গোলাপি মেয়েদের রং?

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ১২:৩৪ এএম

নারীর প্রিয় রঙ মানেই গোলাপি। এমন ধারণা বহুকাল ধরেই চলে আসছে। কিন্তু সত্যি কি লিঙ্গভেদ আর রং- এ দুটোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? মেয়ে শিশুর প্রসঙ্গ এলেই আমরা গোলাপি রঙের জামা জুতো আর খেলনার কথা ভাবি। তাহলে রঙের সঙ্গে লিঙ্গের কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে নাকি এর পেছনে বাণিজ্যিক বা সামাজিক কারণ? এমন প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেছিলাম কয়েকজন ফ্যাশন ডিজাইনারের সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে ফ্যাশন ডিজাইনার দোয়েল জাহান বলেন, মেয়েদের গোলাপি রং পছন্দের ব্যাপারটা পুরোপুরি সামাজিক কিংবা বাণিজ্যিক নয়। এর পেছনে আছে মানসিক এবং শারীরিক কিছু ব্যাপার। ছেলেদের চাইতে একটু বেশি লালচে রং নারীদের জন্মগতভাবে পছন্দ।  এসব তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে বলেও জানান দোয়েল। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী এনিয়া হার্লবার্ট এবং ইয়াজু লিং ২০-২৬ বছরের মোট ২০৮ জন মানুষের ওপরে রং নিয়ে পরীক্ষা চালান। অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়, খুব দ্রুত কার্সর ঘুরিয়ে কয়েকটি রং, কয়েক শেডের রং, আলো এবং অন্ধকারের মিশেলে রং, বিভিন্ন আকৃতিতে থাকা রঙের মধ্যে থেকে নিজের পছন্দের রংটি বাছাই করতে। সপ্তাহ দুয়েক পর আবার তাদের নিয়ে একই পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায় প্রায় সব মানুষই সাধারণত নীল রং পছন্দ করে। তবে ছেলেরা যে ক্ষেত্রে নীলের সঙ্গে সবুজের মিশ্রণ পছন্দ করে, সেক্ষেত্রে মেয়েরা একটু লালচে রঙের নীল পছন্দ করে। অনেকটা বেগুনি ধাঁচের রং এগিয়ে থাকে মেয়েদের পছন্দের তালিকায়। ফ্যাশন ডিজাইনার বকুল বেগম বলেন, নারীরা পুরুষদের চাইতে রঙের আভা ভালো বুঝতে পারে। এই ক্ষমতা আজকের নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা অভ্যাসের ফলে তৈরি হয়েছে। সাধারণত নারীদের বাচ্চা লালন-পালন করতে হয়। শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে তাদের বুঝতে হয় যে, শিশুর গালে আভা কতটুকু লালচে হলে তার শরীর খারাপ। অভ্যাসের কারণের রং এবং রঙের মিশ্রণ পুরুষের চাইতে অধিকতর পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন নারীরা। তাই অভ্যাসগত কারণে গোলাপি রঙের প্রতি মেয়েদের দুর্বলতা তৈরি হয়।

ফ্যাশন ডিজাইনার তাসনিম কবীর বলেন, মেয়ে শিশুর জন্য গোলাপি রংটাই একদম ঠিকঠাক। তাই তার জন্য কিনে আনা হয় গোলাপি জামা, জুতো, খেলনা। আশপাশে নারীদের মুখেও থাকে গোলাপি রঙের প্রতি আকর্ষণের গল্প। এত কিছু শুনতে শুনতে নিজের পছন্দের রঙের জায়গায় গোলাপিকে বসিয়ে দেওয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। গোলাপির বদলে রংটা যদি হতো খয়েরি, তবে নারী শৈশব থেকে সেটাকেই বেশি পছন্দ করত। গবেষকদের যুক্তি, জন্মগতভাবে নয়, বরং জন্মাবার বেশ কিছুদিন পর চারপাশের মানুষের এবং সমাজের মনমানসিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই এমন রং বেছে নেয় মেয়েরা। পছন্দের রং বড় ব্যাপার নয়। ব্যাপার হলো চারপাশের পরিবেশ। পরিবেশ একটা শিশুকে যে ধারণা দেবে, সে সেটাই করবে। তাদের দাবি, দুই বছর বয়স থেকেই মেয়েরা গোলাপি রঙের দিকে ঝুঁকতে থাকে। আর ঠিক তার কাছাকাছি কোনো একটি বয়স থেকেই গোলাপি রংকে সতর্কতার সঙ্গে দূরে সরিয়ে রাখতে শুরু করে ছেলেরা। এ প্রসঙ্গে মনোবিদ মোহিত কামাল বলেন, ইচ্ছা করে গোলাপি রঙের পোশাক পরে কোনো ছেলেশিশু নিশ্চয়ই নিজেকে মেয়েলি বলে প্রমাণ করতে চাইবে না। সেই সঙ্গে, কোনো মেয়ে নিশ্চয়ই চারপাশের সবার চেয়ে আলাদা হয়ে উঠতে চাইবে না। গোলাপিতে তাকে মানায়, সুন্দর দেখায়, গোলাপিই তার পছন্দনীয় রং সেটা ভাবতে অনেকটাই বাধ্য সে।

আসল কথা হলো- গোলাপি রং আর দশটা রঙের মতোই একটি রং। একজন মানুষ, নারী ও পুরুষভেদে, গোলাপি রংটিকে পছন্দ করতেই পারেন। তার মানে এই নয় যে, তাকে নারী হতে হবে। তবে সামাজিক প্রভাবে ইতিহাসে বার কয়েক হাতবদল হয়ে গোলাপি এখন হয়ে উঠেছে নারীদের রং। তবে একটি ব্যাপার সঠিক যে, গোলাপি মানুষকে আকর্ষণ করে বেশি। ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কাগজে গোলাপি রং দিলে মানুষ লিফলেট কিংবা ফর্মের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। যেটা কিনা অন্য  কোনো রঙের ক্ষেত্রে হয় না!

শেষ কথা গোলাপি মিষ্টি এবং চমৎকার একটি রং। একে যেকোনো নারী পছন্দ করতেই পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত