‘ওই গ্যাসওয়ালাগো বিচার করণ দরকার’

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৩৩ এএম

‘দুই জামাইয়ে খুব মহব্বত। বাড়িতে একসাথেই নামাজ পড়তো। শুক্রবারেও একসাথে গেছিল। এশার নামাজের জন্য দাঁড়াইছিল এক কাতারেই। আর ওই রাইতেই ঘটলো বিস্ফোরণ। অহন দুইজনেই ছটফট করতাছে। না জানি মাইয়াগো কপালে কী আছে, বুকটা খালি ধড়ফড় করে। কেউ তো বাইচ্চা উঠতাছে না। খালি মরার কথা পাই। ওই গ্যাসওয়ালাগো (তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী) বিচার করণ দরকার। আগে থিকা যদি ঠিক করতো, তাইলে এই সর্বনাইশা কাম হইতো না।’ গতকাল রবিবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় চিকিৎসাধীন ইমান হোসেন ইমরান (৪০) ও আমজাদ হোসেনকে (৩৭) দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে বিলাপ করতে করতে এসব কথা বলছিলেন রওশন আরা নামে এক নারী। যিনি সম্পর্কে দগ্ধ ইমরান ও আমজাদের শাশুড়ি। দুই মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে বার্ন ইউনিটের পঞ্চম তলায় বিলাপ করতে দেখা যায় তাকে।

স্বজনরা জানান, ইমরান ও আমজাদ সম্পর্কে দুই ভায়রা। গত শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে অন্যান্য মুসল্লির মতো তারাও একসঙ্গে এশার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। ফরজ আদায়ের পর সুন্নাত পড়ছিলেন। তখনই বিকট শব্দে ঘটে বিস্ফোরণ। এতে তারা দুজনসহ অর্ধশতাধিক মুসল্লি দগ্ধ হন। যাদের মধ্যে ৩৭ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মরদেহ সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছে।

দগ্ধ আমজাদের স্ত্রী তানজিলা জানান, প্রায় আট বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। তার স্বামী পেশায় গাড়িচালক। পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে নিয়ে তার সুখের সংসার ছিল। মসজিদের বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে স্বামীর ঠাঁই মিলেছে এখন বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তানজিলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ তো সুস্থ হয় না। আমার স্বামীর কিছু হলে কী করব? কোথায় যাব এই মেয়ে নিয়ে?’ একই শঙ্কার কথা জানান তানজিলার বোন, মা ও অন্য স্বজনরা।

তারা জানান, দগ্ধ ইমান হোসেন ইমরান পেশায় পোশাক কারখানার শ্রমিক। স্ত্রী মুক্তা ও ৯ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে ইব্রাহিমকে নিয়ে তল্লা মসজিদের পাশেই ভাড়া বাসায় থাকতেন। বিস্ফোরণে ইমরানের মুখমন্ডল, বুক, পিঠ, হাত, পা ও শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। আমজাদের পুড়েছে শ্বাসনালির সঙ্গে মুখ, মাথা, দুই হাত ও পিঠ।

অগ্নিদগ্ধ স্বামীর শারীরিক যন্ত্রণার বর্ণনা দিতে গিয়ে তানজিলা বলেন, ‘সকালে তার (আমজাদ) কাছে গেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন। চিনতে পেরেছেন। কথা বলার চেষ্টা করেছেন। যতটুকু বুঝতে পেরেছি, যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। এখান থেকে বাসায় নিয়ে যেতে বলেছে। সকালে একটু স্যুপ খাওয়াইছি। আর কিছু দিতে পারি নাই।’

বার্ন ইউনিটের পঞ্চম পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি তার বোনের স্বামী ইমরানের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানান তানজিলা।

ইমরানের স্ত্রী মুক্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্বামীর অবস্থা ভালো নয়। ভয়ে ভয়ে সময় পার করছি। সন্তান নিয়ে নানা আশঙ্কায় রয়েছি।’

চিকিৎসকরা জানান, নারায়ণগঞ্জের ওই মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আমজাদ ও ইমরানসহ এখনো ১৩ জন চিকিৎসাধীন। যাদের সবাই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। সবারই শ্বাসনালি কমবেশি পুড়ে গেছে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও ঝলসে গেছে। চিকিৎসাধীন বাকিরা হলেন মামুন হোসেন (২৩), আবদুস সাত্তার (৪০), আবদুল হান্নান (৫০), আবদুল আজিজ (৪০), রিফাত (১৮), নজরুল ইসলাম (৫০), মো. কেনান (২৪), আবুল বাসার মোল্লা (৫১), মনির ফরাজি (৩০), শেখ ফরিদ (২১) ও মো. ফরিদ (৫৫)। এদের মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছে ছয়জনকে। তারা হলেন কেনান, ফরিদ, মনির ফরাজি, আজিজ, আমজাদ ও আবুল বাশার। অন্য সাতজনকে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।

গত শুক্রবার এশার নামাজ চলাকালে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে চারটি আলাদা তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শুরু করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মসজিদের নিচ দিয়ে তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন গেছে। ওই পাইপের লিকেজ থেকে বের হওয়া গ্যাস শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদে জমা হতে হতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারাও একই কথা বলেছেন। তারা জানান, মসজিদে সেজদা দিতে গেলেই গ্যাসের গন্ধ পেতেন। এছাড়া মাঝেমধ্যেই মসজিদ থেকে গ্যাসের গন্ধ বের হতো। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টির সুরাহা করার জন্য তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত