সাদা কালো পোশাকে

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:০৩ এএম

সাদা ও কালো পোশাকে একুশের ভাবগাম্ভীর্য প্রকাশ পায়। একুশের মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে পোশাকের দোকানে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই সাদা-কালো পোশাকের আয়োজন থাকে। দেশের বড় বড় ফ্যাশন হাউজের ডিজাইনাররা একুশের চেতনাকে বুকে ধারণ করে প্রতি বছরই নিয়ে আসে নতুন নকশা-ভাবনা। এই নকশা-ভাবনার মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে কখনো বর্ণমালা, কখনো একুশের গান-কবিতা, কখনো শহীদ মিনার, কখনোবা শহীদ মিনারে আঁকা আলপনা। প্রভাতফেরির পোশাক নিয়ে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

প্রভাতফেরির পোশাক নিয়ে নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যসংগঠক লুবনা মারিয়াম বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুরই পরিবর্তন হয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আমরা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি নানাভাবে পালন করি। তেমনি এখনকার প্রভাতফেরি আর আমাদের তরুণ বয়সের প্রভাতফেরির মধ্যে অনেক পার্থক্য। ১৫ বছর বয়স থেকে প্রভাতফেরিতে যেতাম। সেই থেকে এখন পর্যন্ত মেয়েদের একটাই পোশাক, কালো পাড়ের সাদা শাড়ি। তবে তখনকার পরিবেশটাই ভিন্ন ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের নিজস্ব কোনো কিছুকে ঠিকভাবে হতে দিত না। তাই তখন প্রভাতফেরি, রবীন্দ্রনাথের গান বলি কিংবা পহেলা বৈশাখ সবই ছিল প্রতিবাদের ভাষা। তখন আসলে প্রয়োজন ছিল বলেই আমরা অত কর্মযজ্ঞ করতাম। এখন একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু প্রভাতফেরিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে। মনে পড়ছে ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে আমরা বুলবুল ললিতকলা অ্যাকাডেমির ওয়াইজঘাট শাখায় রাত ১২টা থেকে টানা ভোর পর্যন্ত অনুষ্ঠান করতাম। এরপর কালো পাড়ের সাদা শাড়ি পরে খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে আসতাম। একুশে ফেব্রয়ারি, শোক, শ্রদ্ধা আর অর্জনের অন্যরকম দিন ছিল।’

কালো শোকের রং হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। আর সাদা শান্তির প্রতীক। কালোর সঙ্গে সাদার সমন্বয়ে নকশা করা হয়, যা শান্ত-স্নিগ্ধ ভাব এনে দেয়। শুরু থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে সাদা রঙের পোশাক পরার চল ছিল। সাদা পোশাকের ওপর পরা হতো কালো কাপড়ের ব্যাজ। হাতে থাকত বর্ণিল ফুল। এ ধারাতেই শুরু হলো আমাদের সাদা-কালো পোশাকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ।

ফ্যাশন হাউজ বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, ‘সাদা-কালো রং কিন্তু মৌলিক রং। স্বাধীনতার আগে এদেশের মেয়েদের পোশাক ছিল শাড়ি আর রং ছিল সাদা কোড়া। এরপর সাদা শাড়ির চিকন পাড়ে এলো কালো রং। আর সাদা শাড়ির চিকন কালো পাড়ই একুশে ফেব্রুয়ারির পোশাক হয়ে গেল। আর ছেলেদের প্রভাতফেরির পোশাক ছিল খাদির সাদা পাঞ্জাবি। কিন্তু দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের রং ও ধরনেরও বদল ঘটেছে। একুশের প্রধান বিষয় হচ্ছে শোকের সঙ্গে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো। এ ভাবগম্ভীর বিষয়টি কালো রং দিয়ে বোঝানো হয়। আর সাদার অর্থ হচ্ছে শুদ্ধতা ও শ্রদ্ধা। তাই এ দুটি রং ছাড়া একুশকে কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। যেহেতু আমাদের আত্মত্যাগ আর লড়াই ছিল ভাষার জন্য, সেহেতু ভাষা ও বর্ণমালা এখানে অনেক বেশি সংযুক্ত। একুশের পোশাকে সাদা-কালোর সঙ্গে বর্ণমালা কিংবা কোনো পঙ্ক্তিমালা কিংবা কোনো মোটিফ ছাড়া ভাবাই যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারির পোশাকে সাদা-কালোর সঙ্গে অল্পস্বল্প লালও দেখা যাচ্ছে। শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা, টপ, শার্ট, টি-শার্টও জায়গা নিয়েছে।’

প্রভাতফেরির পোশাকে সাদা সুতির কাপড়ের মধ্যে নানা ধরন দেখা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে নিত্য-উপহারের স্বত্বাধিকারী বাহার রহমান বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারিতে সাদা বা কালোর আবেদন সব সময়ই থাকবে। দেশি কাপড় আর সাদা-কালো রং এই দুটি মিলেই তৈরি হয়েছে আমাদের একুশের পোশাক কিংবা প্রভাতফেরির পোশাক। তবে এখন শাড়ি ও পাঞ্জাবির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ, টি-শার্টও প্রাধান্য পাচ্ছে।’

প্রভাতফেরির পোশাক প্রসঙ্গে বিশ্ব রঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জানালেন, ‘সাদা মানেই হচ্ছে শুদ্ধতা, পবিত্রতা ও শ্রদ্ধা। কালোর মধ্যেই রয়েছে সব রং। যদিও আমরা কালোকে অশুভ বা শোকের প্রতীক বলেই বিবেচনা করি। তবে এটিও সত্য যে, কালো ছাড়া গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। কালোর গুরুত্ব কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সাদা আর কালোর মিশেলেই প্রকাশ পায় আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তাই একুশের পোশাক হিসেবে শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার কামিজ, শার্ট, টি-শার্ট, টপ যেকোনো কিছুই হতে পারে। রং হিসেবে সাদা-কালো অ্যাশ এবং লাল রংকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর নকশা হিসেবে বর্ণমালা, কবিতা, গান, স্লোগান, দেশাত্মবোধক নানা মোটিফ থাকতে পারে।’

অঞ্জন’স-এর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার শাহীন আহম্মেদ বলেন, ‘সাদা এমন একটা রং, যা কখনো কারও ভালো লাগবে না এমনটা হতে পারে না। সাদা রং মানসিক শান্তি ও স্বস্তি দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের সময়ের শুরু থেকেই সাদা পোশাকের প্রচলন ছিল। সাদা পোশাকের ওপরে কালো কাপড়ের শোকের ব্যাজ পরতে দেখা যেত। এখন অবশ্য সাদা-কালো এই দুই রঙের পোশাকই সবাইকে পরতে দেখা যায়।’

কার কেমন আয়োজন

সাদা-কালো : কালো শাড়ির জমিনে সাদা রঙে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলা বর্ণমালা। শাড়ির আঁচল ও পাড়ে থাকছে হালকা নকশার কাজ। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে পাওয়া যাবে কলারযুক্ত কনট্রাস্ট ব্লাউজ। এ ছাড়া ছোট ও বড়দের পাঞ্জাবি, টপস, সালোয়ার-কামিজ পাওয়া যাবে সাদা-কালোর একুশ সংগ্রহে। ডিজাইনের মাধ্যম হিসেবে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক ও এমব্রয়ডারি স্থান পেয়েছে।

রঙ বাংলাদেশ : একুশের পোশাকে স্ক্রিন প্রিন্টে বাংলা বর্ণমালা ফুটিয়ে তুলেছে রঙ বাংলাদেশ। সুতি ফেব্রিকসের টি-শার্টের বুকের জমিনে লাল-কালো রঙের আলপনায়ও থাকছে একুশের ছোঁয়া। এ ছাড়া বর্ণমালাযুক্ত মাস্ক, পাঞ্জাবি, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজসহ অন্যান্য পোশাক, মগ ও গহনা পাওয়া যাবে।

নিত্য-উপহার : সাদা, কালো, লাল, নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙের টি-শার্টে কবিতা, কবিতার লাইন, একুশের সেøাগান, বাংলা বর্ণমালা ফুটিয়ে তুলেছে নিত্য-উপহার। এ ছাড়া বর্ণমালায় সুতির শাড়িও পাবেন।

বিশ্ব রঙ : অমর একুশ উপলক্ষে লাল ও কালো পাড়ের শাড়ি এনেছে বিশ্ব রঙ। বাংলা বর্ণমালা এসেছে মোটিফে। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে ভিন্ন কাটের ব্লাউজে থাকছে বৈচিত্র্য। সঙ্গে থাকছে ছেলেদের পাঞ্জাবি।

অঞ্জন’স : সুতির সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি ও পাঞ্জাবি থাকছে একুশের আয়োজনে। পাশাপাশি ছোটদের শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজও পাবেন। এ ছাড়া একই সাদা-কালো রঙের একই মোটিফ ও নকশায় পারিবারিক পোশাকও পাবেন।

দরদাম

ফ্যাশন হাউজে একুশের পোশাকের তালিকায় আছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, সিঙ্গেল কামিজ, সিঙ্গেল ওড়না, ব্লাউজ, পাঞ্জাবি, শার্ট, টি-শার্ট ও উত্তরীয়। ছোটদের কামিজ, ফ্রক, স্কার্ট টপস সেট, পাঞ্জাবি, শার্ট ও টি-শার্ট। পোশাকের ডিজাইন, ফেব্রিকস এবং ব্যান্ডের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। মেয়েদের তাঁতের শাড়ি ১২০০ থেকে ২২০০ টাকা, হাফসিল্ক শাড়ি ১৫০০ থেকে ৩৫০০, সালোয়ার-কামিজ ২৫০০ থেকে ৩৫০০, সিঙ্গেল কামিজ ১২০০ থেকে ১৮০০, ব্লাউজ ২২০ থেকে ৭০০, সিঙ্গেল ওড়না ৬৫ থেকে ৯০০ টাকা। ছেলেদের পাঞ্জাবি ৯৫০ থেকে ১,৫৫০, শার্ট ৭৫০ থেকে ৯৫০, টি-শার্ট ৪৮০ থেকে ৫০০, উত্তরীয় ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকা। ছোট মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ ১০৫০ থেকে ১৫৫০ টাকা, ফ্রক ৬৫০ থেকে ৯৫০, কামিজ ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা।

বাচ্চা ছেলেদের পাঞ্জাবি ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকা, শার্ট ৫০০ থেকে ৬৫০, টি-শার্ট ৩৮০ থেকে ৪০০ ও মগ ৩৫০ থেকে ৩৯০ টাকা।

মডেল : লাবণ্য বিন্দু, পোশাক : রঙ বাংলাদেশ, সাজ : শোভন মেকওভার

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত