বাবা-ছেলের দ্বন্দ্ব মেটাতে হেলিকপ্টার মহড়া!

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:১২ এএম

সমস্যাটি ছিল বাবা ও তার তিন ছেলের মধ্যে। স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যস্থতায় বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানও হয়েছে। এরপরও একই সমস্যা সমাধানে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে সালিশ করতে এসে জনরোষে পড়েছেন আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা।

তাদের সঙ্গে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী পরিচয়দানকারীসহ বেশ কয়েকজন কথিত গণমাধ্যমকর্মী।

শনিবার দুপুর ১টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে। পরে অবশ্য পুলিশি মধ্যস্থতায় আসকের কর্মকর্তারা ঢাকাতে ফিরে যান।

স্থানীয়রা জানায়, জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিষয়ে তারই তিন ছেলের মতবিরোধ শুরু হয়। গ্রাম্য মধ্যস্থতায় থানাতে বসে বিষয়টির সুষ্ঠু মীমাংসাও করা হয়।

এর কয়েক দিন পর আব্দুল লতিফের ছেলে মোস্তফা তাজওয়ার আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে তার বাবার বিরুদ্ধে একটা লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের ভিত্তিতে আইন সহায়তা কেন্দ্রের সহকারী বিভাগীয় প্রধান (ঢাকা জোন) মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ ২৮ ডিসেম্বর আব্দুল লতিফের কাছে একটি সালিশ বৈঠকের নোটিশ দেন।

স্থানীয় আন্দুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম মুক্তার বলেন, নোটিশ অনুযায়ী বাবা-ছেলের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে সালিশের জন্য শনিবার দুপুর ১টার দিকে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার চড়ে আন্দুলবাড়িয়ায় আসেন আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় প্রধান মো. লোকমান হোসেন, তার ব্যক্তিগত সহকারী মো. সোহেল রহমান এবং সহকারী বিভাগীয় প্রধান মাসুম বিল্লাহ।

দুপুর ১টার একটু পরে তারা হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসলে স্থানীয় লোকজনদের তোপের মুখে পড়েন।

ঠিক এই সময়ে আইন সহায়তা কেন্দ্রের আরও ২০-২৫ জন সদস্য ঢাকা থেকে অফিশিয়াল গাড়িতে (মাইক্রোবাস) করে আন্দুলবাড়িয়া বাজারে আসেন। তারাও গ্রামবাসীর বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হন।

তাদের নিয়ে আসা পাঁচটি গাড়ির সামনে বিশাল ব্যানারে কথিত অনলাইন টিভি চ্যানেলের নাম লেখা ছিল। একটি গাড়ির সামনে লেখা ছিল ‘সাংবাদিক টিম’, আরেকটিতে ছিল জাতিসংঘের মনোগ্রাম-সংবলিত ব্যানার। এসব গাড়ির প্রায় ৩০ জন যাত্রী ‘দৈনিক প্রাণের বাংলাদেশ’ পত্রিকা ও আসকের পরিচয়পত্র বহন করছিল।

হেলিকপ্টারে উড়ে আসা দলনেতা লোকমান হোসেন সাঈদী নিজেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার অধীন আইন সহায়তা কেন্দ্র ফাউন্ডেশনের ঢাকা বিভাগীয় প্রধান বলে পরিচয় দেন।

পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে হেলিকপ্টারে উড়ে আসা ও গাড়ির বিশাল বহর নিয়ে শোডাউনের খরচ কে দিয়েছে, এমন প্রশ্ন করা হলে লোকমান হোসেন কখনো বলেন তিনি নিজে খরচ বহন করছেন, আবার পরক্ষণেই জানান, সংগঠনের সদস্যরা বহন করেছেন।

আর কোনো জেলায় অতীতে এভাবে শোডাউন করে গিয়েছেন কি না বা এভাবে স্বল্প সময়ে পারিবারিক সমস্যা নিষ্পত্তির কোনো উদাহরণ আছে কি, জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শী গোলাম রহমান নামে এক গ্রামবাসী জানান, বাবা ছেলের সমস্যা নিয়ে ঢাকা থেকে আসা লোকজনের সঙ্গে গ্রামবাসীর কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন আইন সহায়তা কেন্দ্রের সদস্যদের মারতে উদ্যত হন। এ সময় জীবননগর থানা-পুলিশের সদস্যরা তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আইন সহায়তা কেন্দ্রের তিন কর্মকর্তা পুলিশের সহায়তা নিয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে চলে যান।

পরে আইন সহায়তা কেন্দ্রের বাকি সদস্যরা মাইক্রোবাসযোগে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ জানান, আমার ছেলেদের সঙ্গে সৃষ্ট সমস্যা স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে আমরা নিজেরাই সমাধানে করে নিয়েছি। এরপরও আমার ছেলের প্ররোচনায় ঢাকা থেকে লোকজন আসায় গ্রামবাসী কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যদিও পুলিশ সদস্যদের কারণে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

আবদুল লতিফ বিশ্বাসের ছেলে মোস্তফা তাজওয়ার এ বিষয়ে বলেন, তার বাবা ২১ বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকে তাদের নানাভাবে বঞ্চিত করে আসছেন। যে কারণে তিনি সহায়তার জন্য আইন সহায়তা কেন্দ্র ফাউন্ডেশনে’ দরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে থানায় বসে সমাধান হয়ে যায়। বিশাল বহরের খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করেননি মোস্তফা তাজওয়ার।

জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সামান্য একটা বিষয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে ঢাকা থেকে আইন সহায়তা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের এখানে আসা ঠিক হয়নি। পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় সেটা হয়নি। আমাদের সদস্যরা সহযোগিতায় আসকের কর্মকর্তারা ঢাকাতে ফিরে গেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত