কোন পথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২১, ১১:৫১ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একজন নতুন প্রেসিডেন্ট পাচ্ছে। আগামী ২০ জানুয়ারি তিনি শপথ নেবেন। কিন্তু এর আগে গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিল, যেখানে কংগ্রেস সদস্যদের অফিস ও কংগ্রেসের অধিবেশন বসে, সেখানে যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটল তা কলঙ্কিত করল মার্কিন গণতন্ত্র চর্চাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলে গত ২৫ মে (২০২০) যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকান্ডের ঘটনাও কলঙ্কিত করেছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘Popular sovereignty’। অর্থাৎ জনগণের শাসন তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে। সংবিধানের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে ‘We the people... do ordain and establish the constitution for United states of America। জনগণই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তৈরি করেছে ও তা প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ভাবার্থ হচ্ছে জনগণকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া। কিন্তু জর্জ ফ্লয়েডকে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার যখন হত্যা করে, তখন বর্ণবাদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, একই সঙ্গে জনগণ যে কীভাবে নিগৃহীত হয়, সে বিষয়টিও উঠে আসে। এর মধ্য দিয়ে জনগণের শাসন কিংবা গণতন্ত্রের মূল স্পিরিটের ওপরও আঘাত আসে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের (গৃহীত ২১ জুন, ১৭৮৮) মূল স্পিরিটই হচ্ছে গণতন্ত্র।

কিন্তু নোয়াম চমস্কির মতো অনেকেই বলতে চেষ্টা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। সেখানে এক ধরনের ‘গুন্ডাতন্ত্র’ চালু হয়েছে। আর এই গুন্ডাতন্ত্রকে উসকে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার সর্বশেষ পরিণতি ৬ জানুয়ারির ঘটনা; সীমিত সময়ের জন্য কংগ্রেস ভবন দখল হয়ে যাওয়া। ৬ জানুয়ারি ট্রাম্প তার সমর্থকদের উসকে দিয়েছিলেন পার্লামেন্ট ভবন হিসেবে পরিচিত ক্যাপিটল হিল দখল করতে। ওইদিন কংগ্রেস সদস্যরা (দুই কক্ষের সদস্যরা) জমায়েত হয়েছিলেন একটি যৌথসভায় ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী জো বাইডেন ও কমলা হারিসকে অনুমোদন দিতে। এটা ছিল একটি রুটিনওয়ার্ক। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন জো বাইডেন। কিন্তু ওই নির্বাচনী রায়কে মেনে নেননি ট্রাম্প। একের পর এক তিনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন। তার সমর্থকদের দিয়ে তিনি একের পর এক মামলা করিয়েছিলেন। তাতে লাভ হয়নি। তিনি উচ্চ আদালতে (সুপ্রিম কোর্ট) ৯ বিচারপতির মধ্যে ছয়জনকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ট্রাম্পের অযৌক্তিক দাবিকে সমর্থন করেননি। আর তাই সর্বশেষ অপচেষ্টা হিসেবে তিনি উসকে দিলেন তার সমর্থকদের, যাদের একটা বড় অংশই ওয়াশিংটন ডিসিতে জমায়েত হয়েছিল, এসেছিল গ্রামাঞ্চল থেকে। ট্রাম্পের ক্ষমতার উৎসই ছিল এরা। ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’র কথা বলে তিনি এদের উসকে দিয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে। আর ক্যাপিটল হিল ‘দখল’ করার কাজেও তিনি এদের ব্যবহার করলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের জন্য এ মুহূর্তে সমস্যা দুটি বর্ণবাদ ও গুন্ডাতন্ত্র। বর্ণবাদের ইতিহাস অনেক পুরনো। মার্টিন লুথার কিং এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ইতিহাসের পাতায় তার নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু বর্ণবাদ এখনো আছে। আর ট্রাম্প এই বর্ণবাদকে উসকে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তার আমলে তিনি উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠীকে (যারা তার সমর্থক) নিয়ে তিনি আলাদা একটি ‘ক্ষমতার বলয়’ সৃষ্টি করেছিলেন, যারা প্রচলিত আইন ও আইনের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছিল। আর এভাবেই ট্রাম্প ‘মার্কিনি গণতন্ত্র’কে জিম্মি করেছিলেন। আব্রাহাম লিংকন যাকে বলেছিলেন ‘Mob rule’, অর্থাৎ উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর শাসন, সেই ‘শাসন’ই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। গেল বছর মিনিয়াপোলিস থেকে পোর্টল্যান্ড (ওরিগন), শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর গুন্ডাতন্ত্র প্রত্যক্ষ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। এর প্রতিবাদে জন্ম হয়েছিল ‘ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস’ আন্দোলনের, যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের দেশগুলোতে। আর এভাবেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদকে উসকে দিয়েছিলেন।

এটা ঠিক যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বর্ণবাদ যে কত শক্তভাবে অবস্থান করছে, ২৫ মে (২০২০) জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকান্ড ছিল তার সর্বশেষ উদাহরণ। এই বর্ণবাদ নিয়ে শত শত গবেষণাপত্র ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণাপত্রে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গরা শে^তাঙ্গদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। ইতিহাস বলে ১৬১৯ সালে আজকের যে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্য, সেখানে প্রথম আফ্রিকান নাগরিকদের দাস ব্যবসার মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়েছিল। আজকের অ্যাঙ্গোলা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের পর্তুগিজ দাস ব্যবসায়ীরা চুরি করে নিয়ে এসেছিল। সাগরে ব্রিটিশ ডাকাতরা পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের ছিনিয়ে নিয়েছিল। এরপরের ইতিহাস সবাই জানে কৃষ্ণাঙ্গরা যুক্তরাষ্ট্রে দাস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৮৬৫ সালে এই দাস ব্যবসার বিলুপ্তি ঘোষণা করা হলেও, কৃষ্ণাঙ্গদের (মোট জনসংখ্যার ১৩ ভাগ) জীবনযাত্রার মানের কোনো উন্নতি হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গরা প্রতিটি ক্ষেত্রে, শিক্ষায়, চাকরিতে, ব্যবসায় আজও অবহেলিত। এমনকি করোনাভাইরাসে তুলনামূলক বিচারে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হার শে^তাঙ্গদের চেয়ে বেশি। কৃষ্ণাঙ্গদের অনেকেরই কোনো ‘স্বাস্থ্যবীমা’ নেই। ফলে অবহেলা বিচার না পাওয়া, বেকারত্ব, অবর্ণনীয় জীবনযাপন কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে বারবার রাস্তায় টেনে নিয়ে আসে। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বারবার সমতা বজায় রাখা, তাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতির দাবি জানানো হলেও, এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ক্ষোভ ছিল, তাই আবার বিস্ফোরিত হয়েছিল। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু ২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক এরিক গার্নারের মৃত্যুর কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। পুলিশ যখন গার্নারের গলা চেপে ধরেছিল, গার্নারকেও বলতে শোনা গিয়েছিল ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’! জর্জ ফ্লয়েডও একই প্রক্রিয়ায় একই কথা বলেছিলেন এবং পুলিশ হেফাজতে মারা গিয়েছিলেন। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর খবরটিও সামনে চলে এসেছে।

‘ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স’-এর তথ্য মতে ২০১৯ সালে পুলিশ হেফাজতে যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছে ১০০০ মানুষ, যাদের মধ্যে শতকরা ২৪ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ। অথচ জনসংখ্যার মাত্র ১৩ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ, কিন্তু পুলিশ হেফাজতে তাদের মৃত্যুহার বেশি। এমনকি ১৯৮০-২০১৯ সাল পর্যন্ত যারা জেলে ছিলেন, তাদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে জেলে বন্দি জনগোষ্ঠীর ৩৪ ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। গবেষণায় দেখা গেছে, পুলিশ হেফাজতে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের চেয়ে ছয় ভাগ, আর জার্মানির চেয়ে চার ভাগ বেশি মানুষ মারা যায়। আরও দুঃখজনক খবর হচ্ছে, ২০১৩-১৯ সালে পুলিশি নির্যাতনের (যুক্তরাষ্ট্রে) শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের আদৌ কোনো বিচার হয়নি। বর্ণবাদ যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকে বিভক্ত করেছে। বলা হচ্ছে, ‘মহামারীর মধ্যে এই বর্ণবাদ আরেকটি মহামারী’। দুঃখজনক হচ্ছে এটাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৪৪ বছরের ইতিহাসে জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে তাদের ন্যূনতম অধিকারের দাবিতে এখনো আন্দোলনে নামতে হয়। তবে এবারের আন্দোলনের চরিত্র একটি ভিন্নতর। এই আন্দোলন একটি বৈশ্বিক রূপ পেয়েছিল। লন্ডন কিংবা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে যে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে স্থানীয়ভাবে যারা দাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিংবা বর্ণবাদী রাজনীতি সমর্থন করতেন, তাদের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ পরিলক্ষিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলের একজন দাস ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ এডওয়ার্ড কোলস্টোনের স্ট্যাচুও সরিয়ে নিয়ে একটি পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। কোলস্টোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ১৭ শতকে কৃষ্ণাঙ্গ দাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে প্রচুর অর্থবিত্ত অর্জন করেছিলেন। চার্চিলের স্ট্যাচুও তারা সরাতে চেয়েছিলেন। জুনের (২০২০) তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতেও সেখানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিক্ষোভকারীরা বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো লুণ্ঠন করেছিল। আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ওই বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শ্বেতাঙ্গদের দখলে। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি ক্ষোভটা কেন, তা আগুন ও লুট করার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, এটাই হচ্ছে বিক্ষোভের মূল কারণ। বলতে দ্বিধা নেই যে, চার বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেভাবে ‘হোয়াইট সুপ্রেমেসি’র ধারণা প্রোমোট করছেন, তাতে করে একদিকে কৃষ্ণাঙ্গরা, অন্যদিকে এশীয় ও হিস্পানিক বংশোদ্ভূতরা এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেন। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তাদের যে অধিকার দিয়েছে, তা ট্রাম্প খর্ব করছেন বা খর্ব করতে চাচ্ছেন। বিক্ষোভের পেছনে এটাই ছিল মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গরা বরাবরই অবহেলিত। তাদের চাকরির বাজার সীমাবদ্ধ। বেকারত্বের হার তাদের মধ্যে বেশি। পিউ Pew রিসার্চ সেন্টারের মতে, জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অসমতার হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

একদিকে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে অসন্তোষ জমে আছে এবং এই অসন্তোষ প্রশমন করতে ট্রাম্পের ভূমিকাও লক্ষণীয় নয়, ঠিক তখনই ক্যাপিটল হিল দখল করার ঘটনা ঘটল। যদিও এই ‘দখল’ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আধাসামরিক বাহিনী দখলদারদের হাত থেকে ক্যাপিটল হিল মুক্ত করে। কিন্তু এ ঘটনা একটা কালো দাগ রেখে গেল। গুন্ডাতন্ত্র কত ভয়ংকর হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে, এটা তার বড় প্রমাণ। ট্রাম্প তার উচ্চাকাক্সক্ষা, ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, যে কারণে তার বিরুদ্ধে আবার ইমপিচমেন্টের দাবি উঠেছে। ট্রাম্পের বিদায় নিশ্চিত হয়েছে বটে। কিন্তু যে অবস্থায় তিনি মার্কিন সমাজকে রেখে গেলেন, সেখান থেকে উত্তরণের পথ কী? একটি বিভক্ত সমাজ ট্রাম্প সৃষ্টি করেছেন। এই বিভক্তি সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে মনে হয় না। তাই জো বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে একটা বড় চ্যালেঞ্জ কীভাবে বিভক্ত সমাজকে আবার একত্র করা যায়। গণতন্ত্রকে সুসংহত ও আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে জো বাইডেনের ভূমিকা তাই আজ অনেক বড়।

লেখক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত