সেলফি তুলতে চাওয়ায় ভক্তের ফোন ভাঙা ও কলকাতায় কালী পূজা উদ্বোধন বিতর্ক নিয়ে মুখ খুললেন সাকিব আল হাসান।
সোমবার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রায় ৮ মিনিটের একটি ভিডিও পোস্ট করেন সাকিব। যেখানে দুটি বিষয় নিয়েই নিজের অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার।
গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, কলকাতায় যাওয়ার সময় যশোর বেনাপোল চেকপোস্টে সেলফি তুলতে চাওয়ায় এক ভক্তের ফোন ভেঙেছেন সাকিব। বিষয়টি নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠে। এ ছাড়া তার কলকাতায় গিয়ে কালী পূজা উদ্বোধন করাকেও ভালোভাবে নেননি অনেকে।
সাকিব এদিন তার ভিডিও বার্তায় বলেন, ফোন ভাঙার ঘটনা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কালী পূজা উদ্বোধন নিয়ে বলেছেন, তিনি কখনোই কালী পূজা উদ্বোধন করেননি। সেটির উদ্বোধক ছিলেন অন্য একজন।
ফোন ভাঙার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ ও পূজা উদ্বোধন নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন সাকিব।
ভিডিওতে যা বললেন সাকিব:
‘‘আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আশা করি সবাই ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। দুটি বিষয় পরিষ্কার করার জন্য আপনাদের উদ্দেশ্যে এই ভিডিওটি করা।
প্রথমটি ফোন ভাঙা নিয়ে। আমি কখনো বুঝতে পারি না আমি অন্য একজনের ফোন ভাঙলে সেটাতে আমার আসলে কি উপকার হবে বা আমি কি বেনিফিট পাব। আপনারা হয়তো ভালো উত্তর দিতে পারবেন এটার। যার ফোন ভাঙা নিয়ে কথা হচ্ছে তার ফোন আমি কখনোই ইনটেনশনালি ভাঙিনি। যেহেতু করোনাকালিন সময়ে আমি স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার চেষ্টার করছিলাম, সব সময় কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রেখে চলাফেলা করা যায় সেটাই চেষ্টা করছিলাম।
যেহেতু অনেক মানুষ ছিল ওখানে এবং অনেক ভিড় ছিল। সবাই চেষ্টাও করছিল ছবি তুলতে। আমিও চেষ্টা করছিলাম কীভাবে তাদের কাছে না গিয়ে আমি আমার কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারি ইমিগ্রেশনের।
স্বাভাবিকভাবেই একজন উৎসুক জনতা আমার শরীরের ওপর দিয়ে এসে ছবিটি তুলতে যায় এবং আমি তাকে সরিয়ে দিতে গেলে তার হাতের সাথে আমার হাতটি লাগে এবং তার ফোনটি পড়ে যায় এবং পরে ভেঙেও গিয়েছে। তার ফোন ভাঙার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু আমার মনে হয় তারও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। বিশেষ করে করোনার সময় আমার মনে হয় সবারই সাবধানতাটা অবলম্বন করা উচিত, যত দিন করোনার এই প্রভাবটা থাকে।
দ্বিতীয় যে ঘটনাটি। অবশ্যই খুবই সেনসিটিভ। আমি প্রথমেই বলতে চাই- আমি নিজেকে একজন গর্বিত মুসলমান হিসেবে মনে করি। আমি সেটাই চেষ্টা করি পালন করার। ভুল-ত্রুটি হবেই। ভুল ত্রুটি নিয়েই আমরা জীবনে চলাচল করি। আমার কোনো ভুল হয়ে থাকলে অবশ্যই আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনাদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে সে জন্যই আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
এখন আসি পূজার বিষয়টি নিয়ে। পূজার বিষয়টি আসলে নিউজ বা মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, সব জায়গায় এসেছে আমি পূজার উদ্বোধন করতে গিয়েছি। যেটি আসলে আমি কখনো যাই-ও নি কিংবা করিওনি। এটির প্রমাণ আপনারা অবশ্যই পাবেন। যেটি হচ্ছে অনেক সাংবাদিক ভাই-বোনেরাই ওখানে ছিলেন। যাদেরকে হয়তো বা আমন্ত্রণ করা হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি আমন্ত্রণ পত্রও দেখেন, কার্ডে লেখা আছে কে আসলে ওটা উদ্বোধন করেছে। এবং সেটি উদ্বোধন হয়েছে আমি যাওয়ার আগে।
যে জায়গাতে আমাদের অনুষ্ঠানটি হয়েছে সেটা অবশ্যই পূজা মণ্ডপ ছিল না। পাশে আরেকটি স্টেজ ছিল সেখানে করা হয়েছিল। পুরো অনুষ্ঠানটি আসলে সেখানে হয়। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিটি ব্যাপী সে অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম এবং এখানে ধর্ম-বর্ণ কোনো কিছু নিয়েই আসলে কথা হয়নি।
অনুষ্ঠান শেষে যখন আমি গাড়িতে উঠতে হবে, যেহেতু ওখানে পাশেই পূজার আয়োজন ছিল এবং গাড়িতে আমাকে উঠতে হবে। অনেকগুলোই রাস্তা আসলে বন্ধ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই পূজা মণ্ডপটি ক্রস করে আমাকে যেতে হতো। সেটি আমি গিয়েছি। যাওয়ার সময় পরেশ দা, যিনি আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, আর অনুরোধে আমি প্রদীপ প্রজ্বলন করি এবং যেহেতু কলকাতায় আমি অনেক দিন খেলেছি, কলকাতার মানুষ আমাকে অনেক পছন্দ করে। ওখানকার সাংবাদিকেরা অনেক উৎসুকও ছিল। সবার অনুরোধে পরেশ দার সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তোলা হয়।
ছবি তুলে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার... যারা নিরাপত্তা কর্মী ছিল তাদের সঙ্গে আমার বাগ্বিতণ্ডা হয়, একটু হাতাহাতিও হয়। সে ঘটনার কারণে আমরা ওই দিক দিয়ে আর যেতে পারিনি। পরে ব্যাক করে অন্যদিক দিয়ে গিয়েছি। পুরো ঘটনাটা ছিল এ রকম। যার ভেতরে ৩০-৪০ মিনিট আমাদের অনুষ্ঠানের যে স্টেজ করা হয়েছিল সেখানে ছিলাম। সেখানে কোনো ধর্ম, বর্ণ নিয়ে কথা হয়নি এবং প্রোগ্রামের কোনো আয়োজনও ওরকম ছিল না।
হ্যাঁ, যেটা হয়েছে ২ মিনিটের যে সময়টায় আমি ওই পূজা মণ্ডপে ছিলাম, যেটা নিয়ে সবাই বলেছে। তারা ধারণা করছে আমি পূজার উদ্বোধন করেছি। যেটি আমি কখনোই করিনি এবং একজন সচেতন মুসলমান হিসেবে করব না। তারপরও হয়তো ওখানে যাওয়াটাই আমার ঠিক হয়নি। সেটা যদি আপনারা মনে করে থাকেন, অবশ্যই আমি এর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত, ক্ষমা প্রার্থী। মনে করি আপনারা এটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সেটিও চেষ্টা করব।
আমি তারপরও আপনাদের ইনফরমেশনটা ক্লিয়ার করার জন্য বলে দেই, কে আসলে পূজার উদ্বোধক ছিলেন...। উদ্বোধক ছিলেন- ফিরহাদ হাকিম, প্রশাসনিক প্রধান, কলকাতা পৌরসভা, মন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
আমি ওই প্রোগ্রামে যাওয়ার আগেই তিনি ওই পূজার উদ্বোধন করে গিয়েছেন। তারপর আমি গিয়েছি, আমার প্রোগ্রামে এটেন্টড করেছি। পরেশ দার অনুরোধে ওই ১ মিনিটে আমি প্রদীপটি প্রজ্বালন করেছি এবং সাংবাদিকদের অনুরোধে ওনার সাথে দাঁড়িয়ে আমি ছবিটি তুলেছি।
হ্যাঁ, অবশ্যই আপনারা ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়েই আসলে হয়তো উত্তেজনা বোধ করছেন এবং ঘটনাটি মনে করছেন আসলে ওটাই হয়েছে। আসলে একটি ছবি দেখে পুরো ঘটনাটা আপনি অনুমান করতে পারবেন না বলে আমার মনে হয়। তারপরও আমি আবারো বলছি, কখনোই আমার ইনটেনশন ছিল না যে আমার ধর্মকে ছোট করে অন্য ধর্মকে বড় করব। কিংবা অন্য কোনো ইস্যু ছিল না।
আমার মনে হয় ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। আমার যদিও জ্ঞান খুবই কম। আমি চেষ্টা করছি এবং ভবিষ্যতেও আরো চেষ্টা করব যত ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান নেওয়া যায় এবং ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী চলতে পারি। সেটি আমি চেষ্টাও করি। হ্যাঁ সব সময় হয়তো আমি করতে পারিনি বা করা হয়ও না...।
আমি শুধু একটি কথাই বলব যে এমন কিছু যেন আমরা না করি, যেটাতে মানুষ আমাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ফেলে দেয় যে আমরা আসলে এক নাকি আলাদা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এক থাকব ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা শক্তিশালী।
বিভিন্ন উদাহরণ আমি চাইলেই দিতে পারি। কিন্তু আমি ওগুলো দিতে চাই না। আমি মনে করি আমরা মুসলমান যারা আছি, অবশ্যই তারা এক থাকব সব সময়। কারণ আমাদের এক থাকা জরুরি। আমাদের একতা থাকাটা খুবই জরুরি। যখনই আমরা আলাদা আলাদা হয়ে যাব, তখনই আমরা দুর্বল। যখন আমরা এক থাকব তখন আমরা স্ট্রং।
এমনি আপনারা অনেকেই অনেক বেশি জানেন। অনেক জ্ঞানী, এই সম্পর্কে অনেক ধারণা আছেন। তাদের পরামর্শগুলো আমি অবশ্যই শোনার চেষ্টা করব, তারা যদি কেউ বলেন। এটি আমি খুব সাদরে আমন্ত্রণই জানাব, যদি কেউ আমাকে ভালো কিছু জানাতে চান কিংবা জানাতে পারেন।
একটা জিনিসই শুধু আমি বলতে চাই... আমি হয়তো দেখছি না। আমি আসলে খুব বেশি একটা এগুলোতে ফোকাস করি না। তারপরও... এখন সোশ্যাল মিডিয়াটা এমন একপর্যায়ে চলে গেছে যে, আপনি চাইলেও অনেক কিছু ইগনোর করতে পারবে না। আমার নামের সামনে যেহেতু অনেকে শ্রী শ্রী, কিংবা সিঁদুর, প্রদীপ, মন্দির, অনেক কিছু দিয়ে দিয়ে অনেক কিছু বলছেন। আসলে এটা দিয়ে আমরা ইসলামের কিংবা আমাদের ধর্মের কতটা ওপরে নিচ্ছি না নিচে আনছি এটা আমার বোধগম্য নয়।
আশা করি আমরা সবাই আমাদের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করব। আমি তারপরও আবারো ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনাদের সকলের কাছ থেকে। এবং আমি চেষ্টা করব নিজের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার, একজন গর্বিত মুসলমান হিসেবে।’’
