সুশান্ত সিং রাজপুতের জীবন ছিল বিস্ময়কর। অনেকটা তার অভিনীত হিট বলিউড সিনেমার মতোই। সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টিস্ট থেকে তারকাখ্যাতি— তার রূপকথার মতো জীবনের অবসান ঘটে ১৪ জুন। ওই দিন নিজের ফ্ল্যাটে ৩৪ বছর বয়সী অভিনেতাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
এ ঘটনায় লাখ লাখ ভক্তের হৃদয় ভেঙে যায়। তারা সুশান্তর সাফল্যকে নিজেদেরই ভেবেছিলেন।
সুশান্ত এসেছিলেন ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য বিহার থেকে। পরিশ্রমী এই অভিনেতা ছিলেন দেশটির নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। কিন্তু নিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি এড়িয়ে কলেজ ছেড়ে চলে আসেন মুম্বাইয়ে— যেখানে প্রতিদিন হাজারো স্বপ্ন তৈরি হয় ও ভাঙে। শুরুর দিকে ছোট ছোট কিছু চরিত্রে অভিনয় করেন সুশান্ত। ছোটখাটো চাকরিও করেন, থিয়েটার করেছেন যত দিন না টিভি সিরিজে জনপ্রিয়তা পায়। এর পর বড়পর্দায় পা রাখেন। এ সব গল্প ছিল ছোট শহরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের অনুপ্রেরণা।
সুশান্তর মৃত্যুর খবর আসতেই মিডিয়ায় একে একে ওঠে আসে তার ক্যারিয়ার, আর্থিক অবস্থা, সম্পর্ক, এমনকি মানসিক অবস্থার হদিস। এ সব যাচাই না করা তথ্য হয়ে উঠে সোশ্যাল মিডিয়া ও নিউজ চ্যানেলে বিতর্কের বিষয়। তামাশা দেখার মতো এই কাভারেজে সুশান্তর থেরাপিস্ট, সাবেক রাঁধুনি, বন্ধু, ব্যবস্থাপক, পরিবার থেকে কলিগ কেউ বাকি নেই। ইন্টারভিউ ও এক্সক্লুসিভ নিউজের উৎস হয়ে ওঠেন তারা। অন্যদিকে পুলিশ একটু একটু করে তথ্য দিচ্ছিল, যা সুশান্তর মৃত্যুকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
অভিনেতার মৃত্যুর পর পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি ওঠে, বলিউডের ক্ষমতাবান পরিবার ও পরিচালকদের বাজে ব্যবহারের কারণে নিজেকে শেষ করেছেন তিনি। বলা শুরু হয়, কোনো ‘গডফাদার’ ছাড়া ইন্ডাস্ট্রিতে সুশান্তর উত্থান প্রভাবশালীরা মেনে নেয়নি। বারবার বলা হচ্ছিল, কীভাবে একে একে বড় বাজেটের সিনেমা থেকে তিনি বাদ পড়েন।
এ সব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে মুম্বাই পুলিশ বলিউডের অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তবে এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘স্বজনপোষণ’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিদ্রূপের শিকার প্রযোজক-পরিচালক করণ জোহরকে অবশ্য ডাকেনি পুলিশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিত্র সমালোচক জানান, বলিউডে ‘সঠিক যোগাযোগ’ না থাকা লোকদের স্বাগত জানানো হয় না— সুশান্তর মৃত্যুতে এই রূঢ় সত্য সামনে এলো। পেশাগত দ্বন্দ্ব এ নায়ককে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে কি-না এর জন্য পুলিশের তদন্ত ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষার কথাও বলেন তিনি।
এ দিকে আলোচনার আরেক প্রান্তে আছেন রিয়া চক্রবর্তী। সুশান্তর বান্ধবীর দিকে মনোযোগ মিডিয়ার। সম্প্রতি বিহার পুলিশের কাছে এই অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনা ও আর্থিক তছরুপের অভিযোগ এনেছেন সুশান্তর বাবা। এর পর তাকে ইডি’র মুখোমুখি হতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যতম চর্চার বিষয়ও রিয়া। সেখানে তাকে সুযোগসন্ধানী ও সুশান্তর টাকার প্রতি লোভী হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তবে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বরাবর সঠিক তদন্তের দাবি তোলেন রিয়া।
এ দিকে টিভি নিউজ চ্যানেল ও ওয়েবসাইটগুলো দুই তথ্যের দিকে জোর দিয়েছে। এক পক্ষ বলছে, রিয়া ও পরিচালকদের চাপে আত্মহত্যা করেন সুশান্ত। অন্যরা মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেন।
তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সৌমিত্র পাথারের মতে, মিডিয়া এ বিষয়ে নৈতিকতা ও চরমসীমা লঙ্ঘন করেছে। তার মতে, আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে মিডিয়ার আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখো তরুণ সুশান্তকে অনুসরণ করেন। এ সব খবর সেই সব তরুণদের মানসিক অবস্থা নাজুক করে দিতে পারে। আরও স্পষ্ট করে জানান, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মিডিয়া হাউসগুলোর বোঝাপড়া সীমিত। যেমন; বলিউডে বিষণ্ন মানুষ বলতে পাগলামি বা সারাক্ষণ মন খারাপ করা কাউকে চিত্রিত করে। এমনকি একটি চ্যানেল ‘এক্সক্লুসিভ ভিডিও’ উল্লেখ করে একটি ফুটেজ দেখানো হয়- যেখানে মৃত্যুর কয়েক মাস আগে নিজের বাসায় সুশান্তকে হাসিখুশি অবস্থায় দেখা যায়। এর পর বলা হয়, এত হাসিখুশি দেখে মনে হয় না তিনি বিষণ্নতার সঙ্গে লড়ছিলেন। এমন সিদ্ধান্তের বিরোধী ডা. সৌমিত্র।
সুশান্ত মৃত্যুর আগে গুগলে কী খুঁজেছিল এমন তথ্য মিডিয়াকে সরবরাহ করে পুলিশ। ডা. সৌমিত্র এরও সমালোচনা করেন। একই মত উত্তর প্রদেশের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বিক্রম সিংয়ের। জানান, এই সব তথ্য প্রকাশ তদন্তের কতটা সাহায্য করবে তার বোঝাপড়ার বাইরে। কিন্তু অনেক তরুণ একই বিষয় খুঁজতে পারে অনলাইনে, যা তাদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এ দিকে সুশান্তর মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি ময়দানও গরম। সামনে বিহারের নির্বাচন। অবাক হওয়া কিছু নেই যে, রাজনীতিকেরা সুশান্তর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলছেন ন্যায়বিচারের কথা। ইতিমধ্যে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার মামলাটির সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করেছেন। সেই কথা কাজেও লেগেছে। ক্ষমতায় নীতিশের সহযোগী বিজেপি এ সুপারিশ অনুমোদন করেছে।
তবে এটা স্পষ্ট নয়, মুম্বাই পুলিশের চলমান তদন্তে এটি কী প্রভাব ফেলবে। ইতিমধ্যে স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগও তুলেছে বিহার পুলিশ। বিহার থেকে তদন্তে আসা পুলিশ কর্মকর্তাকে কভিড-১৯ বাধ্যবাধকতা ভঙ্গের অভিযোগে পাঠানো হয়েছে কোয়ারেন্টাইনে। পুলিশ কর্মকর্তা বিক্রম সিং-এর মতে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াই খুবই নোংরা। তাদের বোঝা উচিত একটি পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছেন। তাই কিছুটা সংবেদনশীল হওয়া দরকার। সুশান্তর ভক্তদের দিকেও তাকানো দরকার। কিন্তু মিডিয়া সার্কাস ও রাজনীতি কোনোভাবেই তাদের সাহায্য করছে না।
বিবিসি অবলম্বনে
