উপহার হিসেবে ভারতের পাঠানো টিকা রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নেওয়ার আহ্বান জানালেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, “পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানেরা যেভাবে টিকার প্রথম ডোজ নিয়ে মানুষকে আস্থা ও ভরসা দিচ্ছেন ও আশ্বস্ত করছেন আপনারাও সেই পথ অনুসরণ করুন। তাদের মতো আপনারাও সাহসী পদক্ষেপ নিন। আপনারা আগে টিকা নিলে জনগণ ভরসা পাবে। তখন দেশের মানুষ নিশ্চিন্তে এই টিকা নিতে সাহস পাবে।”
নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শুক্রবার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ সব কথা বলেন।
বাংলাদেশের মানুষের ওপর ট্রায়াল করে কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিশ্চিত হওয়ার জন্যই উপহার হিসেবে ভারত এ টিকা পাঠিয়েছে কি-না প্রশ্ন তোলেন রিজভী।
বলেন, “ভারত নিজেরা এই টিকার পরীক্ষা শুরু করবে আগামী মার্চ থেকে। ওই টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ না হওয়া সত্ত্বেও ভারত সরকারের ছাড়পত্র পাওয়ায় বহু বিশেষজ্ঞ বিস্মিত। সুতরাং আমরা কি বিপজ্জনক গিনিপিগে পরিণত হয়েছি ভারতের টিকা পরীক্ষার?”
বিএনপির এ নেতা বলেন, “করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ভারত থেকে টিকা আমদানি ও ক্রয় নিয়ে নিশিরাতের সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম এক উপদেষ্টার মালিকানাধীন বেক্সিমকোর অতিমাত্রায় তৎপরতা, চুক্তি, বেক্সিমকোর তৎপরতার সঙ্গে সরকারের রহস্যজনক আর্থিক লেনদেনের যোগসাজশ- সব মিলিয়ে টিকা সম্পর্কেও জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।”
রিজভী বলেন, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার ভারত সরকারের সৌজন্যে বাংলাদেশে ২০ লাখ ডোজ টিকা পাঠানো হয়েছে। এ নিয়েও জনমনে রয়েছে গভীর সন্দেহ-সংশয়। এর কারণ, নিশিরাতের সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নানারকম বক্তব্য-মন্তব্য। আমরা যত দূর জানি, এখন পর্যন্ত ভারত তাদের দেশে কভিড-১৯ মোকাবিলায় দুই ধরনের টিকা অনুমোদন দিয়েছে। একটি হচ্ছে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা অ্যাস্ট্রাজেনেকার মিলিত গবেষণায় তৈরি কোভিশিল্ড। অপরটি হচ্ছে ভারত-বায়োটেকের উদ্ভাবিত কোভ্যাক্সিন। দুটিই উৎপাদন করছে ভারতের প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট। তবে ভারত সরকার বাংলাদেশে কোনটি পাঠিয়েছে? কোভিশিল্ড নাকি কোভ্যাক্সিন? ভারতে টিকা গ্রহণের পর চার দিনে মারা গেছে তিনজন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৬০০ মানুষ। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির চিকিৎসকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিতর্কিত কোভ্যাক্সিন নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন চিকিৎসকদের বড় অংশ। তারা বলেছেন, কোভ্যাক্সিন নিয়ে আমরা সন্দিহান ও সংশয়ী। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হওয়ায় এ নিয়ে ঘোরতর রহস্য তৈরি হয়েছে।”
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, “স্বামী-স্ত্রীর কূটনৈতিক সম্পর্কের জের হিসেবে উপহারের নামে ২০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার পরও মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির আরেকটি কারণ হচ্ছে, টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে ভারত সরকার যে দামে কোভিশিল্ড কিনছে তার চেয়ে এক ডলার বেশি দামে তারা বিক্রি করছে বাংলাদেশের কাছে। কেনার সময় প্রতিটি টিকায় বাংলাদেশকে এক ডলার করে বেশি দিতে হচ্ছে। শত শত কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়ার পর প্রথমে বাংলাদেশ চায় অগ্রিম নগদ টাকায় কেনা টিকার সরবরাহ। সেটি সরবরাহ না করে তড়িঘড়ি করে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিনা পয়সায় ২০ লাখ ডোজ দিয়ে কী বোঝাতে চাইছে ভারত? ধরা যাক, ৩ হাজার টাকা মূল্যের জিনিস ৫ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করার পর দোকানি ১০০ টাকা উপহার দিল, সেটাকে আমরা কী বলবো? উপহাস ছাড়া কী আর কিছু বলা যাবে? কিংবা শাড়ির দোকানে কোল্ড ড্রিংকস আপ্যায়নের মতো ঘটনা।”
রিজভী বলেন, “গত ৩ জানুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে তিন কোটি টিকার জন্য বেক্সিমকোর চুক্তি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই ৫০ লাখ ডোজ কোভিশিল্ড পাবে বাংলাদেশ। অগ্রিম হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা সেরামের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়। এই খবর প্রচারিত হওয়ার পরপরই জানা যায়, সেরাম ইনস্টিটিউটের ওপর টিকা রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারত সরকার। এখন হঠাৎ করেই আবার জনগণ শুনতে পাচ্ছে, ২৫ কিংবা ২৬ জানুয়ারি নাকি বাংলাদেশের কেনা টিকার ৫০ লাখ ডোজ আসবে। ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি’ চলার হেতু কী? উপহারের আগে বেশি দামে বাংলাদেশের কেনা টিকা সরবরাহে কী ক্ষতি ছিল? এখানেই তো মনে হয় শুভংকরের ফাঁকি। জনগণের টাকা অকাতরে পাচার হওয়া।”
