পাবনায় লাউয়ের বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:০৫ এএম

‘ক্ষ্যাতের থিন লাউ তুইলে বাজারে লিবের গেলে, দাগ পইরে নষ্ট হয়, দাগ পড়া লাউ কেই কিনবের চায় না। আবার বাজারে নিলিই প্রতিডা লাউয়ের জন্যি ৫ টেকা কইরে খাজনা দিয়া লাগে। তাই গিরামের কৃষকরা মিলি পাইকারগরে কয়ে ক্ষ্যাতের থিন সরাসরি ঢাকার টিরাকে মাল দিয়া শুরু করিছি। এহন হাট আলারা কয়, বাজারে না নিলি নাকি তরকারি বেচপের দিবি না।’- আক্ষেপ আর মনঃকষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের লাউ চাষি কৃষক রেজাউল করিম।

কেবল রেজাউলই নন সবজি প্রধান গ্রামটির অধিকাংশ চাষিই এখন মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে অতিষ্ঠ।

প্রায় প্রতিদিনই উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিপণনে স্থানীয় বাজার ইজারাদারেরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছেন। এতে পাইকারাও নিরুৎসাহিত হওয়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা।

কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে আগাম শীতের সবজি হিসেবে লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি ক্ষেত থেকে পাইকাররা লাউ সংগ্রহ করায় ভালো দাম পাচ্ছেন চাষিরা। অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ানোর আশাবাদও রয়েছে কৃষি বিভাগের।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাবনা সদর উপজেলার দিকশাইল, কালিকাপুর, আটমাইল, ঈশ্বরদী উপজেলার ছিলিমপুর, বক্তারপুর, মুলাডুলি, আটঘড়িয়ার খিদিরপুরসহ জেলার অধিকাংশ সবজি প্রধান গ্রামগুলোর মাঠে মাঠে ছেয়ে গেছে সবুজ কচি লাউ আর সাদা ফুল। ক্ষেত থেকে লাউ উত্তোলন আর গাছের পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় কাটছে চাষিদের।

চাষিরা জানান, করোনায় ক্রেতা, পরিবহন সংকটে ক্ষেতেই নষ্ট হয়েছে যত্নে বোনা সবজি। লোকসানের ধকল না কাটতেই অতিবৃষ্টিতে আবারও ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা। সে দুঃসময়ে লাউয়ের ভালো ফলন ও দাম পেয়ে হাসি ফুটেছে তাদের মুখে। তবে, বাজার ইজারাদের হুমকি ধামকি আর নানা প্রতিবন্ধকতায় তাদের মুখের হাসি ম্লান হতে বসেছে।

মির্জাপুর গ্রামের লাউ চাষি আনিসুর রহমান বলেন, ক্ষেত থেকে লাউ হাট কিংবা আড়তে নিতে বাড়ে পরিবহন ব্যয়, টানা হেঁচড়ায় নষ্টও হয়। তাই পাইকারদের রাজি করিয়ে ক্ষেত থেকেই সরাসরি লাউ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন চাষিরা। সতেজ ও পছন্দমতো পণ্য পেয়ে খুশি পাইকাররাও।

তিনি জানান, বাজারে লাউ নিয়ে গেলে ইজারাদাররা প্রতিটি লাউয়ের জন্য কৃষকের কাছ থেকে পাঁচ টাকা আবার পাইকারের কাছ থেকেও পাঁচ টাকা করে আদায় করে। ফাউ হিসেবে লাউ কেড়ে নেয়। আবার বাজার পর্যন্ত নিতে ভ্যান ভাড়া , সময় নষ্ট হয়। আমাদের পুরো দিনটাই নষ্ট হয়। কিন্তু ক্ষেত থেকে সবজি নেওয়ায় আমাদের বাড়তি কোন খরচ নেই, দ্রুত সবজি বিক্রি করে আবার ক্ষেতের পরিচর্যা বা অন্য কাজ করতে পারি।

গাজীপুর থেকে আসা পাইকার মাসুদ রানা জানান, কৃষকের অনুরোধে মাসখানেক ধরে তারা গ্রামের ভেতরে এসে কৃষকের কাছ থেকে সবজি নিচ্ছেন। এতে আমাদেরও সুবিধা, সতেজ সবজি কম খরচে পাই। কিন্তু বাজার ইজারাদাররা আমাদের ক্ষেত থেকে সবজি না কেনার জন্য শাসিয়ে গেছে।

image

গত সপ্তাহে ট্রাকের ড্রাইভার ও হেলপারকে মারধর করেছে। বিষয়টির সমাধান না হলে আমাদের এ এলাকা থেকে সবজি নেয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইজারাদের এমন অসাধু তৎপরতার বিষয়ে কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসনে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী চাষিরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাবনার উপপরিচালক কৃষিবিদ আজাহার আলী জানান, সরকারের কৃষি বান্ধব নীতিমালা অনুযায়ী প্রান্তিক চাষিরা যেখানে খুশি সেখানে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। তাদের বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। দাপুনিয়া ইউনিয়নসহ সকল কৃষি নির্ভর এলাকার বাজার ইজারাদারদের এ ব্যাপারে মৌখিক ভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

এরপরেও যদি কেউ কৃষিপণ্য বিক্রিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সে ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলতি মৌসুমে জেলায় ১৬১০ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত