কে দ্যাখে পুরুষের বঞ্চনা

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৩৭ পিএম

সময়টা সত্তরের দশক। ব্যক্তির নাম চার্লস মরিটস। বাড়ি আমেরিকার ডেনভারে। তিনি অবিবাহিত বয়স্ক পুরুষ। তার বয়োবৃদ্ধ মা বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে নিজের খেয়াল রাখার শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য হারিয়েছেন। শিশুর মতোই তারও সারাক্ষণ একজন সেবাদানকারী প্রয়োজন। কিন্তু চার্লস একা সামলাতে পারেন না। রুটি-রুজির জন্য তাকে বাইরে যেতে হয়। তাই, মাকে দেখভালের জন্য একজন নার্স নিয়োগ করেন। চার্লসের অনুপস্থিতির সময়টায় মাকে দেখে নার্স। কিন্তু এখান থেকেই যত বিপত্তির শুরু।

‘কেয়ারগিভার’ বা পরিবারের অসুস্থ, বৃদ্ধ, অসক্ষম সদস্যের সেবা-শুশ্রষাদানকারী ব্যক্তি হিসেবে ট্যাক্স বা কর পরিশোধের ক্ষেত্রে চার্লসের কিছু বিশেষ ছাড় বা সুবিধা পাওয়ার কথা। মার্কিন কর আইনেই সেই সুবিধা দেওয়া আছে। কিন্তু চার্লসকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল। বঞ্চনার কারণ হলো, আইনে বলা আছে ‘কেয়ারগিভার’ হবেন একজন নারী। কিন্তু চার্লস একজন পুরুষ। তাই সেবাদানকারী হলেও পুরুষ হওয়ার কারণে তিনি কর-সুবিধা পাবেন না।

বিষয়টি আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন আইনজীবী রুথ বেডার গিন্সবার্গ। গিন্সবার্গ ছিলেন মার্কিন সমাজে নারীর আইনি সমতা বিধানের লড়াইয়ের পুরোধা। চার্লস মরিটসের প্রসঙ্গটিকে দিয়ে গিন্সবার্গ আদালতে প্রমাণ করেছিলেন, আইনে বৈষম্য বিরাজমান। আইন নারী ও পুরুষকে ভিন্ন-ভিন্নভাবে বঞ্চিত করছে। গিন্সবার্গ প্রমাণ করেছিলেন, আইন সব নাগরিককে সমান চোখে দেখছে না। দেখলে, কর-সুবিধা চার্লসেরও প্রাপ্য। সেই বৈষম্যমূলক আইনকে চ্যালেঞ্জ করে গিন্সবার্গের জিতে আসার ঘটনা নিয়ে ‘অন দি বেসিস অফ সেক্স’ নামে একটি সিনেমা রয়েছে। সিনেমাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আইন সব নাগরিককে সমান চোখে দেখার কথা থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে হয় না।

আমাদের দেশের আইনও নারী-পুরুষকে অনেক ক্ষেত্রে সমান চোখে দেখে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত, সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন এবং বিবাহ-বিচ্ছেদ উত্তর সন্তানের অভিভাবকত্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষে বৈষম্য বিরাজমান বলে দেশের মানবাধিকারকর্মী এবং নারী অধিকার কর্মীরা বলে আসছেন। আজ এই লেখায় অবশ্য নারীর বঞ্চনার দিকে বিশেষ আলোকপাত করব না। পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম-কানুন, রীতি-প্রথাগুলো যে শুধু নারী নয়, পুরুষের বুকেও জগদ্দল পাথরের মতন চেপে বসেছে সেদিকে দৃষ্টিপাত করাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বাংলাদেশের সমাজে জন্মের পর থেকে একটি মেয়ে শিশুর বঞ্চনার জীবন শুরু। কিন্তু জন্মের পর থেকে একটি পুত্র বা ছেলেশিশুও যে বঞ্চনার শিকার হতে থাকে সেটা আমাদের অধিকাংশ এখনো বুঝতেই পারি না। শিশু বয়স থেকেই একটি ছেলেকে ক্রমাগত ‘নিরাবেগ’, ‘বলিষ্ঠ’ ও ‘দৃঢ়’ হতে শেখানো হয়। মানসিকভাবে শক্ত বানানোর নামে এমনকি কেড়ে নেওয়া হয় ছেলেশিশুটির কান্নার অধিকার। সে কাঁদলে তাকে শুনতে হয়, ‘মেয়েদের মতন কাঁদবে না’! কান্না ও আবেগ আটকে রেখে-রেখে ‘কঠিন’ পুরুষের প্রতিভূ হয়ে ওঠার এই চর্চা করতে-করতে ছেলেদের ভেতরের মানুষটাও কি বামন হয়ে যায়?

বটবৃক্ষের চারাকে বনসাই বানানোর প্রয়োজনে টবে কেটে-ছেঁটে রাখতে-রাখতে গাছটি বামন হয়ে থাকে; সেটি আর কোনোদিন মহীরুহ হতে পারে না। তেমনই কি হয় ছেলে-মানুষদের দশাও? তারাও কি সারা জীবন ঊন-মানুষ হয়ে থাকে? যদি তাই না হবে, তাহলে এমনকি বাবা-মা বা স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুর ঘটনাতে এই সমাজ পুরুষকে কেন কাঁদতে দিতে চায় না? কেন বলে, ‘পুরুষ মানুষ! কাইন্দো না! মানুষে কী বলবে!’ অথচ চোখের জলের কোনো নারী-পুরুষ নেই! জন্মমাত্র কান্নায় রয়েছে সব মানুষের সমান অধিকার!

বাংলাদেশের সমাজের ঘরে-ঘরে ছেলেসন্তান পাওয়ার উদগ্র বাসনা দেখে, ছেলেসন্তানদের জন্য আজকাল বড্ড মায়া হয়! মাঝে-মাঝে ভাবি, আহারে! ছেলে শিশুটা! সে নিজেও জানে না, এই বাংলাদেশি সমাজে জন্মমাত্রই সে কতটা প্রতারিত! জন্মের পর থেকে তাকে ডিমটা, দুধটা, কলাটা, মাছের মুড়োটা খাইয়ে-খাইয়ে বড় করা হয় এই আশায় যে, সে একদিন ফলবতী গাভীর মতন পাত্র ভরা-ভরা দুধ দেবে। এই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ার মধ্যে ‘সন্তানের জন্য ভালোবাসা’ কোথায়? এটা তো দেখছি, বিকিকিনির হাট। এখানে ভালো দামে যে গরুটা হাটে বিকোবে তার দিকেই গৃহকর্তার সব মনোযোগ। যদি তাই না হবে, যদি সব সন্তানের জন্য ভালোবাসা সমানই হবে, তাহলে মেয়েশিশু আর হিজড়া শিশুর প্রতি সমাজ কেন এত উদাসীন? কেন মেয়েশিশু হয় নিগৃহীত? কেন হিজড়া শিশুদের পরিচয়কে পরিবারগুলো লুকিয়ে ফেলে? কেন তাদের পুরুষের ‘বেশ’ দেওয়া হয়? একটি হিজড়া শিশুর জীবন কত বঞ্চনার ভেতর দিয়ে যায় সেই গল্প অরুন্ধতি রায় দেখিয়েছেন তার ‘দি মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ উপন্যাসে। আর সম্প্রতি ঢাকায় মুক্তি পেয়েছে সিনেমা ‘ন ডরাই’। একজন তরুণীর সার্ফার হওয়ার পথে তার পরিবার ও সমাজ বিন্ধ্যাচলের মতন কী প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেই কাহিনীই উঠে এসেছে এই সিনেমায়।

অপরাপর সব লিঙ্গকে অবদমিত করে পুরুষকেন্দ্রিক সমাজ-কাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে পুরুষই যে বন্দি হয়ে পড়েছে, সেই সত্য পশ্চিমা দুনিয়া বুঝতে শুরু করেছে। চালর্স মরিটসের ঘটনা সেই সত্যেরই উদাহরণ। মাল-সামালের ভার বহনের জন্য যেমন ঘোড়া চাই, তেমনি সমাজের তৈরি করা রীতি ও প্রথার ভার বয়ে নিতে প্রয়োজন পুরুষ! তাই, অনেক পুরুষ চাইলেও বেছে নিতে পারে না নিজের মনের মতন জীবন।

বাংলাদেশে কোনো শিশু বা কিশোর নৃত্যশিল্পী হতে চাইলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবার থেকে তাকে বাধা দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়, ‘এসব মেয়েদের কাজ’। কোনো তরুণ নৃত্যশিল্পী পুরুষালি ভঙ্গিমায় না হেঁটে, কমনীয়ভাবে হাঁটলে তাকে বলা হবে, ‘হিজড়া’; তাকে করা হবে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ। কোনো তরুণ লম্বা চুল রাখলে তাকে বলা হবে, ‘মেয়েদের মতন লম্বা চুলওয়ালা ছেলে। কোনো পুরুষ স্ত্রীর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশ্যে জানান দিলে তাকে বলা হবে ‘স্ত্রৈণ’। কোনো পুরুষ বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকলে তাকে দেওয়া হবে ঘরজামাইয়ের কলঙ্ক; তাকে দেওয়া হবে লোকলজ্জা। আধুনিককালের কোনো তরুণ, নিজে চাকরি-বাকরি না করে ‘হাউজ-হাজব্যান্ড’ বা চাকরিজীবী স্ত্রীর স্বামী হিসেবে গৃহকর্মের কাজ বেছে নিলে তাকে নিয়ে করা হবে ঠাট্টা-মস্করা।

পুরুষকেন্দ্রিক এই সমাজ নারীকে বন্দি করতে গিয়ে নিজেই বন্দি হয়ে পড়েছে। স্ত্রীকে ঘরে আটকে রাখতে গিয়ে সে নিজেও আটকে পড়েছে রুটি-রুজি ও কর্র্তৃত্ববান-দায়িত্ববান হওয়ার এক গোলকধাঁধায়। পুরুষের এই শেকল খোলার একমাত্র উপায় হলো নারীর শেকল খুলে দেওয়া। চোখের জলের যেমন কোনো নারী-পুরুষ বিভাজন নেই, তেমনি স্বাধীনতারও নেই কোনো লিঙ্গ পরিচয়।

নারী ফুটবল খেলবে নাকি বিমান চালাবে, নারী বিয়ে করবে নাকি অবিবাহিত থেকে ‘সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে’ থাকবে এই জাতীয় সিদ্ধান্ত নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি পুরুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও অন্যায়। পুরুষ নাচ শিখবে নাকি তীর চালানো শিখবে, চুল লম্বা রাখবে নাকি ছোট করবে এটা তার ইচ্ছের ব্যাপার। ‘মেয়েরা বিদ্যালয়ে গার্হস্থ্য অর্থনীতি পড়বে, আর ছেলেরা পড়বে কৃষিশিক্ষা’Ñ এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিশুরা জন্মের পর থেকে পরিবার ও বিদ্যায়তনের প্রতিটি স্তরে এমন লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে বলেই, পূর্ণবয়স্ক নাগরিক হওয়ার আগেই তাদের মধ্যে ঢুকে যায় লিঙ্গ বৈষম্যের নিরাময় অযোগ্য অসুখ।

নারীর মুক্তির লড়াইয়ে যেমন পুরুষকে দরকার, তেমনি পুরুষের মুক্তির লড়াইয়ে প্রয়োজন নারীর অংশগ্রহণ। তবে, বাংলাদেশে সমাজ যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক, সমাজের আইনকানুন-নিয়মনীতি-রীতি-প্রথা সবই যেহেতু পুরুষকে কেন্দ্রে রেখে রচিত হয়েছে, তাই পুরুষের দায়িত্বটা বেশি। পুরুষ হিসেবে আপনি যদি দেখেন, আপনার পরিবারে বা আপনার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বা পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ নারীর ওপর সমাজের রীতি-প্রথা-আকাক্সক্ষার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে তাহলে সেটার প্রতিবাদ করুন। আরেকজনের মুক্তির পক্ষে সেøাগান দিতে-দিতেই রচিত হবে আপনার মুক্তির পথ।

সমাজ বদলে গেছে। এই বদল কারও অনুমতির জন্য অপেক্ষা করে না। বেগম রোকেয়া বা কবি সুফিয়া কামালের আমল আর নেই। সেই আমলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তিরই নিয়ম ছিল না। কিন্তু এই যুগে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সেই যুগে ১৬ বছর বয়সের কোনো অবিবাহিত মেয়ে মানে ‘আইবুড়ো’। এই যুগে ১৬ বছরের আগে বিয়ে দিতে গেলে তা হবে বাল্যবিবাহ এবং বাড়িতে পুলিশ আসবে।

 

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সমাজে বদল ঘটতে থাকে। এই বদল অন্তঃসলিলা নদীর মতন। সহসা চোখে দেখা না গেলেও তা বইতে থাকে। বদলের এই ধারায় এখন এসেছে, পুরুষের মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। এইক্ষণকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই সাধুবাদ জানানো দরকার। পাশাপাশি, নেওয়া দরকার কিছু আইনি পদক্ষেপ। প্রথমেই প্রয়োজন, উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে, তা খুলে দেবে মুক্তির এক নতুন দুয়ার। এর ফলে, কন্যাসন্তানের প্রতি অনাদর ও নিগ্রহ যেমন কমবে, তেমনি কমবে পুত্রসন্তান-নির্ভরতা। এর ফলে, পুত্রসন্তানকে শুধু ‘টাকা কামানোর মেশিন’ এবং ‘বংশ ও সম্পদ’ রক্ষার পাহারাদার ভাবা হবে না। এর ফলে, কন্যাসন্তানের ওপরেও অভিভাবককে দেখভাল করার দায়িত্ব বর্তাবে। ফলে, অভিভাবকদের শেষ বয়সে নিরাপত্তা দেওয়ার ভার শুধু পুত্রসন্তানকে অর্পণের সংস্কৃতিতেও বদল আসবে। এভাবেই, বদলের হাত ধরেই, আসবে পুরুষের মুক্তির দিন।

লেখক

কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত