বাজেটে যুবদের বিষয় তেমন গুরুত্ব পায় না আখ্যা দিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “আমাদের যুবরা প্রতিভার পুরোপরি বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পেলে বাজেট বাস্তবায়নে সফলতা আসবে।”
একশনএইড বাংলদেশ ও ডেইলি স্টারের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে কোভিড -১৯ সংকট সম্পর্কে যুবদের দৃষ্টিভঙ্গি: জাতীয় বাজেটের প্রতিফলন ২০২০-২১ শীর্ষক এক অনলাইন সেমিনারে এই বক্তব্য তুলে ধরেন একশনএইড বাংলদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর।
করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখে বিভিন্ন খাতকে নতুন ভাবে সাজানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অনানুষ্ঠানিক খাতে বাংলাদেশের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ মানুষ কাজ করে, করোনার কারনে সেই খাতগুলিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মানুষ কাজের জন্য গ্রাম থেকে শহরমুখী ছিলো, এখন অনেকেই কর্ম হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।”
কভিড-১৯ এর কারণে উদ্ভূত ভিন্ন পরিস্থিতিতে যে ভিন্ন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো কি এবং কতটুকু আমরা অর্জন করতে পারছি যে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেন ফারাহ কবির।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এই বাজেট দেখতে চান বলে তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যুবদের জন্য অনলাইনে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য খাতেও যুবদের কথা চিন্তা করে বাজেট প্রণয়ন প্রয়োজন।”
স্বাস্থ্য সেবার সাথে যুক্ত পেশা উন্নয়নে বাজেটে বেশি বরাদ্দের আশা প্রকাশ করেন তিনি । পাশাপাশি দেশীও বাজারকে চাঙ্গা করতে নতুন নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশ বিপর্যয় রোধের দিকেও বাজেটে নজর রাখতে হবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, “প্রথাগত শিক্ষার বাইরে এসে বাস্তব প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা, শহরমুখী প্রবণতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা এবং কর্মস্থানের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন আনতে হবে। সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমাদের উচ্চশিক্ষার মান এখন্ও আন্তর্জাতিক মানের নয় যে আমার দেশের বাইরে গিয়ে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারি।”
সরকার সময় উপযোগী কারিগরি শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,“দক্ষতা ভিত্তিক কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যৎে মোট শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশকে কারিগরি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা।”
কভিড পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত চিন্তার সময় এসেছে উল্লেখ করে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, “ধনী হওয়া লক্ষ্যের চাইতে টেকসই মানব উন্নয়নের দিকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে এবং এই লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।”
যুবদের সাথে সম্পৃক্ত ২২ টি মন্ত্রণালয় রয়েছে উল্লেখ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক তার বক্তব্যে বলেন, “অনলাইন ও প্রযুক্তিতে খাতে এই সময়ে বেশি গুরুত্ব এবং বরাদ্দ দেয়া হয়েছে । করোনা আমাদের যেমন অসুবিধায় ফেলেছে তেমনি আমাদের অনেক সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে”।
ফ্রিল্যান্সিং এর মতো অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মানসিক পরিবর্তন আনা জরুরি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের অর্থনীতিকে আরোও বেশি বৈচিত্রময় করতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন খাত ও শিল্পের দিকে আমাদের ধাবিত হতে হবে , তা না হলে দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে।”
বর্তমান পরিস্থিতিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে তুলনা করে বাংলাদেশে ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রফেসর ড. আতিউর রহমান তার অভিমত প্রকাশ করে বলেন, “স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আরেওা বেশি আলোচনার প্রয়োজন ছিলো। যে হারে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে সেটা যদি আমরা এখনই রোধ করতে না পারি, স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা যদি মানুষকে আশ্বস্ত করতে না পারি তাহলে সব ব্যর্থ।”
স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়লেও তাদের দক্ষতা এখন্ও নাজুক উল্লেখ করে দ্রুত প্রায় ২ লক্ষ্ স্বাস্থ্যকর্মী জরুরি ভিত্তিতে প্রস্তুত ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে বলে জানান তিনি। চিন্তা, ভাবনা, ও কর্মে তরুণরাই সবচেয়ে এগিয়ে উল্লেখ করে নীতি নির্ধারণে তরুণদের ভাবনাকে অন্তর্ভূক্ত করার প্রতিও জোর দেন ড. আতিউর ।
করোনা পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও টেস্ট কিট প্রান্তিক পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সেখানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে যুব ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার কথাও বলে ড. আতিউর রহমান।
আন্তর্জাতিক অর্থ প্রদানকারী সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলার কথাও বলেন তিনি । দেশের বিভিন্ন ব্যাংককে পার্টনারশিপে যেতেও পরামর্শ প্রদান করেন ড. আতিউর । ব্যাংক রিস্ক ম্যানেজমেন্ট নিয়ে দ্বিধান্বিত থাকার কারণে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন। পাশাপাশি প্রবাসে সম্পদশালীদের এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি । ব্যাক্তির সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলেই বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেল সম্ভব বলে তিনি মনে করেন ।
সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন নেটওয়ার্ক ওন ইকোনোমিল মডেলিং (সানেম) এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. সেলিম রায়হান তার বক্তব্যে বলেন, “স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে না সাজালে এবং করোনা নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে সরকারের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে।”
করোনা পরিস্থির কারণে তরুণ, নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে উল্লেখ করে বাজেটে এই বিষয়ে বিশেষ কোন প্রতিফলন দেখছেন না বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বাজেটে বৃত্তিমূলক ও মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটকে আলাদা করার আহবান জানান ড. সেলিম রায়হান।
গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন এর সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার মোস্তফা, বলেন, “যুবদের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রণের সুযোগ না থাকলেও স্থানীয় সরকার এই প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করতে পারে”।
তিনি আরও বলেন, “কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে শিক্ষায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। অনলাইনে ক্লাস চলছে, কিন্তু আমাদের কতভাগ শিক্ষার্থী প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করে? ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেও কতটুকু এগুতো পেরেছি আমরা? কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার প্রশ্নে আমাদের কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে।”
প্রথম আলো ইয়ুথ প্রোগ্রাম প্রধান মুনির হাসান বলেন, “ডিজিটাল বাংলাদেশ সারা দেশকে একটা নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে। ইন্টারনেটের অধিক ব্যবহার ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও বিনোদনমূলক সাইটে। বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রমে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়লেও ইন্টারনেট খরচ অনেক। ”
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও গ্রাম পর্যায়ে বড় আকারে হটস্পট করে পিছিয়ে পড়া লোককে ইন্টারনেট সেবার আওতায় নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি ।
বাজেটে বরাদ্দের ব্যবহার, সঠিক ব্যয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) এর সভাপতি ইজাজ আহমেদ বলেন, “শিক্ষা বিষয়ক ওয়াবসাইট ফ্রী তে ব্রাউজ করার সুযোগ দেয়া উচিত।”
পাশাপাশি যুব কর্মসংস্থানে উদ্যোক্তাদের অর্থ সহায়তা, অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা অর্জন করতে পারলে এ পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া যাবে মনে করেন ইজাজ আহমেদ ।
এই মুহুর্তে উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এসএমই ফাউন্ডেশন এর পরিচালক ইসমত জেরিন খান বলেন, “আমরা সবাই সবার জায়গা থেকে এই করোনা যুদ্ধে লড়ছি আর এই যুদ্ধের সৈনিক বর্তমান তরুণরা। নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে কার্যকর পরিকল্পনা ও থোক বরদ্দ দিতে হবে”।
ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাবার ব্যপারে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি ও ছোট-বড় উদ্যোক্তারা সমন্বিতভাবে এই সংকট মোকাবেলা করতে পারবে বলে তিনি অভিমত দেন। আগামীর শিল্প হবে গবষণা খাত কেন্দ্রীক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “গবেষণা খাতকে নতুন করে ব্যবসা খাত এবং স্বাস্থ্য বাণিজ্যখাতের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।”
সেমিনারে অগ্রাধীকারের ভিত্তিতে বেকার ভাতা চালু ও তহবিল গঠন করার প্রস্তাব রাখেন ডিনেট এর নির্বাহী পরিচালক অনন্য রায়হায়। পাশাপাশি বাজেটে বরাদ্দকৃত টাকার সঠিক ব্যয় হচ্ছে কি না সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার প্রতিও জোর দেন তিনি।
বর্তমানে করোনার বিস্তারের কারণে বাল্য বিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন ব্যপক হারে বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন সেমিনারে অংশগ্রহণকারী যুব প্রিতিনিধিরা। পাশাপশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই এই শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে পারবে কি না সে বিষয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। যুবদের কর্মসংস্থান এর সুযোগ অনেক কমে গেছে উল্লেখ করে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির প্রতিও যুব প্রতিনিধিরা জোর দেন।
বাজেটে নারী কৃষকদের জন্য আলাদা কোন বরাদ্দ নেই, এমনকি নারীকে কৃষক হিসেবে বিবেচনাই করা হয় না বলে উল্লেখ করেন জান্নাতুল মাওয়া নামের একজন এক্টিভিস্ট, বাংলাদেশ ভলেন্টিয়ার।
