পরিবেশদূষণের প্রতিবাদ করায় ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা পরিবেশকর্মীকে!

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২০, ১১:০১ পিএম

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় দূষণের প্রতিবাদ করায় এক পরিবেশ আন্দোলনকর্মীকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।

গত শুক্রবার আবদুল কাইয়ুম নামের ওই পরিবেশকর্মী ফার্নিচার ব্যবসার আড়ালে ‘ইয়াবার কারবার’ করেন এমন অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে যায় তাকে। তবে স্থানীরা সেই চেষ্টা ভণ্ডুল করে দেয়। পরে তারা অভিযোগ করে, মাধবপুরের শিল্প এলাকার ‘মার লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির তরফ থেকে কাইয়ুমকে ফাঁসানের চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু কোম্পানির তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওই ঘটনায় তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণের যে অভিযোগ ছিল তারও এখন কোনো ভিত্তি নেই।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার ও মাধবপুর থানার ওসি জানিয়েছেন, প্রথমে পুলিশকে কে বা কারা কাইয়ুমের ফার্নিচারের দোকানে ইয়াবার কারবার হয় বলে জানায়। তবে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, একটি কোম্পানির দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

জানা গেছে, আবদুল কাইয়ুমের বাড়ি মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের এখতিয়ারপুর গ্রামে। তিনি ব্যবসা করেন একই উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের শাহপুর নতুন বাজারে। ব্যবসার পাশাপশি তিনি পরিবেশদূষণ রক্ষায় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। মাধবপুরের শিল্প এলাকার ‘মার লিমিটেড’-এর বর্জ্যে এলাকার পরিবেশদূষণের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন তিনি।

কাইয়ুম দৈনিক দেশ রূপান্তরকে জানান, শুক্রবার বিকেল ৫টায় শাহপুর গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে মিলন (৩২) ও মুক্তার মিয়ার ছেলে জাবেদ (২৭) নামে দুই যুবক তার দোকানে যান। ফার্নিচার কেনার নামে দরদাম জিজ্ঞাসা করে কিছু সময় পরে তারা দোকান থেকে বের হন।

এরপর রাত ৯টার দিকে সাদাপোশাকে  মাধবপুর থানার তিন এসআই আহাদ, ইসমাইল ও এনামুল তার দোকানে আসেন। ফার্নিচারের ব্যবসার আড়ালে তিনি ইয়াবা ব্যবসা করছেন বলেই আর ঘরের কোথাও তল্লাশি না করে দোকানের শাটারের নিচ থেকে একটি পরিত্যক্ত সিগারেটের প্যাকেট বের করে তার ভেতর থেকে ৪০টি ইয়াবা বড়ি দেখান। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্কবিতর্ক শুরু হলে অন্যান্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজন জড়ো হন। তখন এসআই ইসমাইল একটি কাগজ বের করে জব্দ তালিকার জন্য দস্তখত করতে উপস্থিত কয়েকজনকে অনুরোধ করেন। এতে কেউ রাজি হননি। এ সময় তিন এসআই কাইয়ুমকে দোকানে রেখে উদ্ধার করা ইয়াবা নিয়ে চলে যেতে চাইলে স্থানীয় লোকজন তারা পুলিশ কি না, চ্যালেঞ্জ করেন।  মাধবপুর থানার ওসিকে বিষয়টি জানানো হলে এএসআই বিল্লাল কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন। স্থানীয়দের তোপের মুখে কাইয়ুম কারোর ষড়যন্ত্রের শিকার বলে স্থানীয়দের আশ^স্ত করে  তিন এসআইকে নিয়ে যান। তবে ঘটনার প্রতিবাদে রাতে এলাকাবাসী ট্রাক নিয়ে মাধবপুর থানায় গিয়ে ওসির বরাবরে এ বিষয়ে একটি অভিযোগ করেন। তবে ওসির অনুরোধে ওই অভিযোগ থেকে তিন এসআইর নাম বাদ দেওয়া হয়।

ওসি ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গোপনে খবর পাওয়া গিয়েছিল কাইয়ুম ইয়াবা ব্যবসা করছেন। কিন্তু পরে জানতে পারলাম তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কাইয়ুমের অভিযোগটির তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লা বলেন, মাদকের খবর পেলে তো পুলিশ ঘটনাস্থলে যাবেই। তবে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কাইয়ুম একজন ভালো মানুষ। তিনি ইয়াবার সঙ্গে জড়িত নন। পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন বলে কেউ তাকে ফাঁসাতে চেয়েছিল।

এ বিষয়ে বাপা হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল এক বিবৃতিতে জানান, হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েক বছর ধরে অনেকগুলো শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু খুবই আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, ওই সব শিল্পকারখানায় বেশির ভাগেরই কোনো সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়নি। বেশির ভাগ কারখানা থেকেই তাদের বর্জ্য শোধনাগারের মাধ্যমে পরিশোধিত না করে উন্মুক্ত স্থানে অথবা খাল-বিল, নদীতে ছেড়ে দিচ্ছে। আবদুল কাইয়ুম এই সব দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন কয়েক বছর ধরে।

যোগাযোগ করা হলে বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, মার লিমিটেড তার কারখানা পরিদর্শন করে পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য সরকারকে বিবাদী করে হাইকোর্টে রিট করেছে। মার লিমিটেড পরিবেশ নষ্ট করছে, তাই কারখানাটির গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ করার জন্য বেলার পক্ষ থেকে একটি আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে।

এদিকে এই অভিযোগের বিষয়ে মার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক সাদিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোম্পানির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তিও নেই। কোম্পানির বিরুদ্ধে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর না করার যে অভিযোগ আগে ছিল, এখন তারও কোনো ভিত্তি নেই। তারা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বসিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত