গ্রামের লোকজন ২৫ বছর ধরে সমাজবদ্ধ হয়ে একত্রে এক জায়গায় পশু কোরবানি করছেন বলে জানা গেছে।
প্রতি বছর ১০০ এর বেশি পশু কোরবানি হলেও বন্যা ও করোনার কারণে এ বছর পশু কোরবানি কম হয়েছে বলে গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ভিপি আবু আহমেদ জানিয়েছেন।
এ বছর একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগে সমাজের ১১৮০ পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত মাংস বড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। করোনা ঝুঁকি এড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক শামীম আল মামুন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
জানা গেছে, পোষ্টকামুরী গ্রামটিতে প্রায় ছয় হাজার লোকের বসবাস। গ্রামের সব মানুষকে এক পরিবারের সদস্য মনে হয়। ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে আসার নামই ঈদের বার্তা। আর কোরবানির উদ্দেশ্য হলো ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই গ্রামবাসী সমাজবদ্ধ হয়ে দুই যুগের বেশি সময় ধরে একত্রে কোরবানি করে থাকেন।
গ্রামটিতে কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য রয়েছে শতাধিক মানুষের। তবে কোরবানির মাংসের জন্য গ্রামের কাউকে কোথাও যেতে হয় না। যারা কোরবানি দেন তারাসহ গ্রামের সবাইকে সমহারে মাংস দেয়া হয়। প্রতি বছর জনপ্রতি এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা হলেও এ বছর করোনা ঝুঁকি এড়াতে গ্রামটির এক হাজার ১৮০ পরিবারের মধ্যে সমহারে তিন কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়।
এছাড়া গ্রামের বাইরে থেকে আসা প্রায় পাঁচ শতাধিক দুস্থ ও গরিব মানুষের মধ্যে এক কেজি করে মাংস বিতরণ করেন গ্রামের লোকজন।
প্রতি বছর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি টানা চারবারের এমপি মো. একাব্বর হোসেনের বাড়ির মাঠে গ্রামবাসী একত্রে কোরবানি করে থাকেন।
এ বছর বন্যায় মাঠটি তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামের লোকজন গ্রামটির ভেতর দিয়ে যাওয়া ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের (পুরাতন) ওপর এবং কয়েকজন বাড়িতে পশু কোরবানি করেন।
বাড়িতে কোরবানি করা পশুর এক তৃতীয়াংশ মাংস নিজ দায়িত্বে মাংস বিতরণ কাউন্টারে পৌঁছে দেন। মহাসড়কের ওপর কোরবানি করা পশুর মাংস স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। পরে গ্রামটির এক হাজার ১৮০ পরিবারের মধ্যে তিন কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়।
এছাড়া গ্রামের বাইরে থেকে আসা পাঁচ শতাধিক দুস্থ ও গরিব মানুষের মধ্যে এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়।
গ্রামের মানুষের একসঙ্গে পশু কোরবানি দেয়া গ্রামটির রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে সামাজিক হৃদ্যতা বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি ভালো কাজে উৎসাহ পাচ্ছে গ্রামবাসী।
নতুন প্রজন্মেও তা অনুসরণ করে সমাজের কাজে ঈদের আন্দের দিনেও নিয়োজিত থাকে।
গ্রামবাসী জানায়, গ্রামটিতে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মাতাদর্শের লোকজন থাকলেও গ্রামের স্বার্থে এবং কোরবানি উপলক্ষে তা থাকে না। ধনী-গরিব সবার মাঝে ঈদের খুশি ভাগ করে নিতে একসঙ্গে পশু কোরবানি করেন পোষ্টকামুরী গ্রামের ছয় হাজার মানুষ।
ঈদের দিন কোরবানির পশু নিয়ে আসা হয় খোলা মাঠে। কোরবানির পর এক তৃতীয়াংশ মাংস একত্রিত করে তালিকা অনুযায়ী মাইকে নাম ডেকে মাংস বিতরণ করা হয়। মাংসের জন্য কাউতে ঘুরতে হয় না কারও দ্বারে দ্বারে। সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এই মেলবন্ধন চলছে দুই যুগ ধরে।
পোষ্টকামুরী গ্রামের বাসিন্দা মির্জাপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মুক্তিযোদ্ধা শহিদুর রহমান, অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন মনি, টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ সদস্য সাইদুর রহমান খান বাবুল, পৌর বিএনপির সভাপতি হযরত আলী মিঞা, অটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়ন মির্জাপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক মোতালেব মিয়া, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, গ্রামের মধ্যে যাদের কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য রয়েছে তাদের সবার পশু ঈদের দিন এক মাঠে আনা হয়। একে একে কোরবানি করা হয় সব পশু। এরপর মাংস সমান তিন ভাগের এক অংশ পৌঁছে দেয়া হয় সামাজিক কাউন্টারে। বাকি দুই ভাগ নেন কোরবানিদাতা।
এমন সামাজিক সম্প্রীতি দলমত মতপার্থক্য ভুলে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা গভীর করে বলে তারা জানান।
