সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরের নাসিরের বাড়িতে যেতে গিয়ে নৌকা ডুবে যায় এমন ঢেউ চারদিকে। দেখলে এককথায় সাগর। কিন্তু তা নয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল নাসিরের বাড়ির এলাকাটি পূর্ণ লোকালয়। কিন্তু তার টিকে থাকা বাড়ির চারধারে এখন ঢেউ আর ঢেউ।
কপোতাক্ষের উপকূলীয় বাঁধভাঙা ঢেউ। সেখানে মানুষের সঙ্গে টিকে ছিল দুইটা কুকুর। একটা কুকুর খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার পর অনেক তরতাজা কুকুর কালুও এখন নিঃসঙ্গ।
এ বছর ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানে খুলনা সাতক্ষীরার উপকূলীয় নদী বেড়িবাঁধের তেতাল্লিশটি বড় পয়েন্ট ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। যার মধ্যে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার অবস্থা ছিল বেশ খারাপ।
তবে প্রতাপনগরের অবস্থা ছিল সব থেকে ভয়াবহ। যে ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফসলি জমি, মাছের খামার, প্রাণী সম্পদ সবকিছু নষ্ট হয়ে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও নিঃস্বপ্রায়।
দিনমজুর রজব আলী জানান, কোনো কাজ নেই এলাকায় বহু মানুষ কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। প্রতাপনগর থেকে জেলা ও উপজেলা সদরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা জোয়ারের তোড়ে ভেসে গেছে।
এরপর ২০ আগস্ট ফের কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের পানি প্রবলবেগে লোকালয়ে ঢুকে প্রতাপনগর থেকে জেলা উপজেলায় যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা জোয়ারের তোড়ে ভেসে যায়। মানুষ অসুস্থ হলেও হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারার অবস্থাও ধ্বংসপ্রাপ্ত। আজও এ চিত্র থেকে একটুও বদলায়নি সামগ্রিক পরিস্থিতি।

উপকূলীয় জনপদ প্রতাপনগর ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহতা। শিশু-কিশোর নারীদের কষ্টের চরম আকুতি। আট বছরের শিশু নাসির, সিয়াম, আবু রায়হান প্রত্যেকে সমবয়সী।
নাসির জানায়, তার বাড়ির চারধারেই অনেক পানি। সে ঘর থেকে নিচে নামতে খুব ভয় পায়। জোয়ারের সময় ঘরে জোয়ারের পানির সাথে নানা প্রজাতির সাপ ঢোকে। তখন তার খুব ভয় লাগে।
সিয়াম জানায়, তার বাড়ির সামনে ছিল তরকারি ও ফুলের বাগান। সেখানে সে খেলা করতো। সেসব এখন লোনা পানির সাগর।
শীতের মধ্যে চারপাশের পানির উপরে থাকা মানুষ এখন হতাশাগ্রস্ত। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছে টিকে থাকা দৃষ্টিনন্দনের ছোট্ট বেড়িবাঁধের উপর গাদাগাদি করে। কেউ আবার ভেঙে যাওয়া বাড়ির জায়গাটির দিকে তাকিয়ে থাকছে নিষ্পলক। অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে চলেও গিয়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ছয় মাস ধরে প্রতাপনগরের মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। বলতে সমাধানের মতো কোনো উদ্যোগ তিনি এখনো দেখতে পাননি।
কুড়িকাহনিয়া গ্রামের কাছাকাছিতে একটি উচু জায়গায় এক যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে কোনোরকমে নৌকা ভিড়িয়ে পরিচয় পাওয়া গেল ওই ব্যক্তির নাম ওহিদুজ্জামান তিনিও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় ওয়ার্ড শাখার।
তিনি দেখাচ্ছিলেন যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে তার ধানের ক্ষেত ছিল। টাইলসে বাঁধানো বাড়ি ছিল। কথাগুলো নিয়ে সন্দেহ হচ্ছিল।
ওহিদুজ্জামান সংবাদকর্মীদের তখন ভাটির সময় এসব কথা বলে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঘণ্টাখানেক আটকে রাখলেন। তার কথা মিলে গেলো ভাটি নামার পর টাইলসে বাঁধানো ভেতর বারান্দা দেখা গেল। সেটা দেখাতে গিয়ে তার চোখ টলটল করতে থাকলো।
ওহিদের গলা ভার হয়ে গেল, মুহূর্তেই কান্না ছেড়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি একটু প্রতাপনগরবাসীকে দেখতে আসতেন তাদের আর কোনো দুঃখ থাকতো না।
আরেকটু দূরে নৌকা নিয়ে সরাসরি ঘরের মধ্যে গিয়ে রেহেনা বেগমের সাথে দেখা তিনি জানালেন, তাদের বাথরুমের জায়গা নেই, থালা বাসন পরিষ্কারের জায়গা নেই। বাথরুম সারতে রাতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেই পানিতেই ওযু করা সেই দুর্বিসহ জীবনের চিত্র তুলে ধরতে পারলেন কেঁদে দিলেন। বললেন, মানুষ মারা গেলে কবর দেয়ার মাটিও নেই।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বললেন, মানবিক কাজকর্মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে আকাশছোঁয়া সাফল্য। তিনি চাইলে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ টেকসই নির্মাণ বাস্তবায়ন অসম্ভব কিছু নয়।
সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করা হচ্ছে না। তিনি অবগত হলে অবশ্যই মানুষের মানবেতর এ অবস্থা ছয় মাস থাকতো না।
