গত বিশ বছরের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নজর দিলে আমরা দেখি যে, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ৪.৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭.৮ শতাংশের অধিক হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিতে দেশের ব্যাংক খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তথ্যপ্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে আধুনিকায়ন হচ্ছে ব্যাংকিংব্যবস্থা। বাড়ছে আধুনিক সেবা-সমন্বিত ব্যাংকিং সেবার মান। যেকোনো মানুষ ব্যাংকিংসেবা পাচ্ছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। বিভিন্ন ধরনের ঋণসেবা, অর্থ গচ্ছিত রাখা ও লেনদেন করা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নসহ নানা ধরনের কার্যক্রমে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে নিষ্ঠার সঙ্গে। এই নিষ্ঠায় ইদানীং কিছু ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ঘটেছে বেশ কিছু অনিয়মও। স্বাধীনতার পর সোনালী, পূবালী, রূপালী, জনতা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ সব ব্যাংকই ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। আরও ছিল কিছু বিশেষায়িত ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতকে আরও গতিশীল করতে আশির দশকের প্রারম্ভে কিছু উদ্যোক্তাকে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয় এবং সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে বেসরকারি ব্যাংক চালু করার অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এখনো তা দেওয়া হচ্ছে।
তরুণ মেধাবী জনবল এবং ব্যাংকিং খাতে তথ্য ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের ফলে প্রতিটি ব্যাংকের মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির হার বেশি। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। দেশের প্রতিটি মানুষকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় এনে অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। এই খাতের গতিশীলতার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঝেমধ্যে নানা ঘটনায় এই এগিয়ে চলা বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিবাদীদের ‘নিষ্ক্রিয়তা’ কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে কমিশন গঠন করে সে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চেয়ে সম্প্রতি রুল জারি করে আদালত। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা সম্পর্কে তদন্ত করার উদ্দেশ্যে কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬-এর-৩ ধারার অধীনে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মানি লন্ডারিং, ঋণখেলাপি, মূল ঋণ ও সুদের পুনরুদ্ধার, সুদের অব্যাহতি, খারাপ ঋণ, তারল্য সংকট, মূলধন অপ্রাপ্তি, রাইট অফ, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে গত বিশ বছরে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে যা ঘটেছে সেগুলোর দুর্বলতা খুঁজে সমাধান দেওয়াই এই কমিশনের মূল কাজ হবে। প্রস্তাবিত কমিশন ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬-এর ৩ ধারা অনুসারে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৯ সদস্য কমিশন গঠন করা যেতে পারে বলে মহামান্য আদালত নির্দেশনা প্রদান করেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়, ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাংক কমিশন গঠনের দিকনির্দেশনা পেয়ে কাজ শুরু করেছে। কমিটির সদস্য খোঁজার প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ব্যাংকারকেও চিঠি দিয়েছে বলে পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে, ব্যাংক খাতের কার্যক্রম মূল্যায়নে একটি কমিশন গঠন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, ব্যাংক খাতের উল্লেখযোগ্য প্রসার হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই খাতের সঞ্চয়ন, সুষ্ঠু নীতিমালা ও প্রবৃদ্ধির ধারা নির্ধারণ। তিনি বলেছিলেন ‘ব্যাংক খাতের প্রচলিত কার্যক্রম এবং এ খাতের সার্বিক অবস্থান মূল্যায়ন ও বিবেচনা করার জন্য একটি কমিশন গঠনের চিন্তাভাবনা আমাদের রয়েছে।’ ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিটি বাজেট বক্তব্যেই সাবেক অর্থমন্ত্রী ব্যাংক কমিশন গঠনের পক্ষে কথা বলে গেছেন। কিন্তু সেটা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও ঘোষণা দিয়েছিলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে তিনি একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে চান। মাঝখানে কমিশনের পরিবর্তে কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগও নিয়েছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী। আগেও আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ওই সময় গঠন করা হয়েছিল ছয় সদস্যের ব্যাংক সংস্কার কমিটি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ছিলেন ওই কমিটির অন্যতম সদস্য। পরে কাজী ফজলুর রহমানকে অব্যাহতি দিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে করা হয় কমিটির চেয়ারম্যান। কমিটি ৩৭টি সভা করেছিল এবং ১১টি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করেছিল।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, নতুন ব্যাংকের বেশি পরিচালনব্যয়, সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ প্রদান, সরকারি ব্যাংকের পর্ষদের দুর্বলতা, মূলধন ঘাটতি ইত্যাদি কারণকে সামনে এনে বিশেষজ্ঞরা ব্যাংক খাত সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে আসছেন বহু বছর ধরে। অবস্থা সংকটজনক থাকলেও রহস্যজনক কারণে সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রয়োজন বোধ করেনি। অর্থাৎ এ খাত সংস্কারে কমিশন গঠনের বিষয়টি বারবার এড়িয়ে গেছে সরকার।
২০১২ সালের ৫ নভেম্বর একটা ডায়ালগের উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেখানে সিপিডি আর্থিক খাতের জন্য একটি কমিশন গঠন করার কথা বলে এবং সেই কমিশনের কার্যপরিধি তুলে ধরে। শুধু ব্যাংক নয়, পুঁজিবাজার এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য কমিশন গঠনের সুপারিশ করে সিপিডি। সিপিডির প্রস্তাবিত কমিশনের উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধিগুলো হলো : (১) ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ এবং ব্যাংকের গ্রাহক এবং অর্থনীতির জন্য খাতটি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা নিরূপণ করা; (২) ব্যাংকিং খাতের সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যানের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে খাতটির প্রকৃত স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা; (৩) ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সমস্যার মূল কারণগুলো কী এবং সামনের দিনের চ্যালেঞ্জগুলো কী তা চিহ্নিত করা; (৪) ব্যাংকিং খাতের সমস্যার জন্য কারা এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠান দায়ী তা চিহ্নিত করা; (৫) স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কী ধরনের প্রশাসনিক, আইনগত ও কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে ব্যাপারে অর্থবহ ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা তৈরি করা। এই কমিশনের স্থায়িত্ব তিন থেকে চার মাস হওয়া উচিত বলে সিডিপি মতামত প্রদান করে।
এখন চাইলে আগামী অর্থবছরের আগেই একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করে সেটি আগামী অর্থবছরেই বাস্তবায়ন করা যায় কি না সেটি ভাবা যেতে পারে। আর প্রস্তাবিত কমিশন প্রতিবেদন তৈরির জন্য অন্তত চারটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে : (ক) বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ; (খ) বিশেষ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাদা আলাদা আলোচনা; (গ) জনগণের জন্য উন্মুক্ত সংলাপ আয়োজন করা এবং গণশুনানির ব্যবস্থা করা; এবং সর্বোপরি, (ঘ) কমিশনকে সমাজের বৃহত্তর গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, যারা ব্যাংকিং খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এগুলো সম্পন্ন করার জন্য কমিশনকে একটি সার্বিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। নীতিনির্ধারক, ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তা, সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ছোট ছোট সঞ্চয়কারী, বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি, নারী, যুবক, শহর ও গ্রামের জনগণ, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, মিডিয়া সব অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে প্রতিবেদনে তাদের মতামতের প্রতিফলন থাকতে হবে। এই কমিশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন নিয়মিতভাবে কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ফলাফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সর্বদা অবহিত করবে ওয়েবসাইটে। জনগণের মতামতের জন্যও প্রতিবেদনটি ওয়েবসাইটে রাখতে হবে। কমিশনের প্রধান ও সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা, যোগ্যতা, বিচক্ষণতা, নিরপেক্ষতা ও সততাই হবে একমাত্র যোগ্যতা, যাতে তারা নির্মোহভাবে এই কমিশনে কাজ করতে পারেন। কমিশনের স্বাধীনতা সমুন্নত রেখে তার কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে। কমিশনের সুপারিশমালা সরকার কীভাবে এবং কখন বাস্তবায়ন করবে, সে ব্যাপারে কমিশন গঠনের সময়ই সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এবং অঙ্গীকার থাকতে হবে।
দেশে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকিং কমিশন এবং ব্যাংকিং কমিটি গঠিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে ন্যাশনাল কমিশন অন মানি, ব্যাংকিং অ্যান্ড ক্রেডিট গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ইউএসএআইডির সহায়তায় আর্থিক খাতের সংস্কার প্রকল্প হাতে নেয়, যা ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চলে। ১৯৯৮ সালে ব্যাংকিং কমিশন এবং ২০০২ সালে ব্যাংকিং রিফর্ম কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং খাতের জন্য কার্যকর আইনগত এবং তদারকি ব্যবস্থা তৈরি করা। ২০০৩ সালে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য জাতীয় সংসদে একটি বিল পাস করা হয়। এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগটি ছিল ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০০৩’, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করার এবং মুদ্রানীতি প্রণয়নের অনুমোদন পায়। এ উদ্যোগগুলোর ফলে ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য অনেকটাই পুনরুদ্ধার হয়।
বিদ্যমান বাস্তবতায় এখন যদি একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠিত হয় তবে ব্যাংক খাতটির ওপর জনগণের হারানো আস্থা ও বিশ্বাস কিছুটা ফিরে আসতে শুরু করবে। তবে কমিশন যা কিছু সুপারিশ করুক না কেন, তা বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তাহলেই বোঝা যাবে ব্যাংকিং খাতের উন্নতির জন্য সরকারের সত্যিকারের আগ্রহ কতটুকু। দেশের জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে ব্যাংক কমিশনের জন্য।
লেখক ব্যাংকার ও গবেষক
