নদ-নদীর পানি বাড়ছে, ৫ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস

আপডেট : ২১ জুন ২০২০, ০৫:৫৩ এএম

বর্ষার এক সপ্তাহ না যেতেই দেশের কিছু এলাকায় বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ইতিমধ্যেই দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল শনিবার পানি সমতল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রেই পানি বেড়েছে। ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টের পানি গতকাল বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এর প্রভাবে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার বেশকিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় চার হাজার মানুষ। তবে গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ নদীর পানি কমতে থাকায় প্লাবিত এলাকার পানিও নামতে শুরু করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, চলতি মাসের শেষ দশদিন ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি অব্যাহতভাবে বাড়তে পারে এবং মাসের শেষ দিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধিকাংশ নদীতেই পানি বাড়ছে। এই মুহূর্তে শুধু তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করলেও আগামী কয়েকদিন আরও বেশকিছু স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এক সপ্তাহ পর কিছু এলাকায় বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা এক সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এছাড়া নদ-নদীর পানিবৃদ্ধি ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ইতিমধ্যেই রংপুর, লালমনিরহাট, কক্সবাজার ও বান্দরবানসহ কয়েকটি জেলায় হালকা বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দেশের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি আগামী জুলাইয়ের মাঝামাঝি নাগাদ অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নদ-নদীগুলোর পানি সমতল পর্যবেক্ষণের মোট ১০১টি স্টেশনের মধ্যে ৬৮টি স্টেশনে পানি বেড়েছে এবং ৩৩টি স্টেশনে পানি কমেছে। কোনো স্টেশন বা পয়েন্টেই পানি সমতল অপরিবর্তিত থাকেনি। তাদের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বাড়ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

এছাড়া সতর্কীকরণ কেন্দ্রের চলতি মাসের শেষ দশদিনের সম্ভাব্য পূর্বাভাসে বলা হয়েছেÑ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সমতল এই দশদিন বাড়তে পারে। এই সময় কোনো কোনো জায়গায় পানি সমতল বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটারের মধ্য চলে আসতে পারে। এর প্রভাবে মাসের শেষ নাগাদ কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা হওয়ার ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা-পদ্মার পানি সমতল বাড়তে পারে, তবে আপাতত বিপদসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা নেই। এছাড়া ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পানি সমতলও সামান্য বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও বিপদসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা নেই।

এদিকে গত কয়েকদিনের মতো গতকালও দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু মোটামুটি সক্রিয় থাকায় সব বিভাগেই বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড় বা দমকা হাওয়ার আশঙ্কায় দেশের চারটি সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।

এদিকে তিস্তার পানির বিপদসীমা অতিক্রম বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, উজানের ঢলে গত শুক্রবার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর বিকাল থেকে ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় শনিবার সকাল ৬টায় বিপদসীমা অতিক্রম করে ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর থেকে পানি আবার কমতে শুরু করে এবং বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিনি আরও জানান, ‘বিপদসীমা অতিক্রম করায় তিস্তা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের সতর্কাবস্থায় থাকার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোথাও বন্যা দেখা দেয়নি তবে আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কাবস্থায় রয়েছি।’

অন্যদিকে সকালে তিস্তার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় নদী সংলগ্ন বেশ কয়েকটি চরগ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় দুই হাজার মানুষ। ডিমলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের টাবুর চর গ্রামের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত দুই হাজার মিটার বালুর বাঁধটি হুমকির মুখে রয়েছে। বাঁধের প্রায় ৭০০ মিটার অংশ ভেঙে যাওয়ায় নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে ৪০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। তবে দুপুরের পর থেকে নদীর পানি কমতে থাকায় প্লাবিত এলাকার পানিও নামতে শুরু করেছে বলে জানান টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ময়নুল হক।

এদিকে তিস্তায় পানি বাড়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার প্রায় ২ হাজার মানুষ। জানা গেছে, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেওয়ায় গত শুক্রবার রাতে হঠাৎ পানি বাড়তে থাকে। গতকাল সকালে তা বিপদসীমা অতিক্রম করে। এতে হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্ণা, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী ও ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়ন; কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈলমারী, নোহালী ও চর বৈরাতী এবং আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে এসব ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, পানিবন্দি পরিবারগুলোর তালিকা চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নীলফামারী ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত