চাঁদপুরে করোনা নিয়ে উদাসীনতায় বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ০৫:১২ পিএম

চাঁদপুুর জেলায় করোনা ভাইরাস নিয়ে উদাসীনতা রয়েছে মানুষের মাঝে। এতে করে আশংঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা।

প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে ঘটছে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা। চিকিৎসকরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজনার গোপন রাখছে করোনা উপসর্গের কথা। এতে করে চিকিৎসা করার সুযোগ কম পাচ্ছেন তারা। ফলে জেলায় দিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।

চাঁদপুর শহরের গুনরাজদী এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জ্বর, শ্বাস কষ্টে ভুগছিলেন তিনি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিক ও হার্টের সমস্যাও ছিল তার। কিন্তু পরিবারের লোকজন তাকে শুধুমাত্র নিয়মিত ঔষধ খাওয়াতেন। অবশেষে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ৬৭ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা গত শুক্রবার সকালে মারা যান।

এ ব্যাপারে মৃত রুহুল আমিনের ছেলে ওমর ফারুক জানান, বাবা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিক ও হার্টের রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর আগে শ্বাসকষ্টেও ভুগেন বাবা। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে আমরা জানি না। করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা নিয়েছেন চিকিৎসকরা। পরীক্ষার রিপোর্ট আসলে তা বুঝা যাবে।

শহরের গুয়াখোলা এলাকার আরেক বাসিন্দা জয়দল হোসেন চোকদার। যিনি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়েও মিলেনি কোনো সহযোগিতা। শেষ মুহূর্তে পরিবারের লোকজন সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি তাকে।

মৃত জয়দল হোসেনের ছেলে শামীম হোসেন চোকদার বলেন, আমার বাবা কিছু দিন আগে হার্ট অ্যাটাক করেন। তাকে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরলেও কেউই চিকিৎসা করতে রাজি হয়নি। সবাই করোনার রিপোর্ট আছে কিনা জানতে চেয়েছেন। তার বাবার জ্বর সম্পর্কে বলেন, আমার মায়েরও কিছু দিন পূর্বে ভাইরাস জ্ব হয়েছিল, আবার তা সেরেও গিয়েছে। বাবা ঠান্ডা পানিতে গোসল করাতে জ্বর আসলেও আমার মনে হয় তা ভাইরাস জ্বরই ছিল।

চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদা বেগম পলিন বলেন, জেলায় এ পর্যন্ত যারা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের অধিকাংশরেই মৃত্যুর পর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে তাদের অনেকের রেজাল্ট করোনার পজেটিভ আসছে।

তিনি আরো বলেন, করোনার উপসর্গ থাকলেও অনেকেই তা গোপন করে থাকে। সঠিক সময়ে না জানানোর ফলে তাকে আইসোলেশনে রাখা সম্ভব হয় না। এতে করে তাদের মাধ্যমে আশপাশের মানুষও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া শেষ সময়ে যখন হাসপাতালে আসেন তখন আর কিছুই করার থাকে না আমাদের। এখনো অনেক মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছে না। এতে করে করোনা সংক্রমন হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণরোধ করা সম্ভব হবে না।

চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত চাঁদপুর জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৪শ’ ৭৮জন। এদের মধ্যে করোনার উপসর্গে জেলায় ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৪জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরে নমুনা সংগ্রহে ৩৫ জনের রিপোর্ট করোনা পজেটিভ এসেছে। তাছাড়া ৩৭ জনের রিপোর্ট করোনা নেগেটিভ এসেছে। বাকি ১০ জনের রিপোর্ট এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। জেলায় করোনা আক্রান্ত হওয়া পরে সুস্থ্য হয়েছেন ১০৫ জন।

তিনি বলেন, পরিবারের অসেচতনতা ও গোপনীয়তার কারণেই মূলত চাঁদপুরে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিষয়টি গোপন না রেখে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের এই কর্মকর্তা।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া যেখানেই করোনা রোগীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে সাথে সাথে সেই বাড়ি বা এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে। যাতে করে সংক্রমন না হয়। প্রশাসনের নিশেধাজ্ঞা যেন কেউ উপেক্ষা না করে সে ব্যাপারেও আমরা তৎপর রয়েছি।

চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৪৭২ জন। এরমধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৬২ জন আক্রান্ত হয়েছে চাঁদপুর সদর উপজেলায়। তাছাড়া শাহরাস্তিতে ৬৩জন, হাজীগঞ্জে ৫৮জন, ফরিদগঞ্জে ৫৭জন, মতলব দক্ষিণে ৪৪জন, কচুয়ায় ২৮জন, হাইমচরে ৩৩জন ও মতলব উত্তরে ২৭জন আক্রান্ত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত