ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় প্লাস্টিক কারখানায় আগুনের ঘটনায় দগ্ধদের শারীরিক অবস্থা কোনো পরিবর্তন হয়নি। চিকিৎসাধীন ১৮ জনের মধ্যে ১০ জনের শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাদের বাঁচার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমে আসছে।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের একাধিক চিকিৎসক শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা মেডিকেলে বার্ন ইউনিটের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ৮ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থা একটু কম আশঙ্কাজনক। তবে বাকি যেই ১০জনকে নতুন বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে তাদের সবাইকেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। সবার অবস্থাই সংকটাপন্ন।
তিনি বলেন, এই ১০ জনের সবারই শ্বাসনালি দগ্ধ হয়েছে। তাদের শরীরে বার্নের পরিমাণ এমন যে, আমার এই ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় এত ভয়াবহ বার্ন আমি কখনো দেখিনি। সবার শরীর, মুখমণ্ডল এমনভাবে বিকৃত হয়েছে যে, তাদের পরিবারের লোকরাই তাদের চিনতে পারছে না। স্ত্রী তার স্বামীকেই চিনতে পারছে না। এদের মধ্যে আ. রাজ্জাকের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তার শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে। যেকোনো সময় তার অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। বাকিদের শরীরের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ দগ্ধ রয়েছে।
ডা. সেন বলেন, বিশ্বের কোনো হাসপাতালেই শরীরের শতভাগ দগ্ধ রোগীকে বাঁচানো সাধারণত সম্ভব হয় না। তবে আমরা চেষ্টা করছি বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। আমাদের এখানে বিশ্বের সব আধুনিক চিকিৎসা সেবাই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীরও নির্দেশ রয়েছে তাদের চিকিৎসার বিষয়ে। তিনি সার্বক্ষণিক তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন। এবং রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করছে।
ইনস্টিটিউটের নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আগুনে যেসব ব্যক্তির শ্বাসনালি পুড়ে যায়, তাদের অধিকাংশই মারা যান। কাজেই এখানে চিকিৎসাধীন যাদের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে তারা প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করছেন।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার বিকেলে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজন ঘটনাস্থলে আর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১২ জন হাসপাতালে মারা গেছেন। এর মধ্যে শুক্রবার রাতে ১০ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ৮ এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন ১০ জন। এছাড়া অগ্নিদগ্ধ দুর্জয়কে বাসায় নিয়ে গেছেন স্বজনরা।
অগ্নিদগ্ধদের নিহত ১২ জন হলেন– বাবলু (২৫), রায়হান (১৬), ইমরান (১৮), সালাউদ্দিন (৩২), আ. খালেদ (৩৫), সুজন (১৯), জিনারুল (৩২), আলম (৩৫), মেহেদী হাসান শান্ত (২০), ফয়সাল আহমেদ (২৯), জাহাঙ্গীর (৫৫) ও ওমর ফারুক (২৮)।
নিহত ওমর ফারুক (৩৬) ও মেহেদী হাসানের (২০) মৃতদেহ ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুপুরে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিউল আলম তাদের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। ঘটনাস্থলেই নিহত মাহবুব হোসেনের (২৩) মৃতদেহ এখনো মর্গে রয়েছে। তার পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। পরবর্তীতে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ১০ জনের মধ্যে সোহাগ, সোহাগ-২, সুমন, ফিরোজ ও আসাদের শরীরের ৫০ ভাগ করে দগ্ধ হয়েছে। এছাড়া মফিজের ৪০ ভাগ, মুস্তাকিমের ২০ ভাগ, সিহাজুলের ৭০ ভাগ, রাজ্জাকের ১০০ ভাগ ও আবু সাঈদের ৮০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। আর ঢামেক বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আটজনের মধ্যে বাসির, আসলাম ও লাল মিয়ার শরীরের ২০ ভাগ, জিসানের ১৭ ভাগ, সাখাওয়াতের ২২ ভাগ, জাকিরের ২৯ ভাগ, সাজিদের ১০ ভাগ ও সিরাজের ২১ ভাগ দগ্ধ হয়েছে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত আলম ও রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে কারখানা মালিক মো. নজরুল ইসলামসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে।
আগুন লাগার ঘটনার পর থেকেই কারখানা মালিক মো. নজরুল ইসলাম গা ঢাকা দিয়েছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি ঘটনার পর থেকেই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে থানা-পুলিশ সূত্র জানায়। কারখানার চারপাশে এখনো থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। উৎসুক জনতা একটু পর পরই কারখানার চারপাশ ভিড় করছে দেখার জন্য।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ শাহ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
