করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর আয় কমে যাওয়া চট্টগ্রামের আঞ্চলিক এবং জাতীয় পত্রিকার হকাররা আর্থিক সংকটে পড়ে। পরিবার নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপনে পড়া এসব হকারদের দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজ ভূঁইয়া। ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকটা নীরবে তিনি তাদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া শুরু করেছেন।
রবিবার দুপুরে চেরাগী পাহাড় এলাকায় ৩০ হকারকে তাদের পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী তুলে দেন তিনি।
এর আগে ১৮ এপ্রিল দেশ রূপান্তরের অনলাইনে ‘বেতন নেই গৃহশিক্ষকদের, ভোগান্তি চরমে’ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে যারা শুধু টিউশন করেই সংসার খরচ নির্বাহ করে এমন ৩০ পরিবারের পাশে দাঁড়ান।
সীমিত পরিসরে শুরু করলেও নিজের সাধ্যমতো এ কাজ অব্যাহত রাখতে চান রেলওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজ ভূঁইয়া।
চেরাগী পাহাড় মৈত্রী ভবনের পাশে হকারদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার পরে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, একজন পত্রিকা হকার কত টাকা আয় করে? এ সময়ে অনেকে পত্রিকা দিতে নিষেধ করেছে। আবার অনেকে পত্রিকার বিল দেয়নি। অথচ ঝড়, বৃষ্টি, রোদ উপেক্ষা করে এ মানুষগুলো কিন্তু ঘুম ভাঙার আগেই আমাদের বাসায় পত্রিকা পৌঁছে দেন। এ কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে। এ সময়ে তারা পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছে। তাই নিজের স্বল্প সামর্থ্য নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।
তিনি আরো বলেন, কিছু দিন আগে গৃহশিক্ষকদের দুর্দশার কথা জানতে পেরে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি ২০ দিনের বাজার। যারা টিউশনি করে সংসার চালায় তাদের কষ্ট অবর্ণনীয়। আমার এই ব্যক্তি উদ্যোগে এখন পরিবারে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুমহলে সহযোগিতা পাচ্ছি।
এদিকে, শুক্রবার রেলওয়ে থানার আশপাশে ভাসমান এবং বস্তি এলাকায় মানুষদের ইফতার সামগ্রী নিয়ে হাজির হন এ কর্মকর্তা। নগরীর আমবাগান এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীদের ১০ দিনের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এ কর্মকর্তা।
শুধু তাই নয় করোনা প্রার্দুভাব শুরু হলে প্রথমে সিএনজি অটোরিকশাচালক, স্টেশনের কুলি, নিম্নবিত্ত পরিবার, রেলওয়ে থানার আশপাশে হতদরিদ্র মানুষদের এ সহায়তাকে তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন।
রেলওয়ে পুলিশ স্টেশনকেন্দ্রীক ও রেল দুর্ঘটনা, স্টেশন ও ট্রেনে অপরাধ দমনে কাজ করে কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডের বাইরে রেলওয়ে পুলিশ কর্মকর্তার মানবিক এসব প্রচেষ্টার সাধুবাদ জানাচ্ছেন নগরবাসী।
চট্টগ্রামে বইপড়ুয়া, সিনেমাপ্রেমী, জ্ঞানমনস্কদের প্রগতিশীলদের আড্ডাস্থল চেরাগী পাহাড়কেন্দ্রীক ফেসবুক গ্রুপ ‘চেরাগী আড্ডা’ পেইজের অ্যাডমিন শাহরিয়ার পারভেজ, শৈবাল পাড়িয়াল এবং বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের রির্পোটার মিঠুন চৌধুরী চট্টগ্রামের উপাজর্নহীন ও অসহায় এসব মানুষের তালিকা করে সহযোগিতা করছেন এই পুলিশ কর্মকর্তাকে। ছুটে যাচ্ছেন এই কর্মকর্তার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে।
এ বিষয়ে শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, ‘একজন পুলিশ অফিসার তার দায়িত্বের পাশাপাশি এমন মানবিক উদ্যোগে যে সামিল হচ্ছে এটাই মন্যুষত্ব। এ দুঃসময়ে সবার উচিত এগিয়ে আসা। যার যে সামর্থ্য আছে, তা নিয়ে এ দুর্যোগ পরিস্থিতির শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। হোক সেটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সব বন্ধ থাকায় অনেক মানুষ অসহায়, হাতে টাকা নেই, পুলিশের এমন ভূমিকা শিক্ষণীয় বলে উল্লেখ করে চেরাগী আড্ডার পেইজের আরেক অ্যাডমিন শৈবাল পাড়িয়াল বলেন, হকার, কর্মজীবী পোশাক শ্রমিক, স্টেশনের কুলিদের জন্য যে, তিনি ভাবছেন এটাই তো মানবিকতা। তাদের পাশে তো আসলে কেউ নেই। তিনি চাইলে তো কিছু না করতে পারতেন। কিন্তু ওনার ব্যক্তিগত অনূভূতির জায়গা থেকে করছেন।
এদিকে শুধু রেলওয়ে থানার ওসি নিজে নয় তার সাথে এমন মানবিক কাজে যুক্ত হয়ে তার স্ত্রীও।
এ বিষয়ে ওসি মোস্তাফিজ বলেন, আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগ যেমন আছে, তেমনি আমার স্ত্রীও এই কাজে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। এমনকি সে স্টেশনের পাশে ক্ষুর্ধাত কুকুরগুলোকে প্রতিদিন রান্না করা খাবার দিচ্ছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ইফতার সামগ্রী পাঠাচ্ছে।
এ পর্যন্ত কুলিমজুর, রিকশাচালক, সিএনজি অটোরিকশাচালক, হিজড়া, পত্রিকার হকার, মধ্যবিত্ত পরিবার ও গৃহশিক্ষকসহ প্রায় সাত শ পরিবারের কাছে চাল, ডাল, আলু, তেল, পেঁয়াজ, লবণ, চিনি, সেমাই নুডুলস, বিস্কুট, আটা, সাবান, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলো তুলে দিয়েছেন।
পাশপাশি নগরীর বিভিন্ন এলাকার ভাসমান মানুষদের ইফতারও বিতরণ করছে ওসি নিজে দাঁড়িয়ে। এ কাজের সঙ্গে তার পরিবারের স্বজন, বন্ধুমহল সহযোগিতা করছে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
