দিলু রোডে আগুন: নাতির জন্য শোক করার ফুরসত নেই দাদার

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৮:৫২ পিএম

‘আজই প্রথম তরল খাবার খেয়েছে রনি। শরীর খাবারটা গ্রহণ করেছে’- এমন খবরে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে একেএম শহীদুল্লাহর মনে। তিনি অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেন, ‘রনির অবস্থা ভালোর দিকে, আর ৯৫ শতাংশ পোড়া নিয়ে রনির স্ত্রী জান্নাতের অবস্থা সামান্য উন্নতি হলেও এখনো তার শরীর তরল খাবার নিচ্ছে না।’

বৃহস্পতিবার ভোরে দিলু রোডের বাড়িতে ভয়াবহ আগুনে দগ্ধ হন রনি ও জান্নাত। আতঙ্কে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মায়ের কোল থেকে আগুনে পড়ে যায় চার বছরের ছেলে একেএম রুশদী। তাকে বাঁচাতে মা-বাবা দুজনই আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

ভিআইভিপি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের হিসাব ব্যবস্থাপক ও ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রভাষক শহিদুল কিরমানি রনি দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার প্রোডাকশন ম্যানেজার একেএম শহীদুল্লার ছেলে।

আর তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত বেক্সিমকো ফার্মার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা।

বৃহস্পতিবার ভোরের সর্বনাশা আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় ছোট্ট রুশদি। তাকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। এ বছরই রুশদিকে একটি স্কুলের প্লে-গ্রুপে ভর্তি হয়েছিল। বুধবার সকালেও দাদা শহীদুল্লাহর হাত ধরে স্কুলে গিয়েছিল রুশদি। তার এক দিন পরই শুক্রবার বিকেলে সেই নাতিকে নরসিংদীর গ্রামের বাড়িতে দাফন করে আসেন দাদা। এর আগে পোড়া রুশদির ছোট্ট দেহটি ছিল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিচতলার হিমঘরে।

আদরের ছোট্ট নাতিটার জন্য শোক করার ফুরসতও নেই শহীদুল্লার। কিছুক্ষণ পরপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন, চোখের কোণে জমে উঠছে অশ্রুর ফোঁটা।

তিনি বলেন, ‘রুশদিকে নরসিংদীর শিবপুরে আমাদের বাড়ির সামনে দাফন করে এসেছি। এখন যাব আইসিএমএবি অফিসে। ভালো খবর হলো রুশদির মা-বাবার অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে’।

বৃহস্পতিবার ভোর রাত ৪টার দিকে নিউ ইস্কাটনের দিলু রোডের ৪৫/এ নম্বরের ৫তলা বাড়িতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।ওই বাড়ির তিন তলায় থাকতেন রুশদির মা-বাবা।

শহীদুল্লা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। রনি বুঝতে পেরেছে যে তার ছেলে বেঁচে নাই। তাই সে প্রথমে ওকে ঢাকায় কবর দিতে বলেছিল। কিন্তু নিজেদের জীবনও অনিশ্চয়তার কারণে পরে আমাকে আমার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। আমি গ্রামের বাড়িতেই দাফন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আইসিসিউর সামনে রুশদির মামা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমার বোন এখনো রুশদির মারা যাওয়ার খবর জানে না। আসলে এখন সে কোনো কিছু বোঝার অবস্থাতেই নেই।’

রুশদির মা-বাবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল বলেন, শহিদুল ও জান্নাত দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। আগুনে শ্বাসনালিসহ রনির শরীরের ৪৩ শতাংশ ও জান্নাতের ৯৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। আশার কথা হচ্ছে রনিকে তরল খাবার দেওয়া হয়েছে এবং তার শরীর খাবার গ্রহণ করেছে। আর তার মায়ের শরীর এখনো খাবার নিতে পারছে না।

দিলু রোডের ওই বাড়িতে আগুনে দোতলায় থাকা বায়িং হাউসের অফিস সহকারী আবদুল কাদের (৪৫) ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জান্নাত ওরফে জ্যোতি (১৮) মারা যান। জ্যোতির মা লাল বানু ও বাবা গণপূর্তের কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলম ছাদ থেকে দড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে গুরুতর আহত হন।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটা কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

আগুনে পোড়া ৪৫/এ নম্বর বাড়িটি এখনো যেন ভুতুড়ে বাড়ি। পুরো বাড়ির একাংশ পুড়ে কালো হয়ে আছে। বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক লুৎফর রহমান জানান, ভবনটিতে মোট আটটি পরিবার থাকত। এ মুহূর্তে কেউ নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত