স্যারের সঙ্গে আমার পথ চলা শুরু ১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে এফসিপিএস ১ম পর্ব পরীক্ষা পাসের পর। আমি তৎকালীন আইপিজিএমআর (পিজি হাসপাতাল) আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে (ট্রেনিং পদ) যোগদান করি । প্রায় আড়াই বছর ট্রেনিং চলাকালে প্রথম ১৯ মাস আমি এম আর খান স্যারের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে শিশু বিভাগে কর্মরত ছিলাম। ১৯৮৩ সালে স্যারের হাতে গড়ে ওঠে শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। স্যার ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালে মহাসচিব পদটি খালি হওয়ায় স্যার তার আস্থাভাজন হিসেবে আমাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। সেই থেকে শুরু স্যারের সঙ্গে আমার কর্মজীবনের পদযাত্রা। ১৯৮৫ থেকে ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর স্যারের মৃত্যু পর্যন্ত আমি শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন এবং এর অধীন ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতাল যশোর এবং সাতক্ষীরার সব সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যারের সঙ্গে ছিলাম। দীর্ঘ সময় স্যারকে কাছ থেকে দেখেছি। আমাদের জীবদ্দশায়, দেশের চিকিৎসার ইতিহাসে এ রকম একজন সম্পূর্ণ মানুষ আসবে কি না, জানি না। এই মানুষটি ছিলেন সব বিষয়ে সমান পারদর্শী। বাংলাদেশের শিশুচিকিৎসার পথিকৃৎ তিনি। তিনি শুধু চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন একজন দার্শনিক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে এম আর খানের ৩৭টি গবেষণাধর্মী রচনা প্রকাশিত হয়েছে। শিশুরোগ চিকিৎসাসংক্রান্ত সাতটি বই লিখেছেন, যেগুলো দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত।
এম আর খানের জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট সাতক্ষীরায়। বাবা আবদুল বারী খান, মা জায়েরা খানম। তাদের চার ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। মায়ের হাতে পড়াশোনার হাতেখড়ি। এরপর রসুলপুর প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। প্রাথমিক শেষে ভর্তি হন সাতক্ষীরা সদরের প্রাণনাথ ইংরেজি বিদ্যালয়ে (পিএন স্কুল)। ছেলেবেলায় খুব ভালো ফুটবল খেলতেন। রসুলপুর স্কুল টিম লিডার হিসেবে তিনি ১৩টি ট্রফি লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে এ স্কুল থেকেই প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন।
স্যারের ডাক নাম ছিল খোকা। পুরো নাম মোহাম্মদ রফি খান। তবে এম আর খান নামেই পরিচিত তিনি। একজন এম আর খান হয়ে ওঠার পেছনে তিনি বাবা-মা, পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষকদের অবদানের কথাও বলতেন। সবচেয়ে বেশি বলতেন পিএন হাইস্কুলের শিক্ষক শ্রী গিরীন্দ্রনাথ ঘোষের কথা। এক সাক্ষাৎকারে স্যার এই শিক্ষক প্রসঙ্গে বলেন, ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার, মাল্টিফেরিয়াস কোয়ালিটির লোক। এক গিরীন্দ্র স্যার সব পড়াতেন। ইংরেজি, বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস পড়াতেন। পড়ার বাইরের বই পড়তে দিতেন। আউট নলেজে একবার দিলেন ‘চেস্টারফিল্ডস লেটার টু হিজ সান’। আমাদের কোর্সেও নেই। বলেন, ‘পড়ো বাবা, এটার মধ্যে অনেক জিনিস আছে।’ এসেই বলতেন, ইতিহাস বইয়ে যা পড়লে ইংরেজিতে আমাকে বলো। সুতরাং আমাকে ওটা ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে বলতে হতো। ইংরেজির সাবসট্যান্স রাইটিং খুব আগ্রহ করে দেখতেন। এই যে এত লিখেছে, চার লাইনে বলো তো কী বলতে চায়? ইংরেজি জ্ঞানের পরিপক্বতায় এতে অনেক সাহায্য হয়েছে। ছুটির দরখাস্ত ইংরেজি, বাংলা হবে না। ইংরেজিতে যাতে আমরা ব্যুৎপত্তি লাভ করি, এ বিষয়ে তিনি বেশ সজাগ ছিলেন। এককথায় এই জীবনের মোড় ফেরানোর কাজ করেছেন শ্রী গিরীন্দ্রনাথ ঘোষ।
১৯৪৫ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। এই কলেজের অনেক গল্প স্যার করেছেন। তার কাছেই জেনেছি, এ কলেজে ভর্তি হওয়া খুব কঠিন। তার সময়ে প্রিন্সিপাল ছিলেন এ কে চন্দ্র। অল ইন্ডিয়ার আইসিএস অফিসার, বিরাট ব্যক্তি। প্রিন্সিপাল যখন বিদায় নেন, তত দিনে কলেজে কো-এডুকেশন শুরু হয়ে গেছে। বিদায়ের সময় কলেজ নিয়ে মন্তব্য করতে বললে প্রিন্সিপাল সাংবাদিকদের ‘দ্য প্রবলেম ইজ দিস-দ্য স্টুডেন্টস ওয়ান্ট দ্য কো, নট দি এডুকেশন। আদারওয়াইজ দেয়ার ইজ নো প্রবলেম।’
এরপর ১৯৪৬ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।
সেখানকারও অনেক গল্প শুনেছি স্যারের কাছ থেকে। অনেক কষ্ট করে স্যারকে সেখানে ভর্তি হতে হয়েছে। ভর্তির পর নানা টানাপড়েনেও পড়তে হয়েছে। সেকেন্ড ইয়ারে পেয়েছিলেন পশুপতি বোসকে। বর্তমান যে মিটফোর্ড হাসপাতাল, সেখানকার অ্যানাটমির টিচার ছিলেন। তার ডিগ্রি তত ছিল না। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে বোস বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। স্যার বলেন, ‘বোর্ডে ডান-বাম দুহাত দিয়েই অ্যানাটমির ছবি আঁকতেন। এক ঘণ্টার ক্লাস নিতেন আড়াই ঘণ্টা-তিন ঘণ্টা। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। যত ছেলে পোস্টগ্র্যাজুয়েট করতে যেত ব্রিটেনে, পশুপতি বোসের ক্লাসে বসত। ধারণক্ষমতা ২০০। লেকচার শুনত ৩০০-৩৫০ জন। হি ওয়াজ অ্যা ভেরি ট্যালেন্টেড জিনিয়াস ম্যান।’
কলকাতা মেডিকেল কলেজের আরেক শিক্ষকের কথা বলতেন স্যার। তার নাম মনি দে, মেডিসিনের অধ্যাপক। স্যার বলতেন, ‘বিরাট টিচার, বিরাট পা-িত্য। যারা পোস্টগ্র্যাজুয়েট করবে, মনি দের ক্লাস করবেই। তার লেকচারও ইন্টারেস্টিং ছিল। একদিন অ্যামিবা সম্পর্কে বলছেন, ‘অ্যামিবা সিঙ্গেল সেল প্রোটোজোয়া; কিন্তু বিরাট তার কার্যক্ষমতা। সে সৃষ্টি করতে পারে না হেন অসুখ। আমি করি কি, একটু বেশি খাবার খাই। অল্প আমার জন্য, অল্প তাদের জন্য। যাতে অ্যামিবা গোলমাল না করে।’ এ রকম সুন্দর লেকচার দিতেন। এখনো মনে আছে, মনি দে যখন চলে গেলেন, সবাই কাঁদছিল।
১৯৫২ সালে এমবিবিএস পাস করার পর সাতক্ষীরায় ফিরে আসেন তিনি। উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ১৯৫৬ সালে তিনি সস্ত্রীক বিদেশে পাড়ি জমান এবং ব্রিটেনের এডিনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে ভর্তি হন। সেখান থেকে একই সালে ডিপ্লোমা ইন ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (ডিটিএমঅ্যান্ডএইচ) ডিগ্রি লাভ করেন। স্কুল অব মেডিসিন লন্ডন থেকে তিনি ডিপ্লোমা ইন চাইল্ড হেলথ (ডিসিএইচ) ডিগ্রিও লাভ করেন।
বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার কেন্ট ও এডিনবার্গ গ্রুপ হাসপাতালে যথাক্রমে সহকারী রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে ‘এডিনবার্গের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান’ থেকে তিনি এমআরসিপি ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অব মেডিসিন পদে যোগ দেন।
১৯৬৪ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (শিশুস্বাস্থ্য) পদে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগে যোগ দেন এবং এক বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৭০ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চের (আইপিজিএমআর) অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে এই ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ফেলো অব কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন (এফসিপিএস) এবং ১৯৭৮ সালে এডিনবার্গ থেকে ফেলো অব রয়েল কলেজ অ্যান্ড ফিজিশিয়ানস (এফআরসিপি) ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৭৭-৭৮ সালে তদানীন্তন আইজিপিআরের যুগ্ম পরিচালক ও পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে তিনি ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ও পরিচালকের পদে যোগ দেন। একই বছরে আবার তিনি আইপিজিএমআরের শিশু বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে অধ্যাপক ডা. এম আর খান তার সুদীর্ঘ চাকরিজীবন থেকে অবসর নেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্যার ঢাকাতেই ছিলেন এবং ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে মানুষের চিকিৎসা করেছেন। এ জন্য তার বাসায় হামলাও হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও অনেক স্মৃতি। গল্পে গল্পে বলেছেন সে সব, ‘একদিন শেখ সাহেব এসে (পিজি হাসপাতালে) হাজির সন্ধ্যাবেলা। তিনতলার সিঁড়ি থেকে উঠেই পশ্চিম দিকে যাচ্ছেন। জহুর আহমদ চৌধুরী তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর ডান পাশে আমি, বাঁ পাশে ইসলাম সাহেব (প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম)। আলী আফজাল খান তখন ইএনটির প্রফেসর। বঙ্গবন্ধু বললেন, নাক, গলা, কান/আলী আফজাল খান।’ আমি পরের লাইন যোগ করে দিলাম, ‘বঙ্গবন্ধুর কবিতা/বলে গেলাম আমি সেথা।’ এ কথা শুনে সবাই হাসে। একদিন বঙ্গবন্ধু বললেন, খান সাহেব, আপনার টেলিভিশনে কথাটা বেশ ভালো লেগেছে। আমি বললাম, কোন কথাটা স্যার? তিনি বললেন, ওই যে বাচ্চাদের খাবার নিয়ে বলছিলেন তালা-চাবি লাগিয়ে রাখতে। মায়ের ওষুধ, বাবার ওষুধ সব একসঙ্গে রাখলে বাচ্চারা খেয়ে নেয়, আমি বলেছিলাম তালা-চাবি দিয়ে রাখতে। বঙ্গবন্ধু যতক্ষণ পিজিতে থাকতেন আমি আর ইসলাম সাহেব ততক্ষণ তার সঙ্গেই থাকতাম।’
স্যারকে বলা হতো ফাদার অব পেডিয়াট্রিক ইন বাংলাদেশ। অনেক হাসপাতাল গড়েছেন। অবসর নেওয়ার পরও রোগী দেখতেন। দুটি হাসপাতাল। রোগী দেখে রাত ১২টা-১টার দিকে ঘুমাতেন। অবসরের পর স্যার নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে গড়েন ডা. এম আর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এ ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাতীয় পর্যায়ের শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠা করেছেন শিশুস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। গড়ে তুলেছেন সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল, যশোর শিশু হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, রসুলপুর উচ্চবিদ্যালয়, উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল, নিবেদিতা নার্সিং হোমসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি দেশ থেকে পোলিও দূর করতে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান ‘আধূনিক’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে।
প্রতিষ্ঠানতুল্য এই মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়াল-এ। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ম্যানিলা অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার।
চিকিৎসকদের ব্যাপারে স্যার বলতেন, চিকিৎসা হবে সেবা, ব্যবসা নয়Ñ এই ধ্যানধারণা নিয়ে যদি আমরা কাজ করি, তাহলে সাফল্য আসবে। রোগী পয়সা দেবে এবং আল্লাহর মেহেরবানি ও সওয়াব পাব। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেব প্রায়ই বলতেন, ‘আপনি এসেছেন, আপনাকে সেবা দেওয়ার জন্য আমায় সুযোগ দিয়েছেন, এ জন্য আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ এবং আল্লাহর কাছেও কৃতজ্ঞ।’ ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর শনিবার বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
লেখক : চেয়ারম্যান, নবজাতক বিভাগ, বিএসএমএমইউ এবং সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল
