নিউইয়র্কে করোনার শিকার এক বাংলাদেশি বাবা ও তার হার্ভার্ড পড়ুয়া ছেলে

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২০, ১০:৫০ পিএম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হয়ে প্রাণ হারানো এক বাংলাদেশির মধ্য দিয়ে আমেরিকান ড্রিমের পেছনে ছুটে চলা লাখ লাখ অভিবাসীর গল্প ফুটে উঠেছে। যেসব অভিবাসীর ঘাম আর রক্ত ঝরে আমেরিকা মহান হয়ে ওঠার দাবি করে, তাদেরই একজন বাংলাদেশি মোহাম্মদ জাফরের (৫৬)।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকায় আসা প্রায় সব অভিবাসীর জীবনের গল্পটা বেদনার। ঘটনা হয়তো আলাদা, কিন্তু বেদনা সবার একই রকম। তারা এই দেশে আসেন ভাগ্যের উন্নয়নে। হাড়ভাঙা খাটুনি করে সন্তানদের মানুষ করতে চান।

বিশ্বের প্রায় সব দেশই বর্তমানে করোনাভাইরাস নামে এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে। এই লড়াইতে নিউইয়র্কে যাদের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক বাংলাদেশিও রয়েছেন। তাদেরই একজন এই জাফর। তার জীবনের গল্প শুনিয়েছেন সিএনএনের কলামনিস্ট জন অ্যাভলন। 

তিনি লিখেছেন, এখন নিউ ইয়র্কে এক দিনে যত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তা সংখ্যায় গত এক বছরের সব হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বেশি। নাইন-ইলেভেনের হামলায় নিহতদের চার গুণের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসে মারা গেছে। এসব সংখ্যার প্রত্যেকের নাম আছে, তারা পরিবার রেখে গেছেন, যারা তাদের স্মরণ করছে। অনেক গল্প তারা পেছনে ফেলে গেছেন, যা বলা দরকার।

করোনার শিকার বাংলাদেশি অভিবাসী জাফর ইয়েলো ক্যাব-চালক। নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের গান হিল রোডের পাশে ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টে তিন সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। আমেরিকায় সন্তানদের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সব চেষ্টা করেছেন জাফর। আর সন্তানরাও তার স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্তানদের বড় হওয়া আর দেখতে পারবেন না তিনি। করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। ১ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করতে  প্রাণান্ত চেষ্টা করতেন ক্যাব চালক মোহাম্মাদ জাফর। তিনি প্রতিদিন হলুদ ক্যাব নিয়ে পথে পথে যাত্রী আনা-নেয়া শুরুর আগে প্রথমে সেকেন্ড গ্রেড পড়ুয়া মেয়ে সাবিহাকে নিউইয়র্কের অন্যতম শীর্ষ ট্রিনিটি স্কুলে নামিয়ে দিতেন। আবার স্কুল ছুটির সময় ট্রিপ নেয়া বন্ধ করে সোজা স্কুলে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাসায় পৌঁছে দিতেন তিনি। এই ক্যাব-চালকের ছেলে মাহতাব সিহাব (১৯) অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করছেন বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেয়ে সাবিহাও ভাইয়ের পথে হাঁটছে।

মাহতাব সিহাব বলেন, তার বাবা বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ থেকে আমেরিকা এসেছিলেন। গ্রামের নাম উল্লাপাড়া। বাবাকে দেখেছি সারা জীবন পরিশ্রম করতে। একদিকে সংসার দেখেছেন, অন্যদিকে দেশের স্বজন আর পরিবারকে সাহায্য করেছেন। নিজের জন্য কিছু করেননি তিনি। ভালো কোনো চাকরি করেননি কখনো। ম্যাকডোনাল্ডসের কাজ করেছেন, ডেলিভারিম্যানের কাজ করেছেন। শেষে ক্যাব চালানো শুরু করেন। তিনি মূলত সবার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

মাহতাব সিহাব বলেন, বাবা সব সময় চেয়েছেন, আমরা যতটুকু সুবিধা পাই তার যেন পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে পারি। তিনি চেয়েছেন আমরা যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারি।

জাফরের জীবনে আমেরিকার গল্প শুরু হয় ১৯৯১ সালে। ওই বছর তিনি বাংলাদেশে থেকে আমেরিকায় এসে নামেন। শুরুতে তিনি জ্যাকসন হাইটস ও কুইন্সের একটি ঘিঞ্জি অ্যাপার্টমেন্টে আর সব অভিবাসীদের সঙ্গে থাকতেন। যা আয় হতো, সেখান থেকে টাকা জমাতেন। সেই টাকা দেশে পাঠিয়ে দিতেন মা-বাবার কাছে। কয়েক বছর পরে টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে মাহমুদা খাতুনকে বিয়ে করেন। সেখানে কিছুদিন সংসারও করেন। পরে নিউইয়র্কে আবার আসার আগে তাদের ঘর আলোকিত করে ছেলে সন্তান আসে। তার নাম মাহবুব রবিন। আবার নিউইয়র্কে পাড়ি জমান তিনি। ২০০০ সালে এল্মহার্স্ট হাসপাতালে জন্ম হয় মাহতাব সিহাবের। এই এল্মহার্স্ট হাসপাতালটি এখন করোনাভাইরাসের গ্রাউন্ড জিরো হিসেবে পরিচিত।

জাফরের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শুরু হয় ব্রঙ্কসের একটি প্রাইমারি স্কুলে। পরে তিনি প্রিপ ফর প্রিপ নামের একটি অলাভজনক রিক্রুটমেন্ট প্রোগ্রামের কথা জানতে পারেন, যার মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের অশ্বেতাঙ্গ ছেলে-মেয়েদের খ্যাতনামা ও ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। সপ্তম গ্রেডে উঠে মাহতাব ট্রিনিটি স্কুলে ভর্তি হন।

২০১৬ সালে ক্যানসারে মাহতাবের মা মাহমুদার মৃত্যু এ পরিবারের জন্য বিরাট ধাক্কা হয়ে আসে। পরের বছর মাহতাব ভর্তি হন হার্ভার্ডে, একই বছর ছোট্ট সাবিহার ট্রিনিটি স্কুলে কিন্ডারগার্টেন শুরু হয়।

নিজেদের নিয়ে গর্ব ছিল তাদের; সামনে সুন্দর ভবিষ্যতের হাতছানি। কিন্তু আবার এল বিষাদের পর্ব।

করোনাভাইরাসের বিস্তার বাড়তে থাকায় মার্চে হার্ভার্ড বন্ধ হয়ে গেলে বাসায় ফেরেন মাহতাব। ততক্ষণে তার বাবা সেলফ-কোয়ারেন্টিনে। ট্যাক্সিচালকের চাকরিটা ঠিক রাখতে একবারই তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন।

কয়েক দিন ধরে হালকা জ্বরের পর জাফরের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ছেলে-মেয়েরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

এক সপ্তাহ সেখানে ভেন্টিলেশনে রাখা হয় জাফরকে। তাতে অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল বলেও মনে হয়েছিল। কিন্তু তার মৃত্যু হলো।

পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশে জীবন বদলের সংগ্রামে লিপ্ত এক বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবন থেমে গেলে ৫৬ বছর বয়সে।

কিন্তু হতাশার মধ্যেও জীবন আশার আলো দেখায়।

জন অ্যাভলন লিখেছেন, জাফরের মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসেন মাহতাবের বন্ধুরা। শুরু হয় ওই পরিবারের জন্য সাহায্য সংগ্রহের পর্ব।   

যেসব পেশায় জাফর কাজ করেছেন জীবনের বিভিন্ন সময়ে, সব কমিউনিটি থেকেই চাঁদা এলো। কারও চাঁদা কম, কারও বেশি। ট্রিনিটি, প্রিপ ফর প্রিপ, হার্ভার্ডও বাদ গেল না। 

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে জাফরের সন্তানদের জন্য উঠে গেল আড়াই লাখ ডলার!

জন অ্যাভলন লিখেছেন, শত কষ্টের মধ্যেও ওই পরিবার একটা ‘লাইফলাইন’ পেল। সমাজের ওপর তাদের আস্থাটাও টিকে গেল।

সঙ্কটের সময় যখন মানুষ মিলিত হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো ফল দেয়; এমনকি সেই সময়ও, যখন বেঁচে থাকার জন্যই মানুষকে আলাদা থাকতে হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত