‘ভিটে আছে ঘর নেই’ তহবিল নিয়ে অভিনব প্রতারণা

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৮:১৪ পিএম

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার নামে স্থানীয় একটি এনজিওর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ নয়ছয় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, যাদের ‘ভিটে আছে ঘর নেই’ এমন দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী পরিবারকে বসতঘর তৈরির জন্য ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘গৃহায়ণ তহবিল’ গঠন করেন। তহবিলের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ইউনিট। ২ শতাংশ সুদে তহবিল নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা। ২২০ থেকে তিন শ বর্গফুটের একটি ঘর বানানোর জন্য একজন গ্রাহককে ১০ বছর মেয়াদে ৭০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার কথা। ‘আগ্রহ উন্নয়ন সংস্থা’ নামে স্থানীয় একটি এনজিও সরকারি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তহবিল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন মানুষদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে তালিকা করে। পরে ৭০ হাজার টাকার প্যাকেজ থেকে সংস্থার হাতে গোনা কয়েক গ্রাহককে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে উপজেলার সাতগাওঁ বাজারে ভাই-ভাবি ও কাছের লোকজনদের সংশ্লিষ্ট করে সংস্থাটি গড়ে তোলেন চাঁনমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিনয় ভুষন দেব। সাতগাঁও বাজারে সংস্থাটির প্রধান অফিস স্থাপনের পাশাপাশি সিন্দুরখাঁন ও কুলাউড়ার রবিরবাজারে শাখা অফিস করে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করেন। শুরু থেকেই সংস্থার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। স্কুলশিক্ষক কীভাবে একটি রেজিস্টার্ড সংস্থা গড়ে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। ২০১১ সালের অক্টোবরে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে হাজতবাস করেন বিনয় দেব।

এ ছাড়া স্থানীয় শ্রী শ্রী রঘুনাথ জিউর আখড়ার দেবোত্তর সম্পত্তি নিয়ে তার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় ২০১৫ সালে গীতা জয়ন্তী উদ্‌যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মামলা করে আলোচনায় আসেন বিনয় ভুষন এরপর। ২০১৮ সালে সংস্থাটিকে সামনে রেখে তিনি ‘গৃহায়ণ তহবিল ঋণ’ নিয়ে নয় ছয় শুরু করেন।

উপজেলার লাহারপুর গ্রামে গেলে হরিমন কর এর স্ত্রী ভূমিহীন মিনতি কর এ প্রতিবেদককে বলেন, তাকে কোনো গৃহ নির্মাণ ঋণ দেওয়া হয়নি। উল্টো বিনয় তার বাড়ির একটি নির্মাণাধীন ঘরের দেয়ালে ‘গৃহায়ণ তহবিল ঋণ এর টাকায় তৈরি করা’ এমন সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন। পরে তিনি আমাকে কয়েকজন লোকের সামনে এ ঘর তাকে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে তা বলতে বলে। মিনতি বলেন, আমি গরিব বিধবা মানুষ। এক বাড়িতে থাকি, না বললে আবার কী হয়- এই ভয়ে আমি বলেছি।

সাতগাঁও স্টেশন বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর বলেন, এই সংস্থার দুর্নীতির বিষয়টি এ অঞ্চলে ওপেন সিক্রেট। গরিবের জন্য ঘর নির্মাণের সরকারি টাকা আনলেও আমার কাছে অনেকে ঘর না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। অথচ তাদের কাছ থেকে এনআইডি ও তালিকা করে নেয়া হয়েছিল। পরে জানতে পেরেছি অন্যর বসত ঘর দেখিয়ে অডিট অফিসারদের বিদায় করেছে।

এ ছাড়া সংস্থাটির বিরুদ্ধে চাকরি ছেড়ে চলে আসা ২ ফিল্ড কর্মীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

লছমন ভর নামে এক মাঠকর্মী জানান, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৯৫ হাজার টাকা না দিয়ে দীর্ঘদিন তাকে হয়রানি করছে কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে তারা ফান্ডের পাস বই জমা নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছে না।

একই অভিযোগ বিজয়দেব নাথ নামে আরেক মাঠকর্মীর। তাকেও ফান্ডের ৪০ হাজার পাওনা টাকা পরিশোধ না করে হয়রানি করছে সংস্থার লোকজন। বিজয় বলেন, ’আর চাই না দাদা এ টাকা। তারা আমার টাকা দেবে না এটা ভেবে টাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছি’।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিনয় ভুষন দেব বলেন, তিনি এই সংস্থার কেউ না, ২০১৩ সালে তিনি এই সংস্থা ছেড়ে এসেছেন। তাই এ সংস্থার কোনো অনিয়মের বিষয়ে তিনি কথা বলবেন না।

২০১৩ সালে সংস্থা ছেড়ে আসার কথা বললেও ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিলে সংস্থার একটি রেজুলেশনের উপস্থিতিদের ৪ নম্বর ঘরে নাম স্বাক্ষর দেখা যায় বিনয় ভুষনের। বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

মিনতি করের ঘর প্রতারণার বিষয়ে বিনয় ভুষনের দাবি, ঘরটি মিনতি করের না কল্পনা দেব এর নামে সংস্থা থেকে নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এই কল্পনা দেব বিনয় ভুষনের ছোট ভাই শ্রীমঙ্গল সরকারি প্রাণী সম্পদ হাসপাতালের চিকিৎসক বিকাশ দেবের স্ত্রী বলে জানা গেছে।

কাওসার নামে সংস্থার হিসাব কর্মকর্তা জানান, ‘গৃহায়ণ তহবিল ঋণ’ দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে প্রথম ধাপে ২৫টি ঘর নির্মাণের জন্য ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ২০১৯ সালে আরও ২৫টি ঘর নির্মাণের জন্য ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ৩৫ লাখ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আনে সংস্থা।

এর বেশি বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি সংস্থার নির্বাহী বাবলু বর্ধনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মোবাইল ফোনে বাবলু বর্ধনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বড়লেখা ফিল্ডে আছেন এবং রাত ৮টার দিকে ফোন করার কথা বলে ফোন কেটে দেন। রাত ৮টা ২ মিনিটে বাবলু বর্ধনের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বন্ধ পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. সুয়েবুর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী এ ধরনের কোনো সংস্থা কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন করতে পারে না।

তিনি বলেন, আমরা লোকবলের অভাবে সবকিছু দেখে উঠতে পারি না, তবে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত