গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) অনুসারে, ‘বাংলাদেশের ১৫ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪ কোটি ১৩ লাখ লোক কোনো না কোনোভাবে ধোঁয়াযুক্ত বা ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। এর মধ্যে চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহার করছে ১ কোটি ২৫ লাখ পুরুষ এবং ১ কোটি ৩৪ লাখ মহিলা। তারা জর্দা ও গুল খাওয়ার পর যত্রতত্র থুতু ও পানের পিক ফেলে; যা করোনাসহ নানা সংক্রমণ রোগ বৃদ্ধি করে।’
এই অবস্থায় করোনাকালে যত্রতত্র থুতু ও পানের পিক ফেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে একটি চিঠি দেন। এরপর ২৫ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে জেলা প্রশাসকদের তাদের আওতাধীন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সরকারের এ উদ্যোগ অনেকটাই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (ইউনিয়ন পরিষদ) মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে চলমান কভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকাতে যত্রতত্র পানের পিক ও তুথু ফেলা বন্ধে দেশের সব জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকগণ এ বিষয়ে তৃণমূল জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনের বিষয়ে বলা হয়েছে।’
পাবনার জেলা প্রশাসক কবির মাহমুদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। সেই চিঠি আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে পাঠিয়েছি। এছাড়া করোনাকালে আমাদের চলমান ভ্রাম্যমাণ আদালতও যেখানে সেখানে থুতু বা কফ ফেলা বন্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকা শহরে বায়ুবাহিত রোগ-জীবাণু ছড়ানোর অন্যতম কারণ যেখানে সেখানে থুতু বা কফ ফেলা। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় জনসমক্ষে থুতু ফেলাকে। কিন্তু ঢাকার যেকোনো শপিং মলের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে বোঝা যাবে কি পরিমাণ মানুষ যেখানে সেখানে এ কফ বা কাশি ফেলে। এ অভ্যাস শুধু ফুটপাথে চলাচল করা মানুষের মধ্যেই আছে এমন নয়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই এমন কাজ করতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এটি শুধু অপরিচ্ছন্নতা বা দেখতে নোংরা লাগার বিষয় নয়। যেখানে সেখানে থুতু ফেলার বিপদ হচ্ছে রোগ-বালাই সংক্রমণ। বাংলাদেশে বায়ুবাহিত রোগের একটি বড় কারণ যেখানে সেখানে থুতু এবং কফ ফেলা। যার মধ্যে যক্ষ্মা অন্যতম। যাদের কোনো রোগ নেই তারাও যখন থুতু ফেলে তখনও তাদের মুখের মধ্যে কিছু রোগ-জীবাণু থাকে। বিশেষ করে যারা ভাইরাসজনিত রোগে ভুগছে তাদের থুতুর সঙ্গে সেই ভাইরাসটি বেরিয়ে আসে। যেহেতু এটি একটি ভেজা অবস্থায় থাকে, ভাইরাসটি জীবিতও থাকে অনেক বেশি।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যত্রতত্র থুতু, কফ ও পানের পিক ফেলা আমাদের সামাজিক স্বীকৃতি মিলেছে। ফলে দেখা যায়, আমাদের বাসা-বাড়ির আশপাশে সিগারেটের শেষ অংশ, পানের পিক বা কাশি দিয়ে নোংরা পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকে। সাধারণ সময়েই এসব কিছু নানা রোগের সংক্রমণ বাড়াতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে কাশি ও পানের পিক থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই এ ধরনের অভ্যাস থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন হবে ব্যাপক প্রচারাভিযান। একদিকে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে, অন্যদিকে আইনের প্রয়োগ বাড়িয়ে বাধ্যবাধকতায় নিয়ে আসতে হবে।’
