গাজীপুরে অগ্রণী ব্যাংক শ্রীপুর শাখার বিভিন্ন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও শাখা ব্যবস্থাপককে সরিয়ে ঢাকার একটি শাখায় নেয়া হয়েছে।
বরখাস্তরা হলেন ওই প্রতিষ্ঠানের শ্রীপুর শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মো. নজরুল ইসলাম, ক্যাশ অফিসার বদরুল হাসান সনি ও ক্যাশ অফিসার মো. দোলোয়ার হোসেন।
এ ঘটনায় ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। গ্রাহকরা তাদের অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স জানতে ব্যাংকে ভিড় করছেন।
অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপক মো. জাকির হোসেন জানান, ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখ টাকা উদ্ধার করে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা করা সম্ভব হয়েছে। যার সবই ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার বদরুল হাসান সনি দিয়েছেন। তবে কী পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে তা জানতে ব্যাংকে অডিট চলমান রয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের শ্রীপুর শাখার গ্রাহক জুয়েনা বেগম জানান, তার স্বামী ও ছেলে সৌদি আরব চাকরি করেন। সেখান থেকে তার অ্যাকাউন্টে তারা টাকা পাঠান। ১৩ জুলাই তিনি ওই অ্যাকাউন্টের তথ্য জানতে গিয়ে দেখেন সেখানে ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা কম। পরে বিষয়টি ম্যানেজারকে অভিযোগ করলে ১৪ জুলাই ৫ লাখ এবং ১৫ জুলাই ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা তার অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। ক্যাশ অফিসার বদরুল হাসান সনির বিরুদ্ধে ওই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর দুই ধাপে ওই টাকা তার হিসাবে জমা করা হয়।
আরেক গ্রাহক বদরুন নাহার ২৭ আগস্ট ব্যাংক ম্যানেজারের কাছে লিখিত এক আবেদনে জানিয়েছেন, বদরুল হাসান সনি প্রতারণা করে তার কাছ থেকে চেক বইয়ের একটি পাতা রেখে দেন। পরবর্তীতে ওই চেকের মাধ্যমে বদরুল হাসান সনি তার হিসাব থেকে এক লাখ টাকা তুলে নেন। বিষয়টি ধরা পড়লে ব্যাংক ম্যানেজারের মাধ্যমে ওই টাকা জমা দেন সনি।
এ ব্যাপারে ওই ব্যাংকের সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রিন্সিপাল অফিসার মো. নজরুল ইসলাম জানান, ক্যাশ অফিসার বদরুল হাসান সনি নিজেই গ্রাহকের স্বাক্ষর নকল করে চেক বই উত্তোলন করে। পরে চেকে নিজেই গ্রাহকের স্বাক্ষর দিয়ে টাকা তুলে আত্মসাৎ করে। চেকের নম্বর এন্ট্রি না করেই টাকা তুলে নিয়ে যান সনি। এ ঘটনা ধরা পড়ার পর ম্যানেজার তাকে শাসিয়েছেন একবার। অনেক সময় গ্রাহক ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে গেলে গ্রাহকের টাকা তার অ্যাকাউন্টে জমা না করেও তা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। অর্থাৎ সনি গ্রাহকের টাকা ডেবিট করেও আত্মসাৎ করেছেন, আবার ক্রেডিট করেও আত্মসাৎ করেছেন।
তিনি আরা জানান, সনি নিজের কম্পিউটারের আইডি লক হওয়ার কথা বলে আমার কম্পিউটার ব্যবহার করে অথবা কৌশল আমার আইডি ও কম্পিউটার ব্যবহার করে নিজেই অথরাইজ করে গ্রাহকের টাকা নিয়ে গেছে। এসব বিষয় ধরা পড়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করি। পরবর্তীতে ব্যাংকে অডিট কল করে কর্তৃপক্ষ। একইভাবে সনি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার দেলোয়ার হোসেনের আইডি ব্যবহার করেও টাকা অথরাইজ করে নিয়ে গেছেন। কাগজে-কলমে অথরাইজ করার কাজটিতে দেলোয়ার ও আমার নাম চলে আসায় টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দেলোয়ার হোসেন ও আমি সাময়িক বরখাস্ত হই।
নজরুল ইসলামের আইডি ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে বদরুল হাসান সানি বলেন, ব্যাংকের টাকা আমার পক্ষে তুলে নেয়া সম্ভব নয়। টাকা তুলে নিতে চারজনের স্বাক্ষর তথা ভেরিফিকেশন লাগবে। নজরুল ইসলাম আমার সিডি ইনচার্জ। তিনিও আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।
সনি গ্রাহকের টাকা তুলে নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, শুধু নিজেকে সেভ করার জন্য নিজের জমি বিক্রি করে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে ব্যাংকের ওই সব টাকা শোধ করছি। তিনি যা করেছেন, তা একা করেননি।
বদলি ব্যাংক ম্যানেজার আব্দুল হালিমকে ফোনে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের গাজীপুর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক শামীম আরা সুলতানা গণি সাংবাদিকদের জানান, আমরা গ্রাহক এবং এ প্রতিষ্ঠানের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় তার জন্য সব পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা গ্রাহকের টাকা রিফান্ড করার চেষ্টা করছি।
প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে শ্রীপুর শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মো. নজরুল ইসলাম, ক্যাশ অফিসার বদরুল হাসান সনি ও ক্যাশ অফিসার মো. দোলোয়ার হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত ও শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল হালিমকে ঘটনার ব্যাখ্যা তলব করে অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকায় দেয়া হয়েছে। ওই শাখার গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের হিসাবে ব্যালেন্স কনফার্ম করা হচ্ছে।
