তারপর কী হলো, সেই প্রশ্ন আছে: মাটির ময়নার ‘আনুকে’ নিয়ে মৌসুমী ভৌমিক

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:১১ পিএম

তারেক মাসুদ পরিচালিত মাটির ময়না সিনেমায় ‘আনু’ চরিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া নুরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলছে। গণমাধ্যমে তার সাম্প্রতিক অবস্থা ও চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরই মূলত এই আলোচনার সূত্রপাত।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সালে ‘মাটির ময়না’ ছবির আনু চরিত্রে অভিনয় করা শিশু শিল্পী নুরুল ইসলামকে ১৮ বছর পর খূঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি এখন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে একটি ছোট দোকান চালান। সিনেমায় অভিনয় ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট থাকার চেষ্টা করে বেশ বৈরী অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন নুরুল ইসলাম। এমনকি সম্মানি থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তারেক মাসুদের বাসার কাজেও তাকে নিয়োজিত করা হয়েছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় বিখ্যাত ভারতীয় সংগীত শিল্পী ও লোকগানের গবেষক, তারেক মাসুদের ঘনিষ্ট মৌসুমী ভৌমিক বিষয়টি নিয়ে নিজের ফেইসবুক প্রোফাইলে একটি লেখা পোস্ট করেছেন। তিনি মাটির ময়নায় ‘রোকন’ চরিত্রের অভিনেতা রাসেল ফারাজির প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। রাসেল আরেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন দিল রিয়াজের “শিল্প শহর স্বপ্নলোক” সিনেমাতেও কাজ করেছেন। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তার লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-

গতকাল থেকে দু'টি রিপোর্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে সোশাল মিডিয়াতে। 'মাটির ময়নার আনু এখন কামরাঙ্গীর চরে চা পান বিক্রি করেন' (প্রথম আলো) এবং 'চলচ্চিত্রে কাজ করা জীবনের সবচে [sic] বড় ভুল ছিলো: নুরুল ইসলাম' (বিডিটুডে) । আমার সব চেনা মানুষের কথা, তাই আমায়ও কেউ কেউ পাঠিয়েছেন।

এরকম একটা জটিল ঘটনার অতি সরলীকৃত বয়ান আসলে একটু দুর্ভাগ্যজনক। তারেক নেই, আজ আবার ১৬ই ডিসেম্বর, মনটা তাই একটু খচখচ করছে।

আনুকে আমি মাটির ময়নার সময় এবং পরে বাবলুকে অনেক বছর তারেক-ক্যাথরিনের বাড়িতে দেখেছি। ও ওঁদের ফিল্ম ইউনিটে নানান কাজ করতো। ওর লেখাপড়ার দায়িত্ব তারেকরা নিয়েছিল কি না, এই প্রশ্ন উঠছে দেখে আমি বলতে চাই যে, আনু যে কাজ করতো , সেটা একধরনের ইস্কুলই ছিল। বয়াতিভাই ছিলেন--শাহ আলম বয়াতি, নাহিদ, মানে তারেকের ছোট ভাই ছিল—মাটির ময়নার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই থেকে গেছিলেন, ওদের কোম্পানির নাম সম্ভবত অডিওভিশন ছিল। অনেকে ছিটকেও গেছিলেন। আমি নিজেই তারেকের সঙ্গে যুগ্মভাবে মাটির ময়নার পর আর কোনো কাজ করিনি, তার কারণ জীবন আমাদের যার যার মতন বয়ে যায়, এক জায়গায় শুরু হলে সেখানেই শেষ হবে তেমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই তো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা বন্ধু, নিকটজন থাকতে পারলে ভাল, না পারলেও সেটাকে মেনে নিতে হয়। তারেক আর আমি ওর মৃত্যুর মাস তিনেক আগে দেশ টিভির স্টুডিওতে অনেক অনেক গল্প করেছিলাম, আপনজন যেমন গল্প করে। সেখানে টিভি'র ক্যামেরা গৌণ হয়ে গেছিল। সেটা যে শেষ দিন পর্যন্ত হতে পেরেছিল, সে আমাদের সৌভাগ্য।

কিন্তু অনেক সময় সম্পর্কের তার ছিঁড়ে যায়। দল বেঁধে কোনো কাজ হলে দল ভাঙা কোনো নতুন ঘটনা নয়, মান অভিমান নানা তরফে জমা হয়, হয়েই থাকে। আরো একটা বড় কথা হলো, একটা ফিল্ম শেষ পর্যন্ত যেভাবে একজন ডিরেক্টরের, সেভাবে আর কারোই না, যদিও এই একটা কাজ যৌথভাবে না করলে করা খুবই কঠিন। তবু একজন মূল মানুষ থাকেন, আর তাঁর নামই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পন্ন কাজটির গায়ে জ্বলজ্বল করে, তাতে অনেকের অনেক সময় রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, অভিমান, অভিযোগ তৈরি হয়—এর প্রতিকার যে ঠিক কীভাবে হতে পারে, আমি ভেবে পাই না। কর্মপদ্ধতিতে বাধ্যতামূলক যৌথতা আর সত্যিকারের ভিতর থেকে আসা রাজনৈতিক যৌথতা যা একটা inner discipline-এর ব্যাপার—এ এক যাত্রাপথ। আমরা সেই পথে চলার চেষ্টা করতে পারি শুধু, পারা খুবই কঠিন।

তুলনায়, অপরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অনেক সহজ।

আমি ২০০১ থেকে ১১—বাবলুকে নানা সময় দেখেছি তারেকদের বাড়িতে। দেখেছি ব্যস্ত হয়ে জিনিসপত্র গাড়িতে তুলছে--লাইট, ক্যামেরা, মাইক, বুম রড--সবাই শুটিং-এ বেরিয়ে যাচ্ছে, বাবলু, এইটা নাও, বাবলু ওইটা করো, বাবলু কই গেলা? এরকম হাঁক আমার কানে লেগে আছে। তারেক স্বভাবসিদ্ধ ব্যস্ততায় সকলকে বকাবকি করছে, ক্যাথরিনও ব্যস্ত। এই হাঁকপাক কারো ভাল না লাগতে পারে, কারো গা সওয়া হয়ে যায়, কেউ হয়ত এমন না হলেই অবাক হয়। মানুষগুলোকে চিনে গেলে তাদের ভাল-মন্দ চেনা হয়ে যায়। দশ বারো বছরে বাবলুরও নিশ্চয় খানিক চেনা হয়ে গেছিল ওদেরকে। বাবলু ঠিক ঘরের কাজ করতো, শিশু শ্রমিক ছিল--একথা বললে আসলে অন্যায় করা হয়। শিক্ষানবিশি বলে একটা শব্দ আছে, apprenticeship, এটা খানিকটা সেইরকম ছিল। সেখানে বিনিময়ে কে কত অর্থমূল্য পেতেন তা আমি জানি না, জানা আমার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়েও না। যিনি লিখেছেন, তিনিও বোধ করি জানেন না।

বাবলু তারপর ছিটকে যায়, আর ঐ বৃত্তের ভিতরে থাকতে পারেনি। তার কারণ খুঁজতে হলে নানা দিকে যেতে হবে, তারপরেও সব প্রশ্নের উত্তর হয়ত পাবো না আমরা। কেন একজন ছিটকে যায়, এগোতে পারে না, কেন এক রকমের সমাজ তাকে আর প্রয়োজনীয় মনে করে না, কেন সে ভিন্ন পথের দিকে ধাবিত হয়, স্বেচ্ছায় বা পরিস্থিতির কারণে—এসব কথা কি একটা রিপোর্টের ভিতরে বলা সম্ভব, বিশেষ করে যেখানে গল্প লেখার মূল উদ্দেশ্যই একজনকে খারাপ আর একজনকে ভাল প্রমাণ করা? বাবলু যে সামাজিক অবস্থান থেকে আসেন, সেখানে ছিটকে যাওয়া সহজতর, কিন্তু অনেক আর্ট কলেজে, ফিল্মস্কুলে, ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছেলেমেয়েও ছিটকে যায়, একটা বই লেখার পর, একটা অ্যালবাম বেরোনোর পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না কত কত শিল্পীকে।

আমি আর সুধীর পালসানে (মাটির ময়নার ডিরেক্টর অফ ফোটোগ্রাফি) আজ কথা বলছিলাম। আনু? সুধীর আমায় জিজ্ঞেস করছিল। আমি বললাম, হ্যাঁ। কুড়ি বছর তো কম সময় না! কুড়ি কুড়ি বছরের পর, কোন জায়গা, কোন মানুষ আগের মতন থাকে? আনু আর বাবলু আর এই নুরুল ইসলাম কতটা এক মানুষ আর কতটা অন্য? এই রিপোর্টেও আনু কখনো আনু, কখনো বাবলু আর কখনো নুরুল ইসলাম। সেও ভাগ হয়ে আছে। তার ভিতরে নানান দ্বন্দ্ব, একই ইন্টারভিউ-এর পরিসরে সে ব্যথিত, ক্ষুব্ধ, আবার পুরনো স্বপ্নের ঘোর তার চোখে। সে বলে, এসব কথা আর বলবেন না। বলে, কোথায় প্রাইজ রাখা আছে জানি না। ‘আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না’ গোছের কথা বলে, আবার বলে, প্রাইজ পাবার ছবিটা যদি পান, আমাকে এনে দিয়েন। আবার দেখি বিডিটুডেতে লেখা, আমি এখন দাড়ি রাখি। তা সে না বললেও, আমরা তো দেখতে পাই। মাটির ময়নার ধর্ম ভাবনা থেকে তার জীবন যাপনে ধর্মের স্থান হয়তো কিছুটা ভিন্ন। কুড়ি কুড়ি বছর পার হয়ে গেছে, after all.

রাসেল, বা রোকন, আলাদা ছিল। সে অন্য এক দুনিয়া থেকে এসেছিল, সে এই সিনেমাতেও তেমনই একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিল, ফলে সে হয়ত ততখানি স্থানচ্যুত হয়নি। শাহীন দিল-রিয়াজের 'শিল্প শহর স্বপ্নলোক' যাঁরা দেখেছেন, মাটির ময়না-উত্তর রাসেল ফারাজিকে চেনেন, তার ঠোঁটে লেগে থাকা একটুখানি হাসি, চোখে চিকচিক করা কৌতুক, আর সে যখন প্রাজ্ঞের মতন বলে, আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না, তখন আমার মতন আপনারও হয়ত অস্বস্তি হয়েছে—কাকে বলছে ঐটুকু ছেলেটা অমন কথা? ২০০৫-এর ছবি, জার্মানিতে থাকা শাহীনের, The Happiest People in the World. আজ আর একবার দেখে নিলাম। শাহীন আমার বন্ধু, তাই আমার বিচার হয়ত পক্ষপাত-দোষে দুষ্ট, তবু কিছু ছবি যে আমার ফিরে দেখতে ভাল লাগে, এটি তার মধ্যে পরে। এতেও রোকনের তারপর কী হলো, সেই প্রশ্ন আছে। আর, শাহীনের ছবির পরেও বা রাসেলের কী হলো গত ১৫ বছরে? এই সবই valid প্রশ্ন। কথা হচ্ছে, প্রশ্নটা করছি কোন উদ্দেশ্যে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত