মানুষের সুস্থতা ও অসুস্থতা আল্লাহতায়ালারই দান। একজন মানুষ সুস্থাবস্থায় যেমন অনেক কাজ করতে পারে, তেমনি অসুস্থাবস্থায়ও অনেক কিছু করতে পারে। আল্লাহর বিধিনিষেধ মতে জীবন পরিচালনা করলে একজন মুসলিমের পুরো জীবন আল্লাহর কাছে এবাদত বলে গণ্য হবে। তাই রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুমিনের সব কিছুই বিস্ময়কর। তার সবকিছুতেই কল্যাণ নিহিত। এমনটি কেবল মুমিনের জন্যই প্রযোজ্য। সে ভালো অবস্থায় থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলে, তার জন্য এটা কল্যাণ বয়ে আনবে। আর বিপদগ্রস্ত হয়ে ধৈর্য ধারণ করলে, এটাও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।’ (সহিহ মুসলিম : ২৯৯৯)।
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, তার দেখাশোনা ও শুশ্রƒষায় নিয়োজিত থাকা অনেক বড় পূণ্যের কাজ। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তৈরি হয় অন্যদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতাবোধ। ভ্রাতৃত্ববোধ জাগে রোগীর মনে। এতে তার দুঃখ-ব্যথা, চিন্তা ও হতাশা কেটে যায়। শারীরিক অক্ষমতা ও রোগ-ব্যাধির উপশম ঘটে। মানসিকভাবে কিছুটা সবল হয়ে ওঠে রোগী। সালফে সালেহিনের অন্যতম নীতি ছিল, কাউকে দেখা না গেলে, তার খোঁজখবর নেওয়া। সে উপস্থিত থাকলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। আর না থাকলে তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর রাখা। আর অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া ও সেবায় নিয়োজিত হওয়া।
অসুস্থের শুশ্রƒষা করা মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘একজন মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি হক আছে। সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তা কী কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার সঙ্গে কোনো মুসলিমের সাক্ষাৎ হলে তাকে সালাম দেবে। কোনো কাজে ডাকলে, সাড়া দেবে। পরামর্শ চাইলে পরামর্শ দেবে। হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে, উত্তরে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে। অসুস্থ হলে দেখতে যাবে। মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৭০২)।
শাইখুল ইসালাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘যে নেয়ামত আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তার চেয়ে বিপদে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া অনেক উত্তম।’ (তাসলিয়াতুল কুলুব, ১৭৫)। অসুস্থতার অন্যতম উপকারিতা হলো, এতে মানুষের পাষাণ মন নরম হয়। অন্তর মুক্তি পায় সব রকম রোগ-ব্যাধি থেকে। তাই দেখা যায়, সুস্থাবস্থায় দেহে শক্তি থাকায় মানুষ যা মনে চায় তাই করে। কিন্তু অসুস্থ হলে দেহের সতেজ ভাব ও উদ্যম হারিয়ে যায়। মন-মস্তিষ্ক হয়ে পড়ে দুর্বল। আর তখনই অন্তর বিনয়ী হয়। দূর হয় বেপরোয়া মনোভাব। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযি (রহ.) বলেন, ‘অহংকারী, পাপাচারী, বদমেজাজি লোকেরা দুনিয়ায় কোনো প্রকার বিপদ-আপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন না হলে তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মফলে ধ্বংস হয়ে যেত। তাই বান্দাদের ওপর মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। এতে বান্দার পাপ মোচন হয়।’ (যাদুল মাআদ, ১৭৩/৪)। তাই অসুস্থতার সময়ে কাউকে দেখতে গেলে তার অন্তর অনুতপ্ত হবে। ভবিষ্যতে ভালো ও সৎ জীবনের প্রত্যাশা করবে।
হাদিসে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার অনেক ফজিলত বর্ণিত আছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসোনি। তখন বান্দা বলবে, হে আমার রব, আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে আসব, আপনি তো দুনিয়া-আখেরাতের মালিক। আল্লাহ বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, তুমি তাকে দেখতে আসোনি। তাকে দেখতে এলে আমাকেও পেতে। হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাবার দাওনি।’ বান্দা বলবে, হে আমার রব, আপনাকে কীভাবে খাবার দেব, আপনি তো উভয় জগতের রব। তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত ছিল, তুমি তাকে খাবার দাওনি। তাকে খাবার দিলে তা আমার কাছেও পেতে। হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছি, তুমি আমাকে পানি দাওনি।’ বান্দা বলবে, হে আমার রব, আপনাকে আমি কীভাবে পানি পান করাব, আপনি তো উভয় জগতের রব। তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছে, তুমি তাকে পানি দাওনি। তাকে পানি দিলে তা আমার কাছেও পেতে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৬৪৮, আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫১৭)।
আবু ফাখেতা (রহ.) বলেন, আলি (রা.) আমার হাত ধরে বললেন, চলো, অসুস্থ হাসান (রা.)-কে দেখে আসি। আমরা গিয়ে আবু মুসা (রা.)-কেও সেখানে দেখতে পেলাম। আলি (রা.) বললেন, হে আবু মুসা, রোগী দেখার জন্য এসেছ, নাকি এমনিতে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছ? আবু মুসা (রা.) বললেন, না, আমি বরং রোগী দেখতে এসেছি। তখন আলি (রা.) বললেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেউ সকালে কোনো রোগী দেখার জন্য এলে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর রাতের বেলায় দেখতে এলে, ৭০ হাজার ফেরেশতা সকাল পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। জান্নাতে তার থাকবে একটি খেজুর গাছ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৯৬৯)।
হাদিসে বর্ণিত রোগী দেখার কতিপয় সুন্নাত-আমল নিম্নে বর্ণনা করা হলো।
উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা : রোগীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে উপযুক্ত সময়ে যেতে হবে। অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থী যখন-তখন রোগীর সঙ্গে দেখা করতে আসে। এতে রোগীর খুব কষ্ট হয়। অপারেশন থেকে সবেমাত্র বের করা রোগীর সঙ্গেও অনেকে দেখা করতে উদগ্রীব হয়ে যায়। আবার অনেকে রোগীর বিশ্রামের সময়েও সাক্ষাৎ করতে আসে। তেমনি রোগীর ঘুমের সময় ও খাবার গ্রহণের সময়েও সাক্ষাৎ করা উচিত নয়। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) রোগী দেখতে যেতেন তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর।’ (ইবনে মাজাহ : ১৪৩৭)।
রোগীর অবস্থা জিজ্ঞেস করা : রোগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাও সুন্নত। তবে রোগী যদি কথা বলতে না পারে, তাহলে কথা না বলাই ভালো। নাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, ওমর (রা.) কোনো রোগীকে দেখতে এলে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। আর রোগীর কাছ থেকে উঠে গেলে বলতেন, আল্লাহ তোমার ভালো করুন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ : ৫২৭)।
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করা : রোগী দেখতে এসে তার জন্য দোয়া করা সুন্নত। এতে প্রশান্ত হয় রোগীর অন্তর। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) কোনোর রোগী দেখতে এলে রোগীর শিয়রে গিয়ে বসতেন। অতঃপর সাতবার এ দোয়া পড়তেন, ‘আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আন ইয়াশফায়াকা’। (অর্থ : আমি মহান আল্লাহর কাছে কামনা করছি, আরশের মহান রবের কাছেও কামনা করছি, তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন)। এতে রোগী দেরিতে হলেও সুস্থ হয়ে উঠত।’ (মুসনাদের আহমাদ : ২২১২৯, আল আদাবুল মুফরাদ : ৫৩৬)।
রোগীকে সাহস জোগানো : রোগীকে দেখতে এসে তার মনে সাহস জোগানো উচিত। তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা, যেন তার অন্তরে বেঁচে থাকার আশা জেগে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রোগীর সঙ্গে এমনভাবে কথা বলো, যেন সে অন্তরে সান্তনা লাভ করে।’ (তিরমিজি : ২০৯৪)। এছাড়া রোগীকে ধৈর্য ধারণ করতে বলাও সুন্নত। এ সময় ধৈর্যের সাওয়াব সম্পর্কে বলা। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি কোনো মুমিন বান্দাকে পরীক্ষায় ফেললে, সে এতে ধৈর্য ধারণ করল এবং সাওয়াবের প্রত্যাশা করল আর আমার প্রশংসা করল, সে বিছানা থেকে গুনাহমুক্ত হয়ে এমনভাবে উঠবে যেন সে সদ্যভূমিষ্ঠ শিশু।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৭২৪৮)।
অসুস্থ ব্যক্তির কাছে দোয়া প্রার্থনা করা : অসুস্থ ব্যক্তির কাছে দোয়া প্রার্থনা করা মুস্তাহাব। এ সময় সে আল্লাহর খুব কাছে থাকে। তাই আল্লাহর কাছে তার দোয়াগুলো দ্রুত কবুল হয়। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আমাকে বলেন, ‘তুমি কোনো রোগীর কাছে গেলে তাকে তোমার জন্য দোয়া করতে বলবে। তার দোয়া ফেরেশতাদের মতো আল্লাহর কাছে কবুল হয়। (ইবনে মাজাহ : ১৪৪১)।
