সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের কাটাগাড়ি আদর্শগ্রামের মৃত নুর হোসেন ও মোছা. বাঁচা খাতুনের মেয়ে বৃষ্টি খাতুন (১৪) বাল্যবিবাহের অভিশাপে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে এখন দুঃসহ জীবন যাপন করছে।
কিশোরী বৃষ্টি খাতুন জানায়, উপজেলার বলদিপাড়া দাখিল মাদ্রাসায় ৭ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে পার্শ্ববর্তী দেশিগ্রামের আবদুল মতিনের ছেলে আব্দুল মমিন (১৬) এর সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো ভাবেই সে স্বামী, সংসার ও পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারছিল না। স্বামীকে দেখলেই তার খুব ভয় লাগত। এ বিষয়টা কেউই বুঝতে চাইত না। আবার কেউ মেনেও নিত না। এত ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়ে সে মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ভাবা অনুযায়ী কাজ। কীটনাশক পানে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অনেক চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে গেলেও তার দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে যায়। সে এখন পায়ে ভর দিয়ে হাটতে পারে না। ফলে সে লাঠিতে ভর দিয়ে কোন রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে।
এ বিষয়ে বৃষ্টির মা বাঁচা খাতুন বলেন, দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছি যে, মেয়েকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া আমার মোটেও ঠিক হয়নি। তাই মেয়েকে আরও কিছুদিন নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখতে চেয়েছিলাম। জামাই আবদুল মোমিন ও বেয়াই আবদুল মতিনকে অনুরোধও করেছিলাম। আরও কিছুদিন আমার বাড়িতে রেখে দিতে। তারপর ঠিক হলে পাঠাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা তাতে রাজি হয়নি। সপ্তাহ পার না হতেই জামাই চলে আসতো আমার বাড়িতে। এতে মেয়ে আরও ভয়ে পেয়ে যেতো। ফলে সে সবার অজান্তে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
তিনি আরও বলেন, ফলে তার মেয়ের জীবনটা দুঃসহ হয়ে উঠেছে। মমিন আবারও বিয়ে করেছে। তাকে নিয়ে সংসার করছে। আমার মেয়েটা আমার বাড়িতে এ ভাবে পড়ে আছে। তার কোনো খোঁজ-খবরও নেয় না। ফলে মেয়েটি এখন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণারও ভুগছে।
তিনি বলেন, দুজনেরই বয়স না হওয়ায় বিয়ের নিবন্ধনও করা সম্ভব হয়নি। ফলে আমরা কোথাও কোন আইনি সহায়তা পাচ্ছি না।
এ বিষয়ে বৃষ্টির স্বামী আব্দুল মমিন জানায়, বৃষ্টিকে এক লাখ টাকা দিতে চেয়েছি। কিন্তু তার অভিভাবকেরা তা নেয়নি।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে বৃষ্টির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সে নিজ বাড়ির উঠানে লাঠিতে ভর দিয়ে বসে আছে।
তাড়াশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে জানা যায়, তাড়াশে কন্যা সন্তানের অভিভাবকেরা মেয়ে একটু বড় হলেই বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার বৃষ্টি।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেজবাউল করিম বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বাল্যবিবাহ সাময়িক বন্ধ করা গেলেও তা শেষ পর্যন্ত আটকে থাকছে না। পরে অতি গোপনে বিয়ে দিয়ে দেয়। মাঝে মধ্যেই এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দোষীদের জেল-জরিমানা করা হয়। অভিভাবকেরা সচেতন না হওয়ায় তারপরেও গোপনে এ কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে অচিরেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
