করোনাভাইরাসের ভয়াল গ্রাসে থমকে গেছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সব খেলাধুলা স্থগিত। সাধারণ মানুষদের মতো বন্দী সময় কাটছে খেলোয়াড়দেরও। তা এই সময়টা কীভাবে কাটাচ্ছেন তারা? ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ থাকছে হকি খেলোয়াড়দের কথা-
মামুনুর রহমান চয়ন
পুরো দেশে তো লকডাউনের মতো অবস্থা। খেলাধুলা নেই, সবকিছুই বন্ধ। খেলা ছাড়া আসলে মোটেও ভালো লাগছে না। আমরা যারা খেলোয়াড়, যে খেলাই খেলি না কেন, খেলাটা আসলে আমাদের রক্তের সাথে মিশে যায়। আর এটা নেশার মতো হয়ে গেছে। যে নেশাটা এখন আমরা করতে পারছি না বা খেলতে পারছি না। এটা খুবই খারাপ লাগছে।
তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এই সংকটে অনেক কিছুই ছাড় দিতে হবে। আমাদেরও সেটাই করতে হচ্ছে।
আমি এই সময়ে বাসায় বাচ্চাকে সময় দিচ্ছি। স্ত্রীকে বাসার কাজে হেল্প করছি। আর যতটুকু পারা যায় এর মাঝেও ফিজিক্যাল ট্রেনিং করে যাচ্ছি। কারণ যখন এই সমস্যা কেটে যাবে তখন খেলাধুলাসহ সব আগের মতো শুরু হবে। আনফিট হয়ে গেলে তখন বিপাকে পড়তে হবে। কঠিন এই সময়ে নামাজের দিকে মনোযোগ বেশি দিচ্ছি। আল্লাহকে ডাকছি, যেন তাড়াতাড়ি সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।
সবাই নিয়ম মেনে চললে ইনশা আল্লাহ আমরা দ্রুতই এই সংকট রিকভারি করতে পারব। সবার উদ্দেশ্যে তাই বলব, সরকার থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে অবশ্যই আমরা যেন তা মেনে চলি। প্লিজ, সবাই বাসায় থাকেন, দূরত্ব বজায় রাখেন। আর অবশ্যই খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হবেন না।
ইমরান হাসান পিন্টু
খেলা নেই, এটা অবশ্যই খারাপ লাগার। তবে খেলার চেয়েও বড় দেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি সেটা। ইনশা আল্লাহ সুস্থ হলে আমরা আগের মতো আবার খেলতে পারব। আল্লাহর কাছে তাই এখন একটাই প্রার্থনা যেন আমাদের মাফ করেন। দ্রুতই যেন এই খারাপ সময় শেষ হয়।
যেহেতু খেলা নেই, তাই অফুরন্ত অবসর। এই সময়টা পরিবারকে দিচ্ছি। আর আমরা বর্তমানে নৌবাহিনীতে আছি। আমাদের বর্তমান রুটিনে ঘরোয়া যে ব্যায়ামগুলো আছে, সেগুলো করেই কাটাচ্ছি।
অনেক দিন খেলায় বিরতি পড়লে পারফরম্যান্সে তার প্রভাব পড়ার শঙ্কা অবশ্যই থাকে। তবে ফিটনেস নিয়ে কাজ করলে সেটা কেটে যাবে। সে ক্ষেত্রে আমি বলব, সবকিছু নতুন করে শুরু হওয়ার পর অবশ্যই খেলোয়াড়রা তাড়াতাড়ি রিকভারি করতে পারব।
সবার উদ্দেশ্যে বলব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমাদের সরকার যে সতর্কতার কথাগুলো বলে আসছে আমরা যেন পালন করি। এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল করার সুযোগ নেই। এগুলো মেনে চললেই ইনশা আল্লাহ আমরা মুক্তি পাব।
ফরহাদ আহমেদ সিতুল
সময়টা এমন, সবকিছু আল্লাহর হাতে। নামাজ পড়ছি, আল্লাহ কাছে দোয়া করছি যেন এই খারাপ সময় দ্রুত কেটে যায়। এ ছাড়া ইউটিউবে খেলা দেখে সময় কাটাই। এর বাইরে যতটুকু সময় পাই হালকা জিম করি।
আমরা নৌবাহিনীর খেলোয়াড়রা শাহীনবাগ ইউনিটে রয়েছি। একসঙ্গে অনেকের জমায়েত হওয়ার তো সুযোগ নেই। খাওয়া-দাওয়াও আলাদা আলাদা করা লাগছে। সব মিলে কষ্টের সময়ই কাটছে। আরো খারাপ লাগে দিন মজুরদের কথা ভেবে। তাদের কষ্টটা তো এই সময়ে অনেক বেশি।
স্টিক নিয়ে নামার সুযোগ নেই। হকি ফেডারেশনও বন্ধ। বাসায় বসে অফিশিয়াল কাজগুলো চলছে তাদের। সবকিছু আসলে পিছিয়ে গেল করোনাভাইরাসের কারণে। দলবদল কবে হবে কেউ জানে না। সেটার অপেক্ষাতেই সব খেলোয়াড়রা ছিল।
সর্বশেষ আমরা ইনডোর হকিতে (গেল বছর জুলাইয়ে) খেলেছি। এরপর আর জাতীয় দলের খেলা নেই। বাইরের দেশগুলোর সাধারণত বড় আসর না থাকলে ছোট ছোট ট্যুর বা সিরিজ থাকে। আমাদের তো সেই সুযোগ নেই। পরিস্থিতি সব স্বাভাবিক হলে যদি সেটা হয় আমাদের জন্য ভালো। আর সবকিছুর আগে দলবদলটা খুব প্রয়োজন।
সবার কাছে অনুরোধ করব এই পরিস্থিতিতে যেন নিয়ম মেনে চলেন। সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে, আমরা যেন তা মেনে চলি। আমরা নিজে ভালো থাকলে পরিবারও ভালো থাকবে। দেশও ভালো থাকবে।
অসীম গোপ
আসলে বন্দী সময় কাটছে। নৌবাহিনী থেকে আমাদের জিমের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন হালকা জিম করছি। এ ছাড়া ফান গেমগুলো খেলছি। এভাবেই সময় কাটাতে হচ্ছে।
পুরো বিশ্বই আসলে বড় সংকটে। বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের দেখছি তারা কীভাবে সময় কাটাচ্ছে। সবারই আসলে ঘরে বসেই কাটছে। আমার হয়তো একটা সুযোগ আছে ফাঁকা সময়ে জিমে যাওয়ার।
তবে ঘরে থাকাটাই এখন নিরাপদ। এতে শুধু আমি নিজেকে সেভ করছি না, পরিবার ও দেশকে সেভ করছি। ব্যাপারটা এ রকম। এই ভাইরাস থেকে যদি আমরা বাঁচতে চাই, তাহলে প্রথম কর্তব্য হচ্ছে নিজেকে সুরক্ষিত করা। নিজেকে সুরক্ষা দেওয়া মানে অন্যকেও সুরক্ষা দেওয়া। খুব প্রয়োজন না হলে আমরা যেন বাইরে বের না হই। এটাই সবার প্রতি আবেদন। আর বের যদি হতেই হয় তবে যেন দূরত্ব বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাগুলো নেওয়া হয়।
আশরাফুল ইসলাম
খেলা নেই, খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু শুধু হকি তো না, বিশ্বের সব খেলাই বন্ধ। এমন একটা মহামারি অবস্থা আসলে কিছু করারও নেই। তবে হকি ছাড়া তো আর থাকতে পারি না। তাই রুমের ভেতরেই টুকটাক হকি করা হয়।
বাসাতে এক্সারসাইজগুলোও করছি। ফিটনেস ধরে রাখার জন্য যা যা করা দরকার সবকিছুই করছি। আমার নিজের জায়গা থেকে যতটুকু ফিট থাকা দরকার তা করছি। আশা করি যখন সবকিছু ঠিক হবে, মাঠে ক’দিন প্র্যাকটিস করলেই আমি আমার পুরো ফিটনেস নিয়ে খেলতে পারব ইনশা আল্লাহ।
তবে এখন একটাই চাওয়া, আল্লাহ যেন দ্রুত আমাদের রক্ষা করেন। সবাই সুস্থ হয়ে যাক কিংবা কোনো মেডিসিন বের হয়ে যাক। দেশের মানুষের প্রতি অনুরোধ করব, এই কঠিন সময়ে সতর্কতা ও সব ধরনের নিয়ম মেনে চলার।
আরশাদ হোসেন
বাসায় বসেই দিন কেটে যাচ্ছে। যতটুকু পারা যায় বাসায় ফিটনেস নিয়ে কাজ করছি। নামাজ পড়ছি নিয়মিত। এ ছাড়া টিভি দেখা, গান শোনা... এভাবেই সময়ে কেটে যাচ্ছে।
খেলা নেই, খারাপ লাগা যে কাজ করছে না তা নয়। অনেক দিন আমাদের জাতীয় দলের খেলা নেই। সামনে জুনিয়র এশিয়া কাপ ছিল। সেখানে খেলতাম আমরা। কিন্তু এখন সেটাও হচ্ছে। খেলা যখন রক্তের সাথে মিশে, তখন খেলতে না পারা অনেক কষ্টের। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে আসলে এই কষ্ট ভুলে থাকতে হচ্ছে।
দেশের মানুষের প্রতি আমার আহ্বান, সবাই নিয়ম কানুন মেনে চলুন। কারণ এটা জীবনের প্রশ্ন। খুব খারাপ একটা ভাইরাস এটা। ইতালি, স্পেন, আমেরিকার চিত্র সবাই দেখছি। আমাদের তাই খুব সতর্ক থাকতে হবে। কোনো রকম অবহেলার উপায় নেই।
