মায়ের কাছে। শিক্ষার বিস্তারে কেমন ছিলেন? ইন্দোর এডুকেশন হাব এখন।
কী করেননি এই আধুনিক চেতনা ও মানসিকতার রানী!
শ^শুরের মৃত্যুর পর তার স্মরণে ছত্রি নির্মাণ, যেখানে শিল্পের দুরন্ত প্রকাশ। কাঞ্চ মন্দির আসলে তিন তলার একটি পুরো কাচে মোড়ানো মন্দির। বিরাট কোহলি কিংবা ক্রিকেটাররা আর ঘরের ছেলে সালমান খান নাকি এখানে এলে গণেশ মন্দিরে হাজিরা দেওয়া মিস করেন না। বড় জাগ্রত নাকি আহিলিয়া বাইয়ের এই মন্দির। আরও আগে থেকে এই শহরের সঙ্গে মুসলিমদের যোগটাও বেশি বোঝা যায় মসজিদ-মাজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখে।
উনিশ শতকের শুরুতে হোলকাররা আধুনিক এক প্রাসাদ গড়ে তোলেন শহর থেকে কিছুটা দূরে। লালবাগ প্যালেস। ওখানে মূলত ইংরেজ শাসকদের আতিথেয়তা দেওয়া হতো। তিন তলার সাদা মহল মনকাড়া। ইউরোপিয়ান আধুনিকতার সঙ্গে হোলকারদের আভিজাত্য মিলে সে এক অনুপম সৃষ্টি।
ইন্দোর শহরের দুই ভাগ। হোলকারদের ভাগ এখন পুরনো। নতুন শহর গড়ে উঠেছে অন্য প্রান্তে। তবে পুরনোর টান বড় বেশি এখানে। এদিকটাতেই হোলকার স্টেডিয়াম। হোলকার ক্রিকেট দল ছিল এক সময়। গোটা শহরে শুধু স্থাপত্যে নয়, স্মরণেও খুব চমকপ্রদ হোলকারদের উপস্থিতি।
আর যেখান থেকে শুরু সেই বিমানবন্দরেও আহিলিয়া বাই। তারপর? বোর্ডিংয়ের ডাক আসে। হোলকারদের অনুপম ইন্দোর ছেড়ে ‘সিটি অব জয়’ কলকাতার বিমানে ওঠার সময় হয়। তবু কেবল ধাওয়া করে চলে মহারানী আহিলিয়া বাইয়ের পিছু-ডাক।
