নৈতিক চরিত্রের উন্নয়নের জন্য

আপডেট : ৩০ জুন ২০২০, ০৭:২৭ এএম

সন্তান হিসেবে সবাই মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করলেও নৈতিকতা, সুন্দর আচার-ব্যবহার, জ্ঞান-বুদ্ধি ও খোদাভীতির মাধ্যমে তৈরি হয় আসল মানুষ। কিন্তু বর্তমানে মানুষের বাহ্যিক উন্নতি হলেও নৈতিকতাবোধের চরম অধঃপতন ঘটেছে। সততা, নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, পরমত-সহিষ্ণুতা, অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকাসহ সামাজিক ও ধর্মীয় পাপাচারমূলক কার্যাবলি থেকে বিরত থাকা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানবিক গুণাবলি ছাড়া সত্যিকারের মানুষ হওয়া যায় না। কিন্তু অর্থলিপ্সা, লোভ, দুর্নীতি, প্রতিহিংসা, অনৈতিক কার্যক্রম, অবৈধ লেনদেন, জুয়া, নারী ও মদের তীব্র নেশা অনেকের সাধারণ অভ্যাসি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের আগামীর দিনগুলোকে ভয়াল কালো মেঘে আচ্ছাদিত করে ফেলবে।

তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে কিশোর-তরুণরা নানাভাবে যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনি এর অপব্যবহারও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উঠতি বয়সের তরুণদের কাছে অতিসহজেই অশ্লীল ছবি বা ভিডিও পৌঁছে যাচ্ছে। যার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ। তা ছাড়া উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে হ্যাকারদের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, অপরকে হেয়প্রতিপন্ন করা ও প্রতিকৃতির ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন এখন অতি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

উঠতি বয়সের সবার মধ্যে অতি-চঞ্চলতা ও উদ্যমতা বিরাজ করে। এ সময় মন্দের আকর্ষণ থাকে প্রবল মাত্রায়। তাই প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহার কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। তা ছাড়া আদর্শ মুসলিম হিসেবে সব ধরনের মন্দ কাজ পরিহার করা আবশ্যক। আর সমাজে অশ্লীলতা ও পাপাচারের প্রচার-প্রসারে যারা লিপ্ত হবে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তার ঘটুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি আছে, আল্লাহতায়ালা সঠিকটি জানেন, তোমরা তা জানো না। হে ইমানদাররা, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, যারা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে (জেনে রাখো) সে অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজের আদেশ প্রদান করে, তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ না থাকলে তোমাদের কেউ গুনাহ থেকে পবিত্র থাকতে পারবে না, তাই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র রাখেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বোজ্ঞ।’ (সুরা নুর, আয়াত : ২০-২১)

শৈশব থেকে একজন শিশু মা-বাবার কাছে জীবনের মৌলিক শিক্ষা ও শিষ্টাচার রপ্ত করে। পরিবারের সহানুভূতি ও সম্প্রীতি শিশুর মধ্যে তৈরি করে মানবতাবোধ। মূলত শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু মা-বাবার অসতর্কতা বা পারিবারিক বিরোধ ও আত্মীয়স্বজনের হিংসা-বিদ্বেষ শিশুর কোমল অন্তরে অবক্ষয়ের বীজ বপন করে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছেও সব শিক্ষার্থী এখন আর নিরাপদ নয়। মানবিক গুণাবলি শেখার পর্বটি শিক্ষার্থীদের কাছে একটি অনর্থক কাজ বলে বিবেচিত। অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকা কিংবা অসামাজিক কাজের প্রতিবাদ করা অনেকের কাছে গৌণ বলে মনে হয়। তা ছাড়া ক্ষমতাবান শিক্ষার্থীদের সহায়তায় গড়ে ওঠে নানা রকম অসামাজিক কার্যকলাপ। ফলে সমাজের আগামীর চালিকাশক্তি এসব শিক্ষার্থী অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে পড়ছে।

অথচ পরিবার হলো সুষ্ঠু মানুষ গড়ে তোলার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। বাবা ও মা সন্তানের বেড়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে। তাই বাবা-মায়ের সুসম্পর্ক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খুবই প্রভাব বিস্তার করে। সন্তানের বুদ্ধিমত্তা ও মেধার বিকাশ ও চারিত্রিক উন্নয়নে তাদের দিকনির্দেশনা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকে। তাই ইসলাম বাবা-মাকে সন্তান লালনপালনে যতœবান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা নিজেকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)

সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘সর্বোত্তম দিনার হলো, যা পরিবারের জন্য ব্যয় করা হয়, আল্লাহর পথে বাহনের জন্য ব্যয় করা হয়, আল্লাহর পথে সঙ্গীদের জন্য ব্যয় করা হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৯৯৪)

সরকারি যেকোনো কাজে ‘দুর্নীতি’ একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ, জালিয়াতিসহ নানা রকম অপরাধে ঝুঁকে পড়ছে সরকারি কর্মকর্তারা। অবৈধ পন্থায় অর্থ আয়ের আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সবার মধ্যে অর্থলিপ্সা ও অপরাধপ্রবণতা চরম আকার ধারণ করছে। উচ্চবিত্তের সম্পদের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়লেও মধ্যবিত্তের কোনো গতি হচ্ছে না। অথচ একজন মুসলিম হিসেবে সবার মধ্যে দায়িত্ব সচেতনতা ও আর্থিক ক্ষেত্রে সততার গুণ থাকা অপরিহার্য। আল্লাহতায়ালা মুমিনদের গুণাবলির মধ্যে উল্লেখ করেন, ‘যারা নিজেদের আমানত তথা অর্পিত দায়িত্ব ও অঙ্গীকার বা চুক্তির ব্যাপারে সচেতন থাকবে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৬)

মানুষের কাছে মূল্যবান বস্তু নিরাপদ না থাকাই আমানতের অপব্যবহার করা। তাই কিয়ামতের একটি আলামত হলো, আমানতের খেয়ানত বেড়ে যাবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমানত নষ্ট হওয়া শুরু হলে তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করো।’ (বোখারি, হাদিস : ৬৪৯৬)

মার্জিত ব্যবহার ও উন্নত চরিত্র সম্পন্ন না হওয়াই কুপ্রবৃত্তি কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরার কারণ। এতে মদ, জুয়া ও নারীদেহের প্রতি আসক্তি চরম আকার ধারণ করে। পারিবারিক অস্থিরতা দেখা দেয়। স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বিবাদ হয়। ভেঙে পড়ে স্বপ্নের পরিবার। প্রতিহিংসা, অতি স্বার্থপরতা ও রুক্ষ মনোভাব তৈরি হয়। মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা ও সামাজিক সহায়তার কোনো আকাক্সক্ষা থাকে না। আবার পরিবার থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় নানা অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে অনেকে।

একজন মুসলিমের অন্যতম পরিচয় হলো, সততা ও সুন্দর আচার-ব্যবহার। তাই মুমিন ব্যক্তি মিথ্যা ও অপরাপর পাপকাজ থেকে যোজন যোজন দূরত্ব বজায় রাখবে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যাবে না, তা অশ্লীল ও মন্দ কাজ।’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ৩২)

আল্লামা সাদি (রহ.) বলেন, ‘ব্যভিচারের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব যেসব কাজের মাধ্যমে ব্যভিচারের সম্ভাবনা আছে, তা থেকে দূরে থাকাও মুসলিমের জন্য আবশ্যক।’ (তাইসিরুল কারিমির রহমান)

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদাররা, মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারক তীর শয়তানের ঘৃণিত কাজ, তোমরা তা বর্জন করো, এতে তোমরা সফলকাম হবে। শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায়, আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বিরত রাখতে চায়, অতএব এসব কাজ থেকে তোমরা কি বিরত থাকবে?’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৯০-৯১)

আবু বারজাহ আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের ওপর আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয়, তোমাদের লজ্জাস্থান ও উদরের কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তির জন্য।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১৪৩)

আনাস (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে একটি হাদিস শুনেছি, যা আমি ছাড়া আর কেউ তোমাদের বর্ণনা করবে না। তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের অন্যতম আলামত হলো, অজ্ঞতা ব্যাপক আকার ধারণ করবে, দীনের জ্ঞান কমে যাবে, ব্যভিচার প্রকাশ পাবে, মদপান করা হবে, পুরুষ কমে যাবে, নারী বৃদ্ধি পাবে, পরিস্থিতি এমন হবে যে একজন পুরুষ ৫০ জন নারীর দেখাশোনা করবে।’ (বোখারি, হাদিস : ৫৫৭৭, মুসলিম, হাদিস : ২৬৭১)

আবু দারদা (রা.) বলেন, আমার বন্ধু আমাকে অসিয়ত করেছেন, ‘তুমি কখনো মদপান করবে না। কেননা এটি হলো সব মন্দের মূল।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৩৭১)

আল্লামা শাতিবি (রহ.) বলেন, ইসলামে যেকোনো অপরাধের প্রতিকারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। নিজের ও অপরের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাময় সব পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে মানুষের মৌলিক পাঁচটি জিনিসের নিরাপত্তার জন্য ইসলামের বিধিবিধান আরোপ করা হয়। তা হলো, প্রাণের নিরাপত্তা, ধর্মের নিরাপত্তা, পরিবারের নিরাপত্তা, মেধার নিরাপত্তা ও সম্পদের নিরাপত্তা। এসবের নিরাপত্তার জন্য ইসলামি শরিয়াতে পর্যায়ক্রমে নানা রকম বিধান আরোপ করেছে।’ (আল মুওয়াফাকাত, ৫/২)

ইসলামের সঠিক অনুশাসনে অভ্যস্ত না হওয়ায় তরুণ-তরুণীরা বড় হয়ে ধর্মের বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে অন্তরে থাকছে না আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ইমান ও ভালোবাসা। ইসলামের শিষ্টাচার ও রীতিনীতির প্রতি তৈরি হচ্ছে চরম অবহেলা। শত্রুদের প্ররোচনায় নানা বিষয়ে অন্তরে জন্ম নিচ্ছে সন্দেহ। চিন্তা-চেতনা কেবল বস্তুবাদী ভোগ-সামগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। পরকালের ভাবনা ও আমলের স্পৃহা বিলুপ্ত হচ্ছে মন থেকে। আর এ থেকে রক্ষা পেতে সব শ্রেণির পরিবারকে সচেতন হতে হবে। ইসলামি চিন্তা-চেতনা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও শিক্ষার বিস্তার করতে হবে। কারণ একজন মানুষ নিজের পরিবেশ থেকেই সবকিছু শেখে। তখনই কিশোর-তরুণদের অন্তরে ইসলামের বীজ বপন করা যাবে।

মুসলিম যুবকদের পড়াশোনার পাশাপাশি ইমান, আকিদা, ইসলামি সংস্কৃতির বিষয়ে গভীর অধ্যয়নে মনোযোগী হওয়া দরকার। আল্লামা আবুল হাসান নদবী (রহ.) বলেন, ‘তরুণদের মনে ইসলামের চিরন্তন শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি অগাধ ও আস্থা ও বিশ^াস ফিরিয়ে আনা মুসলিম স্কলারদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ইবাদত।’ (রিদ্দাতুন ওয়ালা আবা বাকরিন লাহা, ১৯)

তাই চিন্তাশীল আলেমদের তত্ত্বাবধানে সমাজের সব শ্রেণির জন্য কোরআন-হাদিস ও ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোচনা এবং তা বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নে উৎসাহ প্রদান অত্যন্ত জরুরি। আর বাস্তব জীবনে ইসলামের সঠিক অনুশীলন নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত