২০ কোটি টাকা মূল্যের জমির দখল

ডিসি-ইউএনও-এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতার মামলা

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০৯:০৫ পিএম

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৮৬ শতাংশ জমির ভোগ-দখল নিয়ে বিএনপি নেতার দায়ের করা মামলায় আসামি হলেন টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি, মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির নেতা ও জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে হাইকোর্টে তাদের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেন।  

জানা গেছে, মির্জাপুর গোড়াই শিল্পাঞ্চলের নাজিরপাড়া এলাকায় সিএস খতিয়ান ৩০৯, এসএ খতিয়ান ইজা-১ ও ২৮৬১ নম্বর দাগে ৮৪ শতাংশ সরকারি পুকুর রয়েছে। এছাড়া ২ নম্বর খতিয়ানে ৩৩০০ নম্বর দাগে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৬ শতাংশ জমি রয়েছে। এই জমি করটিয়া জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর কাছ থেকে ১৯৪১ ও ১৯৪২ সালে গোড়াই এলাকার আব্দুল মান্নান জমিদারি পত্তন নেন। পরবর্তীতে বিএনপি নেতা ফিরোজ হায়দার খান ২০০৭ সালে ১৯ জুলাই মির্জাপুর রেজিস্ট্রি অফিসে আব্দুল মান্নানের স্ত্রী জেবুননেছার কাছ থেকে ২৪১১ ও ২৪১২ নম্বর দলিল মূলে ক্রয় করেন। পরে অ্যালার্ট নোটিশের (ল্যান্ড ট্রান্সফার) মাধ্যমে মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে ৭৩/২০০৭/০৮ ও ৭৪/২০০৭/০৮ নম্বরে নিজ নামে দুটি নামজারি করেন। নিজ নামে নামজারি করাতে পারলেও খাজনা প্রদানের জন্য হোল্ডিং চালু করতে পারেননি ফিরোজ হায়দার খান।

চলমান জরিপে ফিরোজ হায়দার খানের নামে জমিটি মাঠ জরিপে রেকর্ড হয়। পরবর্তীতে উক্ত রেকর্ডের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ টাঙ্গাইল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি (১১৮০৪/০৯) দাখিল করেন। আপত্তির প্রেক্ষিতে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস ফিরোজ হায়দারের নামে রেকর্ড বাতিল পূর্ব ১৪/০৬/২০১০/৮৩৮(৪) নম্বর স্মারকে পুনরায় শুনানির আদেশ দেন।

ফিরোজ হায়দার খান শুনানিতে উপস্থিত না হয়ে টাঙ্গাইলের জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মাহবুবা হাসনাতের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পুনরায় শুনানির কার্যক্রম স্থগিত করেন। সেই সাথে উক্ত পুকুর ফিরোজ হায়দার খানকে ভোগ করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

সারা দেশে করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করলে মির্জাপুর উপজেলা প্রশাসনের বেশির ভাগ কার্যক্রম করোনা কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এ সুযোগে ফিরোজ হায়দার খান রাতের আঁধারে পুকুরে মাটি ভরাট করে শ্রেণি পরিবর্তনের কাজ শুরু করেন। এছাড়া পুকুরের চারপাশে প্রাচীর নির্মাণ করেন। বিষয়টি জানতে পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে তার অবৈধ কাজ বন্ধ করেন এবং সরকারি মালিকানার পুকুর লিখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে ফিরোজ হায়দার খান রাতের আঁধারে পুকুরটি ভরাট করেন।

পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন পুকুরের চারপাশের প্রাচীর ভেঙে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি সরিয়ে পুনরায় তো পুকুরে পরিণত করেন। উক্ত পুকুরটি সায়রাত রেজিস্টার (জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত) ভুক্ত। 

এই ঘটনার পর ফিরোজ হায়দার খান টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি, মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেনকে গত ৩০ মে ও ৩১ আগস্ট দুটি উকিল নোটিশ পাঠান।

পরে ফিরোজ হায়দার খান জেলা প্রশাসক, মির্জাপুরের ইউএনও ও এসিল্যান্ডের নামে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে গত ১৬ সেপ্টেম্বর মামলা করেন।

বিএনপি নেতা ফিরোজ হায়দার খানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেন জানান, ২০১৩ সালে হাইকোর্টের একটি আদেশ আছে তাতে বলা আছে কোন জলাধার ভরাট করা যাবে না। ফিরোজ হায়দার খান সেই আইন অমান্য করেছেন। আমরা তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক বলেন, ফিরোজ হায়দার খান রাতের আঁধারে পুকুর ভরাট জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনির সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রশাসন জনস্বার্থে রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করছে। ফিরোজ হায়দার খান উচ্চ আদালতকে ভুল বুঝিয়ে অন্যায়ভাবে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছেন।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত