রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মতো ‘রেগুলেটরি ও মনিটরিং অথরিটির’ উন্নয়ন কার্যক্রম ও স্থাপনা নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ঢাকা হবে স্মার্ট সিটি, তবে অবশ্যই এলাকাভিত্তিক জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজন মাথায় রেখেই নকশা করা হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য, সমৃদ্ধ ও ঘাতসহনশীল মেগাসিটিতে রূপান্তর করা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় এ সেমিনারের আয়োজন করে ডিএনসিসি।
মেয়র আতিক বলেন, ‘নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প ও মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পের মধ্যে ঢাকাকে সচল রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা একাধারে রাস্তা সংস্কার, প্রকল্পগুলো চলমান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন, বায়ুদূষণ নিরসনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিতকল্পে কাজ করে যাচ্ছি। এর সঙ্গে আমাদের নতুন বর্ধিত ১৮টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা দিতেও আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। নতুন এলাকাগুলো গড়ে তোলা হবে আধুনিক ও স্মার্ট সিটির পরিকল্পনামতো। আমরা উন্নয়ন নকশার ড়্গেত্রে এলাকাভিত্তিক জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ আমরা চাই একটি ভালো স্কুলের জন্য যাতে ধানমণ্ডিবাসীকে উত্তরা যেতে না হয়, আবার উত্তরাবাসীকে ধানমণ্ডি আসতে না হয়। কারণ সময়ের মূল্য অপরিসীম, আমাদের সময় বাঁচাতে হবে। একইভাবে নগরবাসী মসজিদ, বাজার, মার্কেট, শপিং মলসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো যাতে নিজ নিজ এলাকাতেই পায়, সেভাবেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তায় গণপরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ ঢাকা বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির ২০-২৫ শতাংশ জোগান দেয়, আমি মনে করি শুধু যাতায়াতে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা বাঁচাতে পারলে এটি আরও উন্নীত করা সম্ভব। তবে ঢাকার মতো একটি দ্রুত উন্নয়নশীল ও ব্যস্ত শহরের জন্য মানুষের মোটিভ, চাহিদা ও ব্যবস্থাপনার জন্য বছরব্যাপী গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা জরুরি। আমাদের মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সেবা সংস্থার সমন্বয় করে কাজ করার বিকল্প নেই।’
সেমিনারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রথম প্রায়োরিটি হলো বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়ন করা। আমরা ১০ বছরে মাথাপিছু আয় একটি সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে এসেছি, যা এখনো ক্রমবর্ধমান। আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্টও আমাদের এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কারণ। আমাদের এই বয়সের শক্তি কাজে লাগাতে হবে। তবে এটিও সত্য যে এই হঠাৎ উন্নয়নের জন্যই অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন ঘটেছে। ফলে নগর কর্তৃপক্ষ পড়েছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। তার মধ্যে রয়েছে জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন। এর সঙ্গে নীতিমালা না মেনে ভবন তৈরি করা এবং সরকারি জমি, জলাধার দখল হয়ে যাচ্ছে।’
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কর্তৃপক্ষেরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যেমন মানুষ ধারণক্ষমতা, গাড়ি পার্কিং, রাস্তার প্রশস্ততাসহ অন্যান্য সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই অনেক বহুতল ভবন নির্মাণে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এর জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও দায়ী। সময় এসেছে আমাদের সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। আমরা জনগণের জন্য কাজ করি, তাই সমন্বয় না হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আছে, তারা কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি মন্ত্রী হওয়ার পর জরিপ করে দেখলাম, ঢাকা শহরের প্রায় ৬৬ শতাংশ বাড়িই রাজউকের নকশা মেনে করা হয়নি, তার মধ্যে অনেকেই আবার কোনো রকম নকশা অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করেছে। আমাদের জানা মতে, ঢাকা শহরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ নকশা না মেনে করা বাড়ি আছে, যাদের মালিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িকভাবে শক্তিশালী, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব কাজ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অবগত আছেন। তার নির্দেশে আমরা এসব নথি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠিয়েছি। তারা কাজ করছেন।’
তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের জন্যও একটি মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে। তা ছাড়া ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায় কোনো কমার্শিয়াল স্থাপনা থাকতে দেওয়া হবে না। আমরা বিকেন্দ্রীকরণ ও আধুনিক আবাসন গড়ে তুলতে কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ রাখার বিষয়ে। সে নির্দেশনা মতে পূর্বাচলে আবাসন তৈরির ড়্গেত্রে ৪৫ শতাংশ জমি উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। একইভাবে নতুন আরও দুটি শহর তুরাগ ও বছিলাতে ৭৫ শতাংশ জমিই জলাধার ও উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে।’
ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে অন্য আলোচকদের মধ্যে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর আলম, রাজউকের চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান, আন্তর্জাতিক মেট্রোপলিটন সিটি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ফিলিপ ভ্যান রেনেভেল্ড, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ জন রোম ও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের পরিচালক ড. মার্সি টেম্বন।
