বাংলা একটা প্রবাদ আছে ‘বিষে হয় বিষক্ষয়’ দুই হাজার বিশ ঠিক তেমনি সব ‘বিষ’ শুষে নিয়ে একুশের প্রত্যয়ে পথ চলতে শুরু করবে জাতি- এই আশায় আমরা সবাই।
পেছন ফিরে তাকালে ২০২০ সবার কাছেই যেন এক আতংকের নাম। স্মৃতিতে চোখের কোণটা চিকচিক করে ওঠে আর কানে ভেসে আসে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের করুণ সুর। যে বছরজুড়েই শুধু ছিল প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস, মহামারি, চারিদিকে লাশের মিছিল। যার রেশ নতুন বছরে ও পুরো বিশ্বকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২০ আমাদের অনেককে করে তুলেছে মানসিক বিকারগ্রস্থ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ বলছে, বিশ্বে প্রায় ৮০% মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। পাশাপাশি ২০২০ আবার এই অবস্থা থেকে কীভাবে নিজেই নিজেকে উতরানো যায়, আত্নপ্রত্যয়ী করে তোলা যায় তা শিখিয়ে দিয়েছে। শিখিয়ে দিয়েছে একলা ঘরে কিভবে বন্দী থেকে নিজের কাজ নিজে করতে হয়, পরিবার সামলাতে হয়, সন্তান সামলাতে হয়। আবার প্রতিক্ষণেই মৃত্যুভয়ের যাতনাকে দূরে ঠেলে হাসি মুখের অভিনয় করতে হয়। শিখিয়েছে কীভাবে আপনজনদের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠতে হয়!
২০২০ শিখিয়েছে অনেক নতুন নতুন টার্ম। শিখিয়েছে সোস্যাল ডিস্ট্যানসিং, শিখিয়েছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ অর্থাৎ ঘর বসে অফিস করা। ২০২০ যেমন দেখিয়েছে শ্রেণি বিভাজন, তেমনি দেখিয়েছে এ সমাজ কতটা মানবিক। প্রয়োজনে এই সমাজের মানবিক মানুষগুলো জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। ঠিক তেমনি এই বছর এটাও প্রমাণ করেছে, ক্ষুধায় কাতর কিংবা মুমূর্ষু কোনো মানুষের মুখের খাবার কীভাবে কেড়ে নিয়ে নিজের পকেট ভারি করতে হয়। সবকিছু মিলিয়ে বছরটা সত্যি অনেকবেশি ডায়নামিক।
এই বছর চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রমাণ করেছে যেকোনো দুর্যোগ নারীর জন্য কতটা বিভীষিকাময়। দেখিয়ে দিয়েছে নারী ও শিশু কতটা অসহায়। এই বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়ে গিয়েছে প্রায় দ্বিগুন হারে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহ, শিশু নির্যাতন এসব পড়তে হয়েছে।
এই বছর জানান দিয়েছে এই সমাজ, এই পরিবার, এই ঘর কোনো কিছু যেন নারীর জন্য নিরাপদ নয়। এ বছর আরো বেশি করে চোখে আংগুল দিয়ে শিখিয়েছে যে নারীকে হতে হবে আত্নপ্রত্যয়ী, যিনি কিনা প্রয়োজনে রণমূর্তি ধারণ করতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন, যুদ্ধ করতে পারেন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিতে পারেন, ধর্ষকদের বুকে শূল চড়াতে পারেন। সর্বোপরি নিজের অধিকার আদায় নিজেরাই করে নিতে পারেন।
এই বছর প্রমাণ করে দিয়ে গেছে, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার গলদ। উত্তরাধুনিকতার এ যুগে, বিশ্বায়নের প্রভাবে যেখানে পুরো বিশ্ব একটা গ্রাম, সেখানে আমরা রাষ্ট্র হিসেবে কতটা পিছিয়ে তা প্রমাণ করে দিয়েছে এই বছর। কোনো ইমার্জেন্সি অবস্থায় রাষ্ট্র কতটুকু সক্ষম, বিকল্প ব্যবস্থা নিতে তাও এই বছর দেখিয়েছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে আমরা যে কেবল জি বাংলা, স্টার জলসা, পাখি আর আনারকলি ড্রেস ব্যাতীত অন্য প্রযুক্তি সবার জন্য তেমন সুলভ করে তুলতে পারিনি, তা হয়তো করোনা মহামারি না আসলে আমরা বুঝতেই পারতাম না। সঙ্গে সঙ্গে এও বুঝতে পারতাম না আমরা রাজনৈতিক প্রপাগাণ্ডায় ও কতটা তুখোড়!
সব পাওয়া না পাওয়ার গ্লানি মুছে জাতি আজ নতুন বছর ২০২১-কে নতুনভাবে বরণ করে নেয়ার প্রত্যয়ে আশান্বীত। বিগত বছরের শিক্ষাকে আরো বাড়িয়ে দক্ষতায় রপান্তর করা জরুরি। সে জন্য কিছু বিষয় জরুরি মনে করি।
বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে টেকনোলজিতে স্বক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন জরুরি। উন্নত টেকনোলজির ইতিবাচক ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সারাদেরশের গ্রামেগঞ্জে ফোর-জি আর থ্রি-জি এর যে ‘নাটক’ চলে তাকে প্রকৃত অর্থেই ফোর-জি বা থ্রি-জি করাটা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থ উপার্জনের রাজনৈতিক মঞ্চ না বানিয়ে গবেষণাগার হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। নচেত অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রাণঘাতী ভাইরাস হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গলদগুলো খুঁজে বের করে ঢেলে সাজাতে হবে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে। এ জন্য দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, ইতিবাচক সন্তান পালন এগুলোর প্রতি জোর দিতে হবে।
আর তাই নতুন বছরের প্রত্যয় হয় উঠুক বিগত বছরের হারিয়ে যাওয়া বা প্রাপ্তির শেষ থেকে শুরু করে আবার সবাইকে নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে একসঙ্গে বাঁচতে শেখা।
জিনাত নেছা: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক।
