আবেগঘন কণ্ঠে ক্রিকেটকে বিদায় রাজ্জাক-নাফীসের

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:০২ এএম

২০০১-০২ মৌসুমে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল আবদুর রাজ্জাকের। সময়ের হিসাবে পাক্কা ২০ বছর। ২০০৪ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন এক যুগেরও বেশি। সে বছরই ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু শাহরিয়ার নাফীসেরও। পরের বছর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা। এতদিনের ‘ক্রিকেটার’ পরিচয়টা শনিবার থেকে ‘সাবেক’ হয়ে গেল দুজনের। সব ধরনের ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেন দুজনে। জীবনের এই পালাবদলের সময় আবেগাক্রান্ত রাজ্জাক জানালেন, ঘোরের মধ্যে আছেন তিনি। নাফীস জানালেন, এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব ছিল না।

গতকাল ঢাকা টেস্টের তৃতীয় দিনের লাঞ্চ বিরতির সময় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টার সংলগ্ন প্লাজায় তাদের অবসর উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) আয়োজিত সে অনুষ্ঠানেই খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে নতুন দায়িত্বে যুক্ত হন দুজন। ৩৮ বছর বয়সী রাজ্জাক বিসিবির নির্বাচক প্যানেলে মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ও হাবিবুল বাশারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কদিন আগে। আর ৩৫ বছর বয়সী নাফীস ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়েছেন।

বিদায় ঘোষণার দিনে মঞ্চের পোডিয়ামে এসে আবেগাক্রান্ত ছিলেন দুজনই। এদিন পরিবার, কোচ, সতীর্থ, ক্রীড়া সাংবাদিকসহ ক্যারিয়ারে সহযোগিতা করা সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দুজনই। কোয়াবের পক্ষ থেকে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট নাইমুর রহমান দুর্জয় ও বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন দুই ক্রিকেটারের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও একটি ট্রফি তুলে দেন। ওয়ানডেতে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০০ উইকেট এবং এই ফরম্যাটে মোহাম্মদ আশরাফুলের সঙ্গে যৌথভাবে দ্রুততম হাফসেঞ্চুরিয়ান (২১ বলে) রাজ্জাক বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত আমি বলতে পেরেছি আমি ক্রিকেট খেলোয়াড়, এখন থেকে বলতে হবে অন্যকিছু। হয়ত জিনিসটা সহজে বলতে পারছি তবে আমার জন্য এত সহজ নয়। ঘোরের মধ্যে আছি এখনো। ১৯৯৪ সাল থেকে ক্রিকেটের মধ্যে। সেই জিনিসটাকে বিদায় বলা...। এই মুহূর্তে কিছু গুছিয়ে বলা আমার জন্য একটু কঠিন।’

ক্যারিয়ারজুড়ে জাতীয় দলে টেস্টে উপেক্ষিত ছিলেন রাজ্জাক। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রেকর্ডগড়া সাফল্য কিন্তু তারই। দেশের ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বাধিক ৬৩৪ উইকেট শিকারি রাজ্জাককে এখন নির্বাচক হিসেবে ক্রিকেটার বাছাই করতে হবে, ‘আশা করব প্রথম শ্রেণিতে আমার চেয়েও বেশি ভালো কেউ খেলবে, পারফর্ম করবে, জাতীয় দলে আসবে। এটা না হলে ক্রিকেটের জন্য ভালো কিছু হবে না। মিস করার কথা যদি বলেন... আমার এই ক্যারিয়ার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ জিনিস। এটা আসলে ভোলার মতো নয়। প্রত্যেক ধাপে ধাপে মনে পড়বে... মিস করব না ঠিক, স্মরণে থাকবে। মিস করতাম যদি জোরপূর্বক হয়ে যেত। অবসর নেওয়াটা জোরপূর্বক নয়, আমারই সিদ্ধান্ত।’

বাঁহাতি সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার নাফীস আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অসাধারণ ১৩৮ রানের ইনিংস দিয়ে, যা বাংলাদেশ টেস্ট ইতিহাসের আইকনিক ব্যাটিং। ২০০৬ সালে ‘আইসিসি ইমার্জিং ক্রিকেটার’ নির্বাচিত নাফীস অবসর ঘোষণায় বলেন, ‘সাবেক অনুভূতিটা একটু কঠিন। গতকাল থেকেই চিন্তাভাবনা করছিলাম। আমি খেলব না এটা তাতে খুব কষ্ট লাগছে না, তবে অনুভূতিটা অদ্ভুত। আমি একটা স্কুলে পড়লাম, স্কুল ছেড়ে দিচ্ছি ওরকম অনুভূতি। খুবই অদ্ভুত। আমি সবসময় সব সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তে নিয়েছি, পরিষ্কার করে। আমি চিন্তা করেছি যখন একজন খেলোয়াড় হিসেবে আর অবদান রাখতে পারব না তখন অন্যভাবে ক্রিকেটে অবদান রাখা উচিত। এজন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়নি।’

বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের মাঠ থেকে বিদায়ের উদাহরণ নেই বললেই চলে। একমাত্র মোহাম্মদ রফিক ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আর খালেদ মাহমুদ সুজন ২০০৬-এ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাঠ থেকে অবসরে যান। তেমনটা না হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি নাফীস ও রাজ্জাক। দুজনই আশা করেন ভবিষ্যতে ক্রিকেটারদের মাঠ থেকে অবসরে যাওয়ার প্রচলন হোক। নাফীস বলেন, ‘আমাদের চেয়েও বড় অনেক ক্রিকেটারের এই সৌভাগ্য হয়নি। বিসিবি ও কোয়াবকে ধন্যবাদ এরকম একটা আয়োজনের জন্য। যদি করোনা না থাকত আমরা খেলে বিদায় নিতে পারতাম। তারপরও আমাদের জন্য যতটুকু করেছে আমরা কৃতজ্ঞ।’ রাজ্জাক বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক টেস্ট ক্রিকেটার ছিলেন। অনেকে এই সুযোগটাও পাননি। আমরা আশা করব এরকম প্রচলন আস্তে আস্তে তৈরি হবে যেন আমরা মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারি। আমার পুরো ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো হতাশা নেই, এটা নিয়েও নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত