করোনার বছরে সাহসী উইন্ডিজ ও পাকিস্তান

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:০৩ এএম

বিদায়ী বছরটিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বছর বলা যেত। চার বছর পর এবার চার-ছক্কার বিশ্ব আসর বসার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়ায়। উইন্ডিজের হাত থেকে টি-টোয়েন্টির শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কারা নেয় তা দেখার অপেক্ষায় ছিল বিশ্ব। কিন্তু করোনা সব গুলিয়ে দিল। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের আর সব আসরের মতো এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বাধা পড়ে। অবশ্য ইউরো, অলিম্পিকের মতো ক্রিকেটের এই আসরে করোনা শুরু হওয়ার মুহূর্তেই অনিশ্চয়তা জেঁকে ধরেনি। বছরে বড় আসরগুলোর মধ্যে সবার শেষে টুর্নামেন্টটি পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা আসে। এই আসর হবে ২০২২ সালে। এছাড়া করোনাকে ছাপিয়ে উইন্ডিজ ও পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফর বেশ প্রশংসা পায়। সফল আইপিএল আয়োজনও ক্রিকেটের সাফল্য। আর বছর শেষে নিউজিল্যান্ড-উইন্ডিজ, ভারত-অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড-পাকিস্তান সিরিজগুলো ক্রিকেটের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার ছাপ রাখে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ক্রিকেটের করোনাকে হারিয়ে দেওয়ার সাফল্যগুলো।

শুরুটা স্বাভাবিক ছিল

উহান থেকে তখন করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বে। তবুও বছরের শুরুতে ক্রিকেট চলছিল স্বাভাবিক নিয়মে। জানুয়ারিতে একই সঙ্গে মাঠে চলে ক্রিকেটের কুলীন চার দল অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। ৩-৭ জানুয়ারি চার দলেরই টেস্ট শুরু হয়েছিল। সিডনিতে অজিরা ২৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে জিতে তিন টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে কিউইদের। ওদিকে ইংল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ১৮৯ রানে জিতে সমতা আনে। এরপর ১৬-২০ জানুয়ারি ও ২৪-২৮ জানুয়ারি টানা দুই টেস্ট জিতে ৪ ম্যাচের সিরিজ জেতে ৩-১ এ। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ১-১ ড্র হয় এবং সমান ম্যাচের টি-টোয়েন্টিতে ইংল্যান্ড ২-১ এ জেতে। জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফর করে ভারতও। ৫ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৫-০ তেই জেতে সফরকারীরা। দুটি ম্যাচে সুপার ওভারের রোমাঞ্চ ছড়ায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ৩ ওয়ানডে ও ২ টেস্টের দুটো সিরিজেই ভারতকে হোয়াইটওয়াশ করে কিউইরা। 

জানুয়ারিতে পাকিস্তান সফর করে বাংলাদেশ। ওই সফরে করোনার চেয়ে নিরাপত্তাই বেশি আলোচিত ছিল। ২৪, ২৫ ও ২৭ জানুয়ারি তিন টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২-০ তে জিতে যায় পাকিস্তান। এক ম্যাচ পরিত্যক্ত হয় বৃষ্টিতে। প্রায় ১০ দিনের বিরতির পর টেস্ট সিরিজের এক ম্যাচ খেলতে আবার পাকিস্তান যায় বাংলাদেশ। ম্যাচে ইনিংস ও ৪৪ রানের ব্যবধানে জেতে স্বাগতিকরা।

করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে মার্চে। তখন দুটি ওয়ানডে সিরিজ চলছিল। অস্ট্রেলিয়ায় স্বাগতিকদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের। আর ভারতে খেলতে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। দুটি সিরিজই স্থগিত করে দেশে ফিরে যায় নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। করোনার আগে ১৩ মার্চ সবশেষ ম্যাচ হয় অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের প্রথম ওয়ানডে।

উইন্ডিজ-পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফর

করোনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পঞ্জির প্রায় অর্ধেক নষ্ট হয়েছে। তবুও লকডাউন-কোয়ারেন্টাইন এসব নিয়ম সামনে এনে খেলাটিকে মাঠে ফেরানোর চেষ্টা চলছিল। সেই ধারাবাহিকতায় একমাত্র সফল দল ইংল্যান্ড। হোম সামার নষ্ট হতে দেয়নি তারা। ঘরের মাঠে মে-জুনে সিরিজ ছিল উইন্ডিজের বিপক্ষে। করোনায় তা পিছিয়ে যায় জুলাইতে। অনেক কাঠখড় পুরিয়ে ১১৭ দিন অপেক্ষার পর ব্যাটে-বলের লড়াই অবশেষে আলোর মুখ দেখে। এই কঠিন সময়ে প্রথম দল হিসেবে কোনো দেশ সফরে গিয়ে দারুণ প্রশংসিত হয় উইন্ডিজ। যদিও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এ সিরিজ খেলতে রাজি হওয়ার খবর ওঠে উইন্ডিজের বিপক্ষে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেন ক্যারিবীয় বোর্ডের প্রধান নির্বাহী জনি গ্রেভ। তিনি জানান, করোনায় উইন্ডিজ বোর্ডের অচলাবস্থা কাটাতে ইংল্যান্ড ক্রিকেটের কাছ থেকে ধার নেন তারা। যাই হোক, কঠিন সময়ে সাহসী উইন্ডিজের চার্টার্ড বিমানে করে সফর করতে আসা বীরত্বের। যে কারণে এ বছর ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ পুরস্কার পায় উইন্ডিজ।

তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথমটিতে ৪ উইকেটে জিতে তাক লাগিয়ে দেয় জেসন হোল্ডারের দল। ৩২ বছর পর ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা জাগায় তারা। কিন্তু পরের দুই টেস্টে ১১৩ ও ২৬৯ রানে জিতে সিরিজে ফেরে ইংল্যান্ড।

পাকিস্তানকে করোনার সময়ে খেলতে আনায় ইংল্যান্ডকে ফিরতি সিরিজের চুক্তি করতে হয়। তা হলো পাকিস্তানে গিয়ে সিরিজ খেলা। ফলে ১৬ বছর পর পাকিস্তান সফরে যাবে ইংল্যান্ড। সিরিজটি হবে আগামী অক্টোবরে। যদিও টি-টোয়েন্টি সিরিজ, পাকিস্তানের জন্য তা বিশাল। তবে এ সিরিজের নিশ্চয়তা পাশে রেখে করোনার সময় দ্বিতীয় দেশ হিসেবে সফরে যাওয়া পাকিস্তানও প্রশংসা পেয়েছে। সিরিজে তিন টেস্টের প্রথমটিতে ৩ উইকেটে জেতে ইংল্যান্ড। বাকি দুই টেস্টেও ফল হতো, কিন্তু বৃষ্টি ও আলোর স্বল্পতায় দুই ম্যাচই ড্র হয়। পরে তিন টি-টোয়েন্টির সিরিজ ১-১ এ ড্র হয়।

করোনার সময়ে ক্রিকেট নিয়মিত রাখায় সফল ইংল্যান্ড আরও দুটি সিরিজ খেলেছে নিজেদের মাঠে। একটি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আর অপরটি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। দুটি সিরিজই ছিল সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের। পাকিস্তান সিরিজের ঠিক আগে আইরিশদের সঙ্গে তিন ম্যাচের ওয়ানডে খেলে ইংলিশরা। তাতে ২-১ এ সিরিজ জেতে স্বাগতিক দল। এরপর পাকিস্তান সিরিজের পর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলে ইংল্যান্ড। এই সিরিজে ওয়ানডেতে ২-১ ব্যবধানে জেতে অস্ট্রেলিয়া আর টি-টোয়েন্টিতে একই ব্যবধানে জেতে ইংল্যান্ড।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ : পয়েন্ট রূপ নিল পারসেন্টেজে

করোনার কারণে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অনেক টেস্টই যথাসময়ে মাঠে গড়াতে পারেনি। অথচ প্রথম চক্র শেষ হতে আর ৬ মাস বাকি। এই সময়ে বাকি থাকা সিরিজসহ ভবিষ্যৎ সিরিজ আয়োজন করা কঠিন। তাই ভিন্ন সমাধানের পথ বের করে আইসিসি। যতগুলো ম্যাচ হয়েছে বা হবে তা থেকে প্রাপ্ত পয়েন্ট নয়, সেই ম্যাচগুলোতে পাওয়া পয়েন্টের পারসেন্টেজের ভিত্তিতে চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালিস্ট নির্ধারণ করা।

এ পদ্ধতি অনুমোদিত হলে সবচেয়ে বেশি লাভ হতে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ডের। কারণ সামনের দুই সিরিজ জিতলেই চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষ দুইয়ে চলে যেতে পারবে কিউইরা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভারত। কারণ সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলায় পারসেন্টেজ কমে আসে তাদের। 

বিশ্বকাপের জায়গায় আইপিএল

মার্চে শুরুর কথা ছিল আইপিএলের ১৩তম আসর। কিন্তু করোনার কারণে তা ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। ভারতের করোনা পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও সময় নেয়। ওদিকে আলোচনা চলছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময়টাতে আসর আয়োজন করা যায় কি না। অবশেষে আইসিসির ঘোষণা আসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পিছিয়ে হবে ২০২২ এ। আর ২ আগস্ট বিসিসিআই ঘোষণা করে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পূর্ণ আইপিএল হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ফাইনালে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ৫ উইকেটে দিল্লি ক্যাপিটালসকে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো শিরোপা জেতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত