ফুল ভাসিয়ে পাহাড়ে অনাড়ম্বর বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২০, ০২:৩৬ পিএম

২৯শে চৈত্র। রবিবার পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্যদিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় শুরু হয়েছে বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা।

এদিন চাকমা জনগোষ্ঠীর ফুল বিজু, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর হাঁড়িবসু আর মারমা সম্প্রদায়ে সূচিকাজ পালন করে। ঠিক ফুলবিজু নামে অভিহিত না হলেও এইদিন প্রায় সকল পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী পানিতে ফুল ভাসিয়ে দেয়।

উৎসবপ্রিয় পাহাড়িরা সারা বছর মেতে থাকেন নানান অনুষ্ঠানে। তবে তার সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় বর্ষবিদায়ের এই উৎসব।

চাকমারা বিজু, ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সংগ্রাই, তঞ্চঙ্গরা বিষু, অহমিয়ারা বিহু এভাবে তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে আলাদাভাবে পালন করে এই উৎসব।

উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমারা বন থেকে ফুল আর নিমপাতা সংগ্রহ করে সেই ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। এই ফুল ভাসিয়ে দেয় পানিতে, তাই একে বলা হয় ফুল বিজু।

ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তাদের গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে এদিন শুরু হয় বৈসাবি উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।

ফুলবিজুর দিন সকালে রাঙ্গামাটি শহরের রাজবনবিহারের পূর্ব ঘাটে ফুল বিজু উৎসবে কর্ণফুলী নদীতে ফুল ভাসায় চাকমা তরুণীরা।

তবে এ বছর করোনাভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈসাবির সব আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে দলবেঁধে বা কোনও সংস্থা থেকে পানিতে ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠান আয়োজন না করলেও পাহাড়িরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে উৎসব পালন করতে দেখা গেছে।

পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ-বেদনা যেন ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ্বালায় পাহাড়ের মানুষ।

image

পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো দিনের বেদনা ভুলে নতুন দিনের প্রত্যয়ের কথা জানায় ফুল ভাসাতে আসা পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা। পানিতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তারা গঙ্গা মাকে শ্রদ্ধা জানায়। পাহাড়িদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে ফুল হচ্ছে একটা পবিত্র জিনিস।

অন্যদিকে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী ফুল বিজুর পরপরই তরুণীরা নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। বয়স্কদের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। ফুল ভাসানোর পর বয়স্কদের স্নান করানো হয়। বয়স্কদের শরীরে পানি ঢেলে তাদের আশীর্বাদ কামনা করেন তরুণ-তরুণীরা। দেওয়া হয় নতুন পোশাক।

চৈত্রের শেষ দিনে অর্থাৎ ৩০ চৈত্র শুরু হবে মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচন রান্না করা হবে। বহু প্রকার সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন তৈরি করা হয়। পাহাড়িদের বিশ্বাস, এই পাঁচন খেলে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া একদিনে সাত পরিবারে এই পাঁচন খেলে সর্বরোগ থেকে নি®কৃতি পাওয়া যায়। বিজুর দিনে পাহাড়িদের বাসায় পাহাড়ি-বাঙালি সবাই যায়। এদিন ফুটে ওঠে অসা¤প্রদায়িক মনোভাব।

অন্যদিকে সাংগ্রাইয়ে একে-অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরনো বছরের সকল দুঃখ, অবসাদ দুর করে নতুন বছরে শুদ্ধ মননে জীবন শুরুর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন পার্বত্যাঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠী।

প্রতিবছরই বাংলাদেশ মারমা সংস্কৃতি সংস্থার (মাসস) আয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে পানি খেলা বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। তবে এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে পানি খেলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।

এছাড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আসছে। বৈসাবিতে গ্রামীণ বাংলার বিভিন্ন খেলাসহ পাহাড়ি ঐতিহ্যগত বিভিন্ন খেলা যেমন-ঘিলা খেলা, ত¤ব্রæ খেলা প্রভৃতির খেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া ফুল বিজুতে রাতের আকাশে পানুস বাতির ঝলক দেখা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানানোর এ অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত।

এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী মানুষ সাংগ্রাই, মারমা জনগোষ্ঠী মানুষ বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে। বৈসুকের বৈ সাংগ্রাইয়ের সা ও বিজু, বিষু ও বিহুর বি নিয়ে উৎসবটিকে সংক্ষেপে বৈসাবি নামে পালন করা হয়। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে উৎসবে একীভূত করার জন্য এই সংক্ষেপে নামটি প্রচলন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত