লর্ডসে ওটাই ছিল ইয়ান বোথামের প্রথম টেস্ট। খেলা শুরু হয় ১৯৭৮ সালের ১৫ জুন। চতুর্থ দিন অর্থাৎ ১৯ জুন লাঞ্চের ৭ মিনিট আগেই ইনিংস ও ১২০ রানে হেরে যায় পাকিস্তান। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর বোথাম ৩৪ রানে ৮ উইকেট নিয়ে ধসিয়ে দেন প্রতিপক্ষকে। ‘সেই মুহূর্তে লর্ডসে দানব হয়ে উঠেছিল বোথাম’ বলেছিলেন ইংলিশ অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি। বিধ্বস্ত পাকিস্তান অধিনায়ক ওয়াসিম বারি বলেন, ‘বোথাম ওয়াজ জাস্ট আনপ্লেবল।’
এক ম্যাচে সেঞ্চুরি আর ৮ উইকেট নেওয়ার ঘটনা টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। বোথামের পারফরমেন্সের তুলনা হতে পারে কেবল টনি গ্রের সঙ্গে। ১৯৭৪ সালে উইন্ডিজের বিরুদ্ধে বার্বাডোজে ১৪৩ রানের পর ৬ উইকেট নিয়েছিলেন টনি।
বোথামের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল মাত্র ২১ বছরে। লর্ডস টেস্টের ঠিক ১১ মাস আগে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ট্রেন্টব্রিজে অভিষেক টেস্টে ৭৪ রানে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। লর্ডসে ক্যারিয়ারের ছয় নম্বর টেস্ট খেলতে নামার আগেই বোথাম অবশ্য দুটি সেঞ্চুরি আর চারবার ৫ উইকেট তুলে নেন। অলরাউন্ডার হিসেবে তখন প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানের বিপক্ষে তার লর্ডস পারফরমেন্স সেই প্রতিষ্ঠায় অনুষ্ঠানিক সিলমোহর দিয়েছিল। টেস্ট ক্রিকেটে বোথামের উত্থানকে উইজডেন তুলনা করেছিল ধূমকেতুর সঙ্গে।
লর্ডস টেস্ট শেষ হয়েছিল চারদিনে। প্রথম দিন কোনো খেলা হয়নি। টস জিতে ব্রিয়ারলি আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ৩৬৪ রান করে। দলের তিন তরুণ তুর্কিই ভালো খেলেছিলেন। ২৪ বছরের গ্রাহাম গুচ করেন ৫৪। একুশের যুবা ডেভিড গাওয়ার করেন ৫৬। আর ২২ বছরের বোথাম করেন ১০৮। তিন অঙ্কে পৌঁছান দিনের শেষ ওভারে। দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট উইকেটে থেকে মেরেছিলেন ১১টা বাউন্ডারি। প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান মাত্র ১০৫ রানে অলআউট হয়েছিল। ৩৬ ওভার স্থায়ী ইনিংসে বোথাম ৫ ওভার বল করার সুযোগ পেয়েছিলেন, উইকেট পাননি। তৃতীয় দিনে ফলোঅন করতে নেমে পাকিস্তানের স্কোর ছিল ২ উইকেটে ৯৬। মোহসিন খান ৪৫ ও তালাত আলি ৩৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। মুদাসসর নজরকে ১০ রানে ফিরিয়ে দেন বোথাম। আর বব উইলিসের শিকার সাদিক মোহাম্মদ কোনো রান করতে পারেননি। চতুর্থ দিন পাকিস্তানের ৮ উইকেটের সাতটিই নিয়েছিলেন বোথাম। কেবল মোহসিন খানকে আউট করেন বব উইলিস।
লর্ডসে সেদিন ২০ হাজার দর্শকের সামনে অতিমানবীয় পরফরমেন্স দেখিয়েছিলেন বোথাম। ২৫৯ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে পাকিস্তান। তৃতীয় দিন পর্যন্ত ভালোই খেলেছিল তারা। চতুর্থ দিনে সব এলোমেলো করে দেন বোথাম। ১৯ জুন মানে সোমবার সকালে পাকিস্তান শেষ ৮ উইকেট হারিয়েছিল মাত্র ৪৩ রানে। বোথাম এমন আউটসুইং করাচ্ছিলেন যে ব্যাটসম্যানরা ওভারে তিন চারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন।
পাকিস্তানের হয়ে ২৩ টেস্ট খেলা হারুন রশিদ দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৪ রান করে বোথামের বলে বোল্ড হয়েছিলেন। নিজের অবিজ্ঞতা সম্পর্কে পরে বলেন, ‘১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ড সফরে মেঘ-বৃষ্টির মধ্যে খেলতে হয়েছিল। আর কে না জানে ইংল্যান্ডের সিক্ত সামারে বল বেশি সিম আর সুইং করে। প্রচুর মুভমেন্টও থাকে। প্রথম টেস্ট হেরে আমরা লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছিলাম। প্রথম ইনিংসের মতোই দ্বিতীয় ইনিংসে বিধ্বস্ত হই। আমার গতির বল খেলতে অসুবিধা হতো না। কিন্তু বোথাম যে ভাবে গতির সঙ্গে সুইং করাচ্ছিলেন তা মোটেই খেলতে পারছিলাম না। দ্বিতীয় ইনিংস বোথামের বল লেগ স্টাম্পের বাইরে পরে এমন ভাবে ঢুকেছিল যে আমার কিছু করার ছিল না। আমি ব্যাট-প্যাড নিয়ে স্টাম্প বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পেছন ফিরে দেখি অফ স্টাম্প উড়ে গেছে। মাথা নিচু করে প্যাভিলিয়নে ফেরার সময় ইংলিশ উইকেটরক্ষক বব টেইলর আমায় সান্ত¡না দিয়ে বলেছিল- এই বলে তোমার কিছুই করার ছিল না।’
১০২ টেস্টের ক্যারিয়ারে বোথাম এমন বোলিং অনেকবার করেছেন। সঙ্গে ব্যাটিংও। ১৯৮১’র অ্যাশেজ যার প্রমাণ। ইংল্যান্ডের অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর সেই সিরিজ খেলতে নেমে যা করেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া কোনো দিন ভুলতে পারবে না। ব্যাটে-বলে অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন বোথাম। এতটাই যে সমঝদাররা একাশির অ্যাশেজকে এখনো বোথাম অ্যাশেজ নামে ডাকে।
