তারেক মাসুদকে অপবাদ দেয়া ঘোরতর অন্যায় হবে: শাহীন দিল রিয়াজ

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৩৭ পিএম

তারেক মাসুদ পরিচালিত মাটির ময়না সিনেমায় ‘আনু’ চরিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া নুরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলছে। গণমাধ্যমে তার সাম্প্রতিক অবস্থা ও চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরই মূলত এই আলোচনার সূত্রপাত।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সালে ‘মাটির ময়না’ ছবির আনু চরিত্রে অভিনয় করা শিশু শিল্পী নুরুল ইসলামকে ১৮ বছর পর খূঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি এখন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে একটি ছোট দোকান চালান। সিনেমায় অভিনয় ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট থাকার চেষ্টা করে বেশ বৈরী অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন নুরুল ইসলাম। এমনকি সম্মানি থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তারেক মাসুদের বাসার কাজেও তাকে নিয়োজিত করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: তারপর কী হলো, সেই প্রশ্ন আছে: মাটির ময়নার ‘আনুকে’ নিয়ে মৌসুমী ভৌমিক

এরই ধারাবাহিকতায় বিখ্যাত ভারতীয় সংগীত শিল্পী ও লোকগানের গবেষক, তারেক মাসুদের ঘনিষ্ট মৌসুমী ভৌমিক বিষয়টি নিয়ে নিজের ফেইসবুক প্রোফাইলে একটি লেখা পোস্ট করেছেন। তিনি মাটির ময়নায় ‘রোকন’ চরিত্রের অভিনেতা রাসেল ফারাজির প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। রাসেল আরেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন দিল রিয়াজের “শিল্প শহর স্বপ্নলোক” সিনেমাতেও কাজ করেছেন। সেই সূত্রে মৌসূমী ভৌমিকের পোস্টটি শেয়ার দিয়ে শাহীন নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন আলাদাভাবে।

দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য শাহীন দিল রিয়াজের লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-

মৌশুমি'দিকে তার পোস্টের কথাগুলো লিখার জন্য অনেক ধন্যবাদ। তারেক ভাইকে যারা বাক্তিগত ভাবে জানতেন, চিনতেন না তাদের কাছে 'প্রথম আলো'তে আনুর ওপর লেখাটা পড়ে খটকা লাগতে পারে, মনে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমি তারেকভাইকে চিনতাম আজ থেকে ৩২বছর আগে, ৮৮ সাল থেকে। মাঝে বিদেশে আশার কারণে যোগাযোগ কমে যায়। ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় ('মাটির ময়না' হবার অনেক আগের কথা) তার সাথে একটা ছোট্ট কাজ করতে গিয়ে প্রথম দেখি তার বাড়িতে অনেক ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে। তাদেরকে নিয়েই তিনি UNESCO-র জন্য একটা কাজ করবেন। লাকি আকন্দ মিউজিক করছেন আর আমাকে ক্যামেরার দায়িত্ব নিতে হবে। আমি ভেবেছিলাম বাচ্চাগুলো শুটিঙের জন্যে জোগাড় করা হয়েছে। কিন্তু শুটিঙের পর বুঝলাম এদের আসলে অন্য কোথাও যাবার জায়গা নেই বললেই চলে। তাদের বেশীর ভাগই রাস্তায়, বস্তিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত। তারা তারেক ভাই, ক্যাথরিনএর  তখনকার উত্তরার বাসা ছেড়ে যেতে চাইত না। এদের নিয়েই তিনি থাকতেন এবং  মাঝে মধ্যে আরও দু'একটা কাজও এই বাচ্চাদের নিয়ে করতে চেষ্টা করেছেন। তারা অনেকেই দিনের পর দিন তার বাড়িতে থাকতো, খেত এবং পড়াশুনা করতো। তারেক’ভাই, ক্যাথরিন দু’জনই বলতেন “এরা আমাদের বাচ্চা-কাচ্চা”। কিন্তু এদের কেউ বেশিদিন তার কাছে থাকেনি। রাস্তার টান, তাদের নিজেদের পরিবারের জটিল বাস্তবতা তাদের ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। 'মাটির ময়না'র জন্য আনু'র চরিত্রে বাবলু (নুরুল ইসলাম) আর রোকন'এর চরিত্রে রাসেল ফারাজি-কে খুঁজে নেয়া হয়। বাবলু তখন কাজ করতো তারেকভাইর এক আত্তিয়ের বাসায় আর রাসেলকে পাওয়া যায় এন.জি.ও ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের’ স্কুল থকে।শুটিঙের পর এদের দু’জনেরই পড়াশুনার দায়িত্ব তারেক ভাই নিয়েছিলেন। পাশাপাশি ফিল্ম ইউনিটের বেস্ট-বয়ের কাজ করতো দু’জন। কিন্তু অভিনয়ের পথে এগিয়ে যাবার জন্যে যে সুযোগ ইন্ডাস্ট্রি থেকে তারা আশা করছিলো সে সুযোগ আসেনি। এটা অনেক পেশাদারি অভিনেতাদেরও অনেক সময় আসেনা, তারা যত ভালো অভিনেতাই হন না কেন। ফলে দু’জন’ই হয়তো হতাশ হয়েছেন। হয়তো প্রত্যাশাও ছিল অনেক, যেটা পূরণ করার সামর্থ্য তারেকভাইএর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। ‘রোকন’ চরিত্রের অভিনেতা রাসেল ফারাজি আমার ছবি “শিল্প শহর স্বপ্নলোক” (The Happiest People in the World)-এর একজন প্রোটাগনিস্ট ছিল। তার দুরন্তপনা কাছথেকে দেখার অভিজ্ঞতা আছে আমার।যে শিশুরা জন্ম থেকে রাস্তার হিংস্র পরিবেশের ভেতর বড় হয়েছে তাদের ঘরমুখো করা, আমাদের মধ্যবিত্তের রঙ্গিন স্বপ্নে স্বপ্নিল করে তোলা সব সময় সম্ভব হয় না। রাসেলের বাবারও অনেক প্রত্যাশা ছিল ছবিপরবর্তীতে আরও আর্থিক সহায়তা পাবার যেটা পূরণ হয়নি। কিন্তু আমাদের ভেবে দেখা দরকার আদৌ একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার পক্ষে এসব আশা পূরণ করা সম্ভব কিনা। আমি বেক্তিগতভাবে বলতে পারিঃ  তারেকভাই এই শিশুগুলোকে ভালবাসতেন, তাদের সাথে জীবন যাপন করতেন, তাদের নিয়ে কাজ করতেন। আর কাজ করতে গিয়ে অনেক রকম ব্যাবহার হয়তো করেছেন। উনি কোন সহজ মানুষ ছিলেন না।এটা আমরা যারা তার সাথে কাজ করতাম, তারা জানি।কিন্তু উনি সজ্ঞানে এই শিশুদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন, কিম্বা তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেননি এই অপবাদ দেয়া ঘোরতর অন্যায় হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত